চা ও ইস্পাহানি যেন প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে। ইস্পাহানি লিমিটেডের নতুন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন স্বাদের চা উত্পাদনে প্রাকৃতিক স্বাদকে অমলিন রাখতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার কার্যকর সমন্বয় করতে সক্ষম হওয়ায় বাংলাদেশ ব্র্যান্ড আরো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইস্পাহানি গ্রুপ ১৯৫ বছর ধরে বিশ্বস্ততা ও গুণগত মান বজায় রেখে শুধু চা নয়, অন্যান্য অনেক পণ্য ও সেবা বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণকে উপহার দিয়ে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ‘বাংলাদেশ উদ্যোক্তা পুরস্কার ২০০৩’প্রাপ্ত এমএম ইস্পাহানি লিমিটেড ১৯০০ সালে মির্জা মোহাম্মদ ইস্পাহানির উদ্যোগে কলকাতায় এমএম ইস্পাহানি অ্যান্ড সন্স নামে ব্যবসা শুরুর অল্প সময়ের মধ্যে একটি বহুমুখী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভৌগোলিক ও পরিমাণ উভয় ক্ষেত্রে ব্যবসার প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়। ইস্পাহানি গ্রুপের জন্মদাতা পার্সিয়ান-বাঙালি মির্জা মোহাম্মদ ইস্পাহানি ১৮৯৮ সালে ইয়াঙ্গুনে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৬৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখ্য, মির্জা মোহাম্মদ ইস্পাহানির ভাই হাজি মির্জা মোহাম্মদ হাসেম ১৮২০ সালে পার্সিয়ান ইসফান শহর থেকে ভারতের মুম্বাইয়ে প্রথম ব্যবসা শুরু করেন এবং সেখান থেকেই ব্যবসার দ্রুত পসার ঘটতে থাকে।

১৮৮৮ সালে ঢাকায় প্রথম শাখা অফিসের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করে ইস্পাহানি গ্রুপ। দ্রুত ব্যবসা প্রসারের কারণে ১৯১৮ সালে মির্জা মোহাম্মদ ইস্পাহানি যৌথ ব্যবসায় যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে ওনার জ্যেষ্ঠ সন্তান মির্জা আহমেদ ইস্পাহানির ছোটো ভাই মির্জা মাহমুদ ইস্পাহানি ও মির্জা আবুল হোসেন ইস্পাহানির সঙ্গে পার্টনারশিপের মাধ্যমে যৌথ প্রাইভেট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৩৪ সালে এমএম ইস্পাহানি লিমিটেড গঠন করেন। সাতচল্লিশে ভারত ভাগের পর এমএম ইস্পাহানি লিমিটেডের করপোরেট প্রধান অফিস বাংলাদেশের চট্টগ্রামে স্থানান্তর হয় এবং বর্তমানে এখান থেকেই ইস্পাহানি গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানি পরিচালিত হয়।

আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে মির্জা এমএম ইস্পাহানির উত্তরসূরি মির্জা আলী বেহরুজ ইস্পাহানির সুযোগ্য নেতৃত্বে বহুপক্ষীয় এ আন্তর্জাতিক শিল্প ও বাণিজ্য গ্রুপ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চা ট্রেডিং কোম্পানিই শুধু নয়, ভোক্তাপণ্য, টেক্সটাইল, সুতা, পাট, শিপিং, পোলট্রি, রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন ধরনের উত্পাদন বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য, ইস্পাহানি লিমিটেড বর্তমানে জাতীয়ভাবে অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্র্যান্ডভিত্তিক চা বাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং মোট চা-ব্যাগ সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রধান চারটি চা বাগান থেকে উত্পাদিত ইস্পাহানি চা ২৪টি বিভাগীয় অফিসের মাধ্যমে ৫১৭টি বিক্রয় কেন্দ্র থেকে সারা দেশে সরবরাহ করছে। বাংলাদেশে ব্যবসায় যখন ক্রান্তিকাল চলছে, ভোক্তাপণ্যে ভেজাল একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ালেও ইস্পাহানি গ্রুপের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগের কথা কখনো শোনা যায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে ভোক্তার বিশ্বস্ততা ধরে রাখা অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলেও পেশাদারিত্ব ও প্রতিশ্রুতির সমন্বয়ে এখন পর্যন্ত ইস্পাহানি পরিবার তা ধরে রাখতে পেরেছে। একটি অনন্য উদাহরণ হলো, প্রথমে ভারত ও পরে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং অন্যান্য দুর্বিপাকের মধ্যেও একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০০ বছর ধরে সফলতার সঙ্গে টিকে থাকা স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।

শুধু তা-ই নয়, যেকোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের শীর্ষ উদ্যোক্তারা কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকেন। ঠিক তেমনি ইস্পাহানি গ্রুপের অন্যতম পরিচালক আবুল হাসেম ইস্পাহানি ১৯৪৭-এ পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে নির্ভরযোগ্যতা ও পেশাদারিত্বের কারণে মির্জা আবুল হাসেম ইস্পাহানি যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম রাষ্ট্রদূত ও পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। উল্লেখ্য, মির্জা ইস্পাহানি একই সঙ্গে পাকিস্তানের ফেডারেল বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তবে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের উদীয়মান উদ্যোক্তাশ্রেণীর জন্য এমএম ইস্পাহানি এক ধরনের প্রেরণা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে অনন্য অবদান রেখেছেন। ১৯৭১ সালের পর আদমজীসহ উল্লেখযোগ্য উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে পাকিস্তানে চলে গেলেও মির্জা এমএম ইস্পাহানি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে অবদান রাখার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশেই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ সিদ্ধান্ত যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বেসরকারি উত্পাদনশীল খাত বা নতুন উদ্যোক্তাদের শুধু ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিতই করেনি, ইস্পাহানি গ্রুপের ব্যবসার জন্যও যে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল, তাও প্রমাণ হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তত্কালীন ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন চলাকালে রাজকীয় ভারতীয় বিমান বাহিনীর ঢাকায় উড্ডয়ন ও অবতরণের স্বার্থে তেজগাঁওয়ের কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়। এ বিমানবন্দর নির্মাণের পর মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি এবং তার ব্যবসায়িক পার্টনাররা ১৯৪৬ সালে প্রথম ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ নামে বেসামরিক বিমান পরিবহন সংস্থা প্রতিষ্ঠান করেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকদের যোগাযোগের স্বার্থে মির্জা ইস্পাহানির বিশেষ আগ্রহে ১৯৫৪ সালের ৭ জুন ডিসি-৩ বিমানের মাধ্যমে প্রথম ঢাকা-করাচি যাত্রী বিমান পরিবহন শুরু হয়। পরে ১৯৫৫ সালের ১১ মার্চ ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি সরকারের অনুরোধে ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ সরকারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস করপোরেশন নাম ধারণ করে, যা সর্বশেষ পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ) নামে এখনো পরিচালনাধীন।

মানবিক ব্যবসা তথা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মির্জা এমএম ইস্পাহানি ও তার পরিবার। ভারতীয় উপমহাদেশে ইস্পাহানি গ্রুপই সম্ভবত প্রথম প্রতিষ্ঠান, যারা বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হয়েও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের জন্য আবাসন ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিত্সা সেবাসহ অন্যান্য সেবাও নিশ্চিত করেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল ও কলেজ এ উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠা করা হলেও বাংলাদেশের হাজার হাজার ছেলেমেয়ের গুণগত মানের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠান কয়েক যুগ ধরে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো, ১৯৬০ সালে প্রথম মির্জা মোহাম্মদ ইস্পাহানির উদ্যোগে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে চক্ষুসেবা প্রদানের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ৫৫ বছরের বেশি সময় ধরে এ প্রতিষ্ঠান স্বল্পখরচে দক্ষ চিকিত্সকদের সমন্বয়ে আধুনিক চিকিত্সা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধান চক্ষু হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের চোখের চিকিত্সার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে এ হাসপাতালে ৪০ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারসহ ৩৫ জন সার্জন, প্রশিক্ষিত নার্স, প্যারামেডিকের সমন্বয়ে তৃতীয় বা সর্বোচ্চ পর্যায়ের চক্ষু চিকিত্সা প্রদান করছে। শুধু ২০১৫ সালেই ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে প্রায় ৭০ হাজার রোগীকে সাধারণ চিকিত্সাসেবার পাশাপাশি ৪০ হাজারের বেশি রোগীর চোখের সার্জারি করা হয়। ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ঢাকার বাইরে তুলনামূলকভাবে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে চক্ষুসেবা প্রদানের উদ্দেশ্যেই বরিশাল, জামালপুর ও নওগাঁয় শাখা হাসপাতাল পরিচালনা করছে। পাশাপাশি চক্ষু চিকিত্সায় গবেষণাভিত্তিক উচ্চতর জ্ঞানার্জনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯২ সাল থেকে হাসপাতাল পরিচালনার পাশাপাশি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়।

শুধু তা-ই নয়, প্রায় ২০০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন একাগ্রতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে দেশে-বিদেশে ইস্পাহানি পরিবার বর্তমান ও ভবিষ্যত্ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। মানবিক ব্যবসার মাধ্যমেও যে প্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটানো সম্ভব, ইস্পাহানি গ্রুপ তা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে অধিক হারে উত্পাদনশীল কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে মির্জা এমএম ইস্পাহানির মতো উদ্যোক্তার আরো বেশি প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্বিপাকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নির্ভরযোগ্য পণ্য ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, তার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন এমএম ইস্পাহানির উত্তরসূরিরা। বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে যত বেশি মির্জা এমএম ইস্পাহানির মতো ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে, বাংলাদেশ ব্র্যান্ড সারা বিশ্বে আরো বেশি পরিচিতি পাবে এবং সুনাম বয়ে আনতে সক্ষম হবে।

 

লেখক: পরিবেশ, জলবায়ু অভিযোজন ও অর্থায়ন বিশ্লেষক