ফতেহ লোহানীর পরিচয় অনেক। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক, সাংবাদিক, অনুবাদক, লেখক, গীতিকার। আবৃত্তিকার হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল। তবে তার এসব পরিচয়ের মধ্যে চলচ্চিত্র অভিনেতা পরিচয়টিই সবার কাছে পরিচিত। অভিনেতা হিসেবেই তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন।
ফতেহ লোহানীর চলচ্চিত্রাভিনেতা হিসেবে অভিনয়জীবন শুরু হয় কলকাতার হিন্দি ও বাংলা ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে। এটা এমন এক সময়, যখন এ উপমহাদেশ ব্রিটিশ
শাসনাধীন। প্রখ্যাত ভারতীয় চিত্রগ্রাহক ও চলচ্চিত্রকার বিমল রায় তাকে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘হামরাহী’তে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। ছবিটি ১৯৪৫ সালে মুক্তি পায় এবং ফতেহ লোহানী প্রথমবারের মতো রুপালি পর্দায় আবির্ভূত হন। তবে ফতেহ লোহানী নামে নয়, কিরণ কুমার নামে, এবং এ নামেই তিনি কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন।
ফতেহ লোহানী চলচ্চিত্র মাধ্যমেই প্রথম অভিনয় করেন তা নয়। তার অভিনয় ইতিহাসের শুরু তার স্কুলজীবন থেকে। কলকাতার সেন্ট ম্যারিজ ক্যাথেড্রাল মিশন হাইস্কুলের শিক্ষার্থী থাকার সময়েই তিনি টুকটাক অভিনয় করেন। স্কুল পাস করে তিনি কলকাতার রিপন কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি আরো ভালোভাবে অভিনয়ের সাথে যুক্ত হন। তার অভিনীত প্রথম নাটক বনফুল রচিত ‘শ্রী মধুসূদন’-এ তিনি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। পরবর্তীতে তিনি নাট্যসম্প্রদায়ে যোগ দেন, সেখানে তিনি অনেক বিখ্যাত অভিনেতার সাহচর্য লাভ করেন। তত দিনে তিনি বিএ পাস করেছেন। নাট্যসম্প্রদায় থেকে ফতেহ লোহানী ‘আলোক তীর্থ’ নাটকের দলে যোগ দেন। এ সময় ‘জোয়ার’ নামে একটি নাটকে তার অভিনয় দেখে বিখ্যাত নাট্যনির্দেশক শিশির ভাদুড়ী প্রশংসা করেছিলেন। এ আলোক তীর্থ নাট্যগোষ্ঠীর সাথে থাকা অবস্থায়ই হেমেন রায় রচিত নাটক ‘নর-নারী’তে ফতেহ লোহানীর অভিনয় দেখে বিমল রায় তাকে পছন্দ করেছিলেন এবং চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
প্রথম ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফতেহ লোহানী। পরের বছর ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ শিরোনামের চলচ্চিত্রে প্রতিনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এ ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন ওবায়েদ-উল-হক, যিনি হিমাদ্রী চৌধুরী নামে পরিচালনা করতেন। দেশভাগের বছর ১৯৪৭-এ মুক্তি পায় অখিল নিয়োগী পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘মুক্তির বন্ধন’। এ ছবিতেই ফতেহ লোহানী সর্বপ্রথম নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন গীতিশ্রী দেবী।
দেশ বিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ফলে বেশ কিছুদিন চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দা থেকে দূরে থাকতে তিনি বাধ্য হন। অবশ্য ১৯৫৭ সালে ঢাকায় এফডিসি প্রতিষ্ঠার পেছনে যারা ভূমিকা পালন করেছিলেন, ফতেহ লোহানী তাদের অন্যতম। ১৯৫৭ সালে এফডিসি প্রতিষ্ঠার বছরেই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। প্রথমে তিনি ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেন, পাশাপাশি ‘আকাশ আর মাটি’ চলচ্চিত্রের কাজও শুরু করেন। ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায় ‘আকাশ আর মাটি’ এবং তার প্রায় দেড় বছর পর মুক্তি পায় ‘আসিয়া’।
‘আকাশ আর মাটি‘ হলো এফডিসি থেকে নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। নাট্যকার বিধায়ক ভট্টাচার্যের গল্প নিয়ে ফতেহ লোহানী তার এ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ‘আকাশ আর মাটি‘ বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারেনি। এর কারণ সম্পর্কে ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব আমেরিকান স্টাডিস’-এ প্রকাশিত একটি আর্টিকেলের উদ্ধৃতি এখানে উপস্থাপন করা যেতে পারে। আর্টিকেলে বলা হয়, ‘অশধংয ধত্ গধঃর, ধ সঁংরপধষ ভরষস, ধিং ঃযবসধঃরপধষষু ধসনরঃরড়ঁং ভরষসং. ইঁঃ রঃ ংঁভভবত্বফ ভত্ড়স ঢ়ড়ড়ত্ ঃবপযহরপধষ শহড়ষিবফমব ধহফ রহবীঢ়বত্রবহপব ড়ভ ভরষস-সধশবত্ং ড়ভ উযধশধ.’
অভিনয় থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে চলে এলেও বেশিদিন থাকেননি ফতেহ লোহানী। তিনি আর মাত্র একটি চলচ্চিত্রই পরিচালনা করেন ‘সাত রং’ শিরোনামে, যার ভাষা ছিল উর্দু। শুধু বাংলাভাষী নয়, উর্দুভাষী পাকিস্তানের দর্শকের কথা মাথায় রেখেই তিনি এ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায়। এ ছবিটিও ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়। ফলে তিনি স্থায়ী হন অভিনয়জগতে। ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রাজা এল শহরে’ চলচ্চিত্রে তিনি খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করেন এবং তার পর থেকে নিয়মিতভাবে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে থাকেন।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন। ‘রাজা এল শহরে’ ছবি মুক্তির আগে আরো একটি ছবিতে ফতেহ লোহানী অভিনয় করেছিলেন, তবে সেটি কোনো বাংলা বা হিন্দি চলচ্চিত্র ছিল না। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মাইকেল অ্যান্ডারসন পরিচালিত হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ার জঙ্গলে চিত্রায়ণ হয়। ১৯৫৫ সালের নভেম্বরে ছবি শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে ইউনিট পশ্চিম পাকিস্তানে এলে ফতেহ লোহানী তাতে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তার এ শুটিং অভিজ্ঞতা লিখে প্রকাশ করেছিলেন।
দেশভাগের পর থেকে শুরু করে ‘আকাশ আর মাটি’ নির্মাণ পর্যন্ত সময়ে ফতেহ
লোহানী চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দা থেকে দূরে থাকলেও চলচ্চিত্র থেকে দূরে ছিলেন না, বরং এ সময়ে তিনি অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেন। তিনি লন্ডনের মঞ্চে অভিনয়ও করেন। পাশাপাশি বাঙালিদের জন্য তিনি নাট্যনির্দেশনা দিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে তার নির্দেশনায় ‘সিরাজ-উদ-দৌলা‘ মঞ্চস্থ হয়েছিল বলে জানা যায়।
মূলত সাংবাদিকতার সূত্র ধরেই তিনি অভিনয় ও চলচ্চিত্রশিক্ষা অর্জনের সুযোগ পান। দেশ বিভাগের আগেই তিনি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হন। তিনি দৈনিক আজাদ ও সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় কাজ করেছেন। দেশ বিভাগের পর পর তিনি ঢাকা বেতারে যোগ দেন। সেখানে তিনি সংবাদ পাঠ ও আবৃত্তি করতেন। ১৯৪৯ সালে তিনি করাচি বেতারে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে করাচি থেকে ইংল্যান্ডে যান বিবিসিতে কাজ করার উদ্দেশে। লন্ডনে অবস্থানকালীন তিনি স্যার অলিভার লরেস, স্যার জন গিলগুইয়ের কাছে অভিনয় ও পরিচালনা বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। বলা যায়, এ জ্ঞানই তাকে দেশে ফিরে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্র অভিনয়ে মনোযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করে।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যকর্মেও ব্রতী ছিলেন। তার বেশকিছু গল্প মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম হলো মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ ‘সমুদ্রসম্ভোগ’। তার অন্যান্য অনুবাদের মধ্যে রয়েছে একাধিক নাটক। আর্থার মিলারের ‘ডেথ অব আ সেলসম্যান’-এর অনুবাদ ‘একটি সামান্য মৃত্যু’, ইউজিন ও নিলের ‘ল্যাজারাস লাফড’-এর অনুবাদ ‘চিরন্তন হাসি‘ ও ‘মর্নিং বিকামস ইলেকট্রা’র অনুবাদ ‘বিলাপে বিলীন’। তার মৌলিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে কয়েকটি নাটক ‘নিভৃত সংলাপ’, ‘দূর থেকে কাছে’ ও ‘সাগরদোলা’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি কবিতা ও গান লিখেছেন। আকাশ আর মাটি চলচ্চিত্রের কয়েকটি গান আর রচনা। তার অন্যান্য গান আবদুল আহাদের সুরে ঢাকা বেতার থেকে প্রচার হতো। ‘পূবালী’ পত্রিকায় তার একাধিক কবিতাও প্রকাশ হয়।
চলচ্চিত্রের মানুষ ফতেহ লোহানী আমৃত্যু চলচ্চিত্রের মধ্যেই ছিলেন। চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে ‘কুয়াশা’ চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালীন তিনি আকস্মিকভাবে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তার দৈহিক মৃত্যু হলেও ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো, বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, দুই ভাই, মহুয়া, এতটুকু আশা, পিতাপুত্র, বাল্যবন্ধু, মিশরকুমারী, দীপ নেভে নাই, মায়ার সংসার, দর্পচূর্ণ, ডাকু মনসুর, দিনের পর দিন প্রভৃতি চলচ্চিত্রের কারণে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন।
বহুমুখী প্রতিভার এ মানুষটি সম্পর্কে তথ্যাদি সহজলভ্য নয়। গবেষক অনুপম হায়াত্ রচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘ফতেহ লোহানী’ তার সম্পর্কে জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। তার চলচ্চিত্রকর্ম, সাহিত্যকর্ম আলাদা আলাদা গবেষণার বিষয় হতে পারে। সর্বোপরি তার বিভিন্নমুখী কর্ম যেন সহজলভ্য হয়, সে বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
লেখক: কো-অর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডাটাবেজ (বিএমডিবি)






