কভিডের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ভর্তুকি বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সরকার। তবে অর্থনীতির সার্বিক বিষয় মাথায় নিয়ে সরকার তার ব্যয় কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বাস্তবতায় আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রস্তাব করা হচ্ছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আসন্ন বাজেটের আকার তুলনামূলক সংকোচনমূলক নীতি ধরা হলেও ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় অধিক হারে বাড়ছে, যা বাজেটের মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। বাজেটে এক্ষেত্রে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৭৩ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। এছাড়া বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় হবে ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে এ দুই খাতে বরাদ্দ রাখা রয়েছে যথাক্রমে ৬২ হাজার কোটি ও ৬ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে অভ্যন্তরীন সুদ পরিশোধে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। তবে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় খাতে কমিয়ে ৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।

আগামী বাজেটে সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৪ লাখ ১১ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ রাখা হচ্ছে ৭৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটের বরাদ্দের চেয়ে ৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা অর্থাৎ ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। এছাড়া ভর্তুকি প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, চলতি বাজেটে যা রয়েছে ১৪৯ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। সরকারের দেশী-বিদেশী ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ বাবদ রাখা হচ্ছে ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা, চলতি বাজেটে যা রয়েছে ৬৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য খাতে ব্যয় বাবদ আগামী বাজেটে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৯ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৩৭ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।

মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে দেশে দেশে নেয়া হয়েছে কৃচ্ছ সাধনের নানা উদ্যোগ। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় গত দুই বছরই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা কমিয়ে আনার ঘোষণাও দেয় বিভিন্ন দেশ। যদিও চলমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই দেশে চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বাজেটেও সরকারি কর্মীর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। মহামারীর অনেক আগে থেকেই এ ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেতন-ভাতায় সরকারের ব্যয় ছিল ২৮ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, চলতি বাজেটে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ আরো বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে ৭৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৬ হাজার ৬৬৬ কোটাি অর্থাৎ ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভর্তুকি প্রণোদনা ও সুদ পরিশোধে অতিরিক্ত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় সে হারে বাড়বে। এবারের বাজেটে এটিই হচ্ছে বড় দুর্বলতা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বণিক বার্তাকে বলেন, আসন্ন বাজেটের আর্থিক কাঠানো প্রস্তুত করা অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় কষ্টকর। কারণ ব্যয়ের বড় দুটি অংশ যাবে ভর্তুকি প্রণোদনা ও সুদ পরিশোধে। এ দুই খাতে অর্ধেকের বেশি ব্যয় হবে। এর সঙ্গে বেতন-ভাতাসহ সরকারের অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যোগ করলে সেটা আরো বেড়ে যাবে। তাই উন্নয়নমূলক কাজকর্ম করার জন্য অর্থ খুব কমই থাকবে। এটিই এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা।

এদিকে অর্থনীতির সার্বিক বিষয় মাথায় নিয়ে সরকার তার ব্যয় কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রস্তাব করা হচ্ছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা, যা কিনা মোট জিডিপির প্রায় ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার নির্ধারিত রয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিডিপির অংশ হিসেবে বাজেটের আকার ২ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে আনছে সরকার।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আয় কম থাকলেও এখন বাড়ছে। অর্থনীতির সূচকগুলো ইতিবাচক থাকলে আগামী অর্থবছরেও রাজস্ব আয় বাড়ার প্রবণতা বজায় থাকবে। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারি ভর্তুকির বোঝা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। সরকার আয় বাড়িয়ে এ বোঝা লাঘব করতে চায়। তাই আগামী অর্থবছর চলতি অর্থবছরের তুলনায় মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে।

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য রয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। নতুন বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। এনবিআর ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা পাচ্ছে। এটি জিডিপির ৮ দশিমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৯ দশমিক ৫ শতাংশ)। সে হিসাবে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৪০ হাজার কোটি টাকা বাড়ছে। শতকরা হিসাবে তা ১২ শতাংশ।

আগামী বাজেটে এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হবে ১৮ হাজার কোটি টাকা। করবহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এ দুই খাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ১৬ হাজার কোটি ও ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে নতুন বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে যথাক্রমে ১৩ ও ৫ শতাংশ। এ বছর বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার আশা করা হচ্ছে ৩ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। বৈদেশিক অনুদান পরিশোধ করতে হয় না। এজন্য এটি সরকারের আয় মনে করা হয়। এনবিআর সূত্র জানায়, রাজস্ব আহরণের জন্য নতুন করে করের বোঝা জনগণের ওপর চাপানো হবে না। এক্ষেত্রে কর আহরণের নতুন নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান করা হবে। করের আওতা বাড়িয়ে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হবে।

আয়-ব্যয়ের তারতম্যের কারণে নতুন বাজেটে ঘাটতি বাড়লেও তা জিডিপির ৫-এর ঘরেই থাকছে। নতুন বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতি জিডিপির ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। সে হিসাবে ঘাটতি কমানোর প্রস্তাব থাকছে বাজেটে। কিন্তু জিডিপির তুলনায় ঘাটতি কমলেও টাকার অংকে ঘাটতি বাড়ছে ৩০ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

বাজেটে ঘাটতি পূরণে আগামী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়া হবে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, চলতি অর্থবছর যার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়া হবে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, চলতি বছরে যার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়া হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য খাত থেকে নেয়া হবে ৫ হাজার ১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেও এ খাতে একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। এছাড়া বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ ও অনুদান বাবদ (নিট) গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৫ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা। চলতি বছর এক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৯৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। একইভাবে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, ইলেকট্রো মেকানিক্যাল দ্রব্যের দাম বেড়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় খুব বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব নেই বাজেটে। আসছে বাজেটে এডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এডিপির আকার ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরের জিডিপির আকার বাড়ানো হচ্ছে। প্রাক্কলিত আকার ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী প্রাক্কলিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের প্রাক্কলিত মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

আসন্ন বাজেটে ব্যাপক কর্মসৃজনের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এজন্য ধরা হয়েছে বিনিয়োগের বড় লক্ষ্যমাত্রা। নতুন জিডিপির ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরের জন্য আটটি মূল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত বাড়তি ভর্তুকির জন্য অর্থের সংস্থান করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ অব্যাহত রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এছাড়া আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশের মধ্যে রাখা, রাজস্ব আয় বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি হ্রাস, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানোকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।