গণহত্যা বলতে কী বোঝায় তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছে জাতিসংঘ। ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজল্যুশন ২৬০ (৩) এর অধীন বলা হয়, গণহত্যা এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ যা বিশ্বময় প্রতিরোধে সব রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। গণহত্যা হলো এমন কর্মকাণ্ড যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী ২৬০ (৩) এর অনুচ্ছেদ-২ অনুযায়ী যেসব কর্মকাণ্ডকে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা হলো: 

ক. পরিকল্পিতভাবে একটি জাতি বা গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য তাদের সদস্যদের হত্যা বা নিশ্চিহ্নকরণ। 

খ. তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতি সাধন।

গ. পরিকল্পিতভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস সাধনকল্পে এমন জীবননাশী অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে তারা সম্পূর্ণ অথবা আংশিক নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

ঘ. এমন কিছু ব্যবস্থা নেয়া যাতে একটি জাতি বা গোষ্ঠীর জীবনধারণে শুধু প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি নয়, সেই সঙ্গে তাদের জন্ম প্রতিরোধ করে জীবনের চাকাকে থামিয়ে দেয়া হয়।

ঙ. একটি জাতি বা গোষ্ঠীর শিশু সদস্যদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্মপরিচয় ও জাতিগত পরিচয়কে মুছে ফেলা।

কেন রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা বলা হয় তা উপর্যুক্ত মাপকাঠির ভিত্তিতে নিরূপণ করার জন্য পাঠককে অনুরোধ করছি। লেখার এ পর্যায়ে রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে সামান্য বলে নেয়া যাক।

রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের গোড়ার কথা

তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দক্ষিণ দিকে বাংলা একাডেমির উল্টোদিকে রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ীর আশ্রম প্রতিষ্ঠিত ছিল। ঐতিহাসিক মুনতাসীর মামুনের মতে, শংকরাচার্যের অনুগামী দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায় রমনা কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৫০০ বছর আগে বদ্রী নারায়ণের যোশী মঠের সন্ন্যাসী গোপাল গিরি ঢাকায় এসে রমনায় প্রথমে একটি আখড়া স্থাপন করেন। তখন এ আখড়া কাঠঘর নামে অভিহিত হয়। পরে এখানে মূল মন্দিরটি নির্মাণ করেন হরিচরণ গিরি। প্রায় ৩০০ বছর আগে নির্মিত এ মন্দিরই ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলায় বিধ্বস্ত হয়। এ সময় কালী মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ গিরি। প্রাচীন আখড়ার পাশে হরিচরণ গিরি কর্তৃক নির্মিত নতুন মন্দিরটি বাঙালি হিন্দু স্থাপত্য রীতি বহন করলেও তাতে মুসলিম রীতির প্রভাবও লক্ষণীয়। মূল মন্দিরের দ্বিতল থেকে ১২০ ফুট উঁচু চূড়ো বহু দূর থেকে চোখে পড়ত। একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ দানের বহুল প্রচারিত আলোকচিত্রে এ চূড়ো রমনার ল্যান্ডমার্ক হিসেবে চোখে পড়ে।

ঘোড়দৌড়ের মাঠের মাঝখানে প্রাচীরঘেরা মন্দিরে ভদ্রকালীর মূর্তি সুন্দর একটি কাঠের সিংহাসনে স্থাপিত ছিল। এ মূর্তির ডান দিকেই ছিল ভাওয়ালের কালী মূর্তি। মন্দিরের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিমে ছিল পূজারি সেবায়েত ও অন্যান্য ভক্তের থাকার ঘর। পাশে একটি শিব মন্দিরও ছিল। আরো ছিল একটি নাট মন্দির ও সিংহ দরজা। পাকিস্তানের খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ড. এএইচ দানির মতে, কালীবাড়ির সামনের দিঘিটি কাটিয়েছিলেন ভাওয়ালের রানী বিলাসমণি। মতভেদে কালীবাড়ির দিঘিটি খুবই পুরনো, যা সংস্কার করেছিলেন ভাওয়ালের রানী বিলাসমণি। তবে ইংরেজ আমলের নথিপত্রে এ নিয়ে ভিন্নমত দেখা যায়। এতে বলা হয়, ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ড’স কালীবাড়ির সামনে দিঘি কাটিয়েছিলেন যা আশপাশের মানুষের পানির সমস্যা মিটিয়েছিল। বর্তমান এ দিঘিটিই রমনার কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের স্মৃতি ধারণ করে টিকে আছে।

রমনা কালী মন্দিরের উত্তর পাশে ছিল মা আনন্দময়ী আশ্রম। ‘শাহবাগের মা’ নামে পরিচিত এ সন্ন্যাসিনী ছিলেন ঢাকার নবাবের শাহবাগ বাগানের তত্ত্বাবধায়ক রমণীমোহন চক্রবর্তীর স্ত্রী। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে চাকরি নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। আনন্দময়ী তার সাধক স্বামীর নাম দিয়েছিলেন বাবা ভোলানাথ। শাহবাগে অবস্থানকালে তারা দুজন বিশেষ করে মা আনন্দময়ী আধ্যাত্মিক শক্তির ধারক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি সারা ভারতে সাধিকা হিসেবে পূজিত হন। ঢাকায় অবস্থানকালে তার ভক্তরা রমনা ও সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িতে দুটি আশ্রম তৈরি করে দিয়েছিলেন। রমনায় মা আনন্দময়ীর আশ্রমের প্রবেশদ্বার ছিল পূর্বদিকে। পশ্চিম দিকে একটি নাট মন্দির ছিল। তার উত্তর দিকে ছোট্ট একটি ইটের কোঠায় মা আনন্দময়ীর পাদপদ্ম সংরক্ষিত ছিল। কোঠাসংলগ্ন আশ্রম মন্দিরের বেদির ওপর বিষ্ণু ও অন্নপূর্ণা বিগ্রহ স্থাপিত ছিল। মা আনন্দময়ী থাকতেন উত্তর-পূর্বদিকে একটি চৌ-চালা খড়ের ঘরে।

রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে সন্ন্যাসী, ভক্ত ছাড়াও সাধারণ কর্মজীবী অনেক মানুষ থাকতেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত কর্মচারী পরিবার। তারা মন্দির ও আশ্রমের অনুষ্ঠানাদিতে অংশ নিতেন। গণহত্যার রাতে আক্রান্তদের মধ্যে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, শতাধিক পরিবার এ মন্দিরলগ্ন স্থানে বসবাস করত। গণহত্যার পর আর এখানে কেউ বাস করতে ফিরে আসেনি। 

গণহত্যার বিবরণ

২৫ মার্চ কালরাত্রে বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর ২৬ মার্চ সকাল ১১টার দিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রথম মন্দির ও আশ্রম প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। তারা মন্দির ও আশ্রমবাসীদের মন্দির থেকে না বেরোনোর জন্য নির্দেশ দিয়ে যায়। এ সময় পুরনো ঢাকা থেকে সত্তরের নির্বাচনে পরাজিত মুসলিম লীগ প্রার্থী এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অন্যতম দোসর খাজা খয়েরউদ্দিনকে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে দেখা গেছে। ২৭ মার্চ গভীর রাতে রমনায় ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ড প্রধানত তারই উদ্যোগে সংঘটিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের সহযোগীদের নিয়ে ২৭ মার্চ রাত ২টার দিকে সান্ধ্য আইন চলাকালীন রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ঘেরাও করে। সেনাবাহিনীর সার্চলাইটের আলোয় গোটা রমনা এলাকা আলোকিত হয়ে যায়। এরই মধ্যে শুরু হয় গোলাবর্ষণ। রমনা কালী মন্দিরে ঢুকে পাকিস্তানিরা মূর্তির দিকে এক ধরনের বিস্ফোরক ছুড়ে দেয়। অবশ্য কারো কারো মতে গোলাবর্ষণ করা হয়। ফলে মূর্তিসহ মন্দিরের পেছনের অংশ উড়ে যায়। পরে মন্দির ও আশ্রম ধ্বংস করা হয়।

 মন্দির ও আশ্রম এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘাতকরা ঢোকার সময় অনেকে ঘুমিয়ে ছিলেন, কেউ কেউ উৎকণ্ঠায় জেগে ছিলেন। কয়েকটি পরিবারে তখনো রাতের খাবার চলছিল। এ সময় আচমকা পাকিস্তানি বাহিনী হানা দিলে প্রাণভয়ে আশ্রমবাসী দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন, মেয়েরা শাখা খুলে ফেলেন, সিঁদুর মুছে ফেলেন। মন্দির ও আশ্রমের বিভিন্ন স্থানে অনেকে লুকিয়ে পড়েন। পাকিস্তানি সেনারা বন্দুকের মুখে তাদের খুঁজে বের করে এবং মন্দিরের সামনে এনে সবাইকে দাঁড় করায়। পুরুষদের এক লাইনে এবং মহিলা ও শিশুদের অন্য লাইনে দাঁড় করানো হয়। পাকিস্তানি সেনারা সবার সামনে রমনা কালী মন্দিরের পুরোহিত পরমানন্দ গিরির পেট বেয়নেট দিয়ে ফেড়ে তাকে হত্যা করে। কুৎসিত আনন্দ-উল্লাস করতে করতে পাকিস্তানি সেনারা বলে, ‘নৌকায় ভোট দেয়ার মজা বোঝ এবার।’ এরপর বাকি পুরুষদের ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। জানা যায়, এখানে প্রায় ৮৫ থেকে ১০০ জনকে হত্যা করা হয়। ভয়াল এ দৃশ্য দেখে মহিলাদের আর্তচিৎকার আরম্ভ হলে তাদের বন্দুক দিয়ে পেটানো হয়। এতে অনেকে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পাকিস্তানিরা মরদেহগুলো জড়ো করে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আহতদের অনেকে এতে পুড়ে মারা যায়। সাক্ষ্যে কয়েকজন মহিলা ও শিশুর পুড়ে মারা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। 

এ হত্যাযজ্ঞের সময় রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছিল। আশ্রম ও মন্দিরের গোয়ালে প্রায় ৫০টির মতো গরু ছিল, গরুগুলোকেও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। ভয়াবহ আগুন, গোলাগুলি, মাংসপোড়া গন্ধ ও ভয়ার্ত চিৎকারে গোটা রমনা এলাকায় এক নারকীয় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। পাকিস্তানি বাহিনী রমনা অপারেশন শেষ করে ভোর ৪টার দিকে ফিরে যাওয়ার সময় লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা মহিলাদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন যুবতী মেয়েকে ধরে নিয়ে যায়, যাদের আর কখনো ফিরে পাওয়া যায়নি। এদের সংখ্যা প্রায় এক ডজন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা রমনা ত্যাগ করার আগে নির্দেশ দেয়, যাদের বাঁচিয়ে রাখা হলো তারা যেন পরদিনই ভারতে চলে যায়।

এক ভয়ংকর শোকবিহ্বল পরিবেশে রাত কাটানোর পর সব হারিয়ে বেদনায় মুহ্যমান মন্দির ও আশ্রমবাসীরা রমনা ত্যাগ করে ভোরে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। পেছনে রেখে যান রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের ধ্বংসস্তূপ আর শহীদ আপনজনদের লাশের দগ্ধাবশেষ অথবা ছাইভস্ম, যারা মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নে স্বাধীনতার বেদিমূলে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রান্ত হলে মন্দিরের পুরোহিত স্বামী পরমানন্দ গিরি মন্দির ও আশ্রমবাসীদের অভয় দিয়েছিলেন, পবিত্র ধর্মস্থান নিরাপদ। এখানে কোনো হামলা হবে না। ২৮ তারিখ ভোরে পরমানন্দ গিরির স্ত্রী সুচেতা গিরি, মা আনন্দময়ী আশ্রমের সন্ন্যাসিনী জটালী মাসহ বেঁচে যাওয়া সবাই রমনা এলাকা ত্যাগ করেন। 

প্রত্যক্ষদর্শীর জবানিতে

গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞকালে অকুস্থলে উপস্থিত যারা রমনা কালী মন্দির গণতদন্ত কমিশনের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাদের কয়েকজনের জবানবন্দির কিছু এখানে তুলে ধরা হলো:

রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে সে সময়ে বসবাস করতেন কমলা রায়। তিনি কমিশনকে বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী চারদিক ঘিরে ফেলার পর মেয়েরা প্রাণভয়ে কপালের সিঁদুর মুছে ফেলেন এবং হাতের শাঁখা খুলে ফেলেন। পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা আলাদা করে লাইনে দাঁড় করানো হয়। তারপর পুরুষদের গুলি করলে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অনেকে আধমরা অবস্থায় ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। পাকিস্তানি বাহিনী মৃত ও অর্ধমৃতদের জড়ো করে এবং ঘরের বেড়া তাদের ওপর ফেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েকটি শিশু ভয়ে চিৎকার করে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল দেখে পাকিস্তানি সেনারা ওদের আগুনে ছুড়ে ফেলে পুড়িয়ে মারে। ঠাকুরদা ধীরেন ঘোষকে হারানো শংকর লাল ঘোষ বলেন, ‘রমনা কালী মন্দিরের পুরোহিত পরমানন্দ গিরিকে পাকিস্তানিরা জিজ্ঞেস করে, তিনি হিন্দু না মুসলমান। পরমানন্দ হিন্দু ও এই মন্দিরের পুরোহিত বলে নিজের পরিচয় দিলে বেয়নেট দিয়ে পেট ফেঁড়ে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। স্ত্রীহারা রঘুবীর চৌহান বলেছেন, আমার ঘরে পাকিস্তানিরা আগুন লাগিয়ে দিলে আমি ও আমার ছেলে পিছন দিক দিয়ে পালিয়ে গেলেও আমার স্ত্রী বেরোতে পারেননি। সে আগুনে পুড়ে মারা যায়। স্বামীহারা গেনিয়া দাস বলেন, আমার স্বামী রঘুলাল দাসকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা লাইনে দাঁড় করাল। আমার স্বামীকে পাকিস্তানিরা জিজ্ঞেস করে তুমি কী খাবে? আমার স্বামী সিগারেট খেতে চাইলে তাকে সিগারেট দেয়া হয়। সিগারেট শেষ হওয়ার পর গুলি করে হত্যা করা হয়। পিতৃহারা লক্ষ্মী রানী ঠাকুর জানান, ২৫ মার্চ রাতে তার বাবা কিশোরী ঠাকুর তাকে দেখতে এসেছিলেন। কিশোরী বাবুর বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। তিনি লক্ষ্মী রানীকে বিয়ে দেন ঢাকায়, স্বামীর সঙ্গে লক্ষ্মী রমনা মন্দিরে থাকতেন। ২৭ মার্চ পাকিস্তানি কিশোরী বাবুকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে লাইনে দাঁড় করায় এবং গুলি করে হত্যা করে। পরে তার লাশ আগুনে ফেলে দেয়া হয়। দৈনিক ইত্তেফাকের সহসম্পাদক আহসানউল্লাহ গণতদন্ত কমিশনে প্রদত্ত সাক্ষ্যে বলেছিলেন, রমনার ধ্বংসযজ্ঞের তিনদিন পর আমি সেখানে এসে আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষের স্তূপীকৃত কঙ্কালের পাশাপাশি প্রায় ১৪টির মতো বিকৃত লাশ দেখতে পাই। সেগুলো ফুলে পচা গন্ধ বেরিয়েছিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির ও আশ্রমের ভিতরেও আরো ১০টির মতো লাশ দেখতে পাই।’ রমনা কালী মন্দিরের অদূরে শাহবাজ মসজিদের খাদেম প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল আলী ফকির বলেছিলেন, ‘রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা শুরু করার পর সবাইকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে বলে। লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো পুরুষ মহিলা সবাই তা সমস্বরে উচ্চারণ করেন। এর পরই গুলি করা হয়।’

রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে একাত্তরের ২৭ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলায় নিহত শহীদদের মধ্যে অধিকাংশের নাম সংবলিত একটি স্মৃতিফলক বর্তমানে রমনা কালী মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত। গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার পরিবারগুলো বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে একবার কিছু আর্থিক অনুদান পেয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো রাষ্ট্রের তরফ থেকে আর কোনো সহায়তা কখনো পায়নি। গণহত্যার শিকার হয়েছিল যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা অন্তত ‘শহীদ’-এর স্বীকৃতিটুকু পাবেন এ দাবি নিয়ে সরকারের দপ্তরগুলোয় দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।


সহায়পঞ্জি

১. রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ গণতদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন

২. মুনতাসীর মামুন (সম্পা.), মুক্তিযুদ্ধ কোষ, ৫ম খণ্ড

৩. মুনতাসীর মামুন, স্মৃতি বিস্মৃতির ঢাকা নগরী

৪. মুনতাসীর মামুন, হারিয়ে যাওয়া ছবির খোঁজে


কৃতজ্ঞতা

বিপুল রায়, সাধারণ সম্পাদক, ‘১৯৭১ সালের ক্ষতিগ্রস্ত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার পুনর্বাসন কমিটি’, রমনা


মিঠুন সাহা: শিক্ষক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়