দুই দেশের সম্পর্ককে এখন বলা হচ্ছে ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্ব’ বা কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’। এর মধ্যে অবশ্যই ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়টিও চলে আসে।

তবে শুধু বাণিজ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমরা প্রায় ৮০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছি, অথচ তার আগের বছরেও আমদানির অর্থমূল্য ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এক্ষেত্রে পার্থক্যটা খুব পরিষ্কার। কিন্তু আমাদের গুরুত্বটা শুধু এ ঘাটতি বা বাণিজ্য ভারসাম্যের দিকে তাকিয়ে বোঝা যাবে না। এখানে একটা বিষয় অবশ্যই বোঝার আছে, সেটা হলো বাংলাদেশের পুরো রফতানি খাতও কিন্তু চীন থেকে আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কাজেই বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের গুরুত্ব অন্যরকম।

অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকে আমি এভাবে মূল্যায়ন করতে চাই যে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতিকে যদি আমরা আমলে নিই, তাহলে এটা নিয়ে শুধু চিন্তিত না হয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তরে চীনের সহযোগিতা গ্রহণ করা উচিত।

আমরা সেটা কীভাবে করতে পারি? আমাদের রফতানি এখনো অনেকাংশে চীন থেকে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক বলেন, ওষুধ বলেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই আমরা চীন থেকে কাঁচামাল আনছি। সেগুলো দিয়ে পণ্য তৈরি করে আবার সারা পৃথিবীতে রফতানি করছি।

কাজেই আমরা যে কাঁচামালগুলো আমদানি করি, সেগুলো যদি চীনা বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশেই তৈরি করতে পারতাম, তাহলে একদিকে আমাদের উৎপাদন ও সরবরাহের সময় অনেক কমে যেত, বিশেষ করে গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে লজিস্টিক খরচও কমত। এতে আমাদের অর্থনীতিও আরো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকত।

আমাদের এখন উচিত চীনা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, যাতে তারা বাংলাদেশে আমাদের প্রয়োজনীয় কাঁচামালগুলো উৎপাদন করেন। আমরা সেগুলো আমাদের রফতানি পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করতে পারি। প্রয়োজনে চীনা বিনিয়োগকারীরা এসব পণ্য চীনসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও রফতানি করতে পারেন। বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এটা সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান। বলা যায়, আমাদের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য এটি সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গগুলোর একটি হতে পারে।

জাতিসংঘ সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহের তথ্য প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৪—এ পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

অথচ বাংলাদেশের প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ আকারের অর্থনীতি কম্বোডিয়ায় এ সময়ে বিনিয়োগ হয়েছে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এ বিনিয়োগ কোথা থেকে আসছে, তা সহজেই বোঝা যায়। এর ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমেরিকান অ্যাপারেল মার্কেটে বাংলাদেশ বা চীনের প্রায় সবার রফতানি নেতিবাচক বা ঋণাত্মক। অথচ কম্বোডিয়া প্রবৃদ্ধিতে আছে।

কম্বোডিয়ার রফতানি পণ্যের প্রায় সব অংশই চীনে তৈরি হয়। তারা হয়তো একটি ধাপ বা সামান্য অংশ কম্বোডিয়ায় উৎপাদন করে, একটা ট্যাগ লাগিয়ে আমেরিকান মার্কেটে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তাদের প্রবৃদ্ধিও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। এই যে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তারা আকৃষ্ট করে নিয়ে যাচ্ছে, এটা হয়তো বাংলাদেশেও আসতে পারত। আমরা এটাকে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের অর্থনীতিতে অনেক বড় একটা প্রভাব পড়ত।

আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, এখানে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মতো ভৌত অবকাঠামো ছিল কিনা, তাদের প্রতি আমাদের সেই আগ্রহ ছিল কিনা, কিংবা আমরা তাদের যথাযথভাবে স্বাগত জানিয়েছি কিনা। এসব বিষয় নিয়ে গভীর বিচার-বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

আমাদের দুর্বলতা ছিল। কারণ চীন বিনিয়োগের গন্তব্য খুঁজেছে। এমন নয় যে তারা বাংলাদেশে আসেনি। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খুঁজেছে, এখানে এসেছে। আমাদের এখানে হয়তো তারা সাড়া না পেয়েই কম্বোডিয়ায় গেছে।

এখন আমাদের নতুন সুযোগ এসেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করে এসেছেন। তিনি সফর করে আসার ঠিক ওই মাসেই, জুনে আমরা চীনের কুনমিংয়ে চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোজিশনে গিয়েছিলাম। সেই সময় ‘বাংলাদেশ ডে’তে বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে আমরা একটি ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের আয়োজন করেছিলাম। অর্ধেক দিন ছিল বাণিজ্যের ওপর এবং অর্ধেক দিন ছিল বিনিয়োগের ওপর।

সেখানে প্রায় ২০০ চীনা ব্যবসায়ী যোগ দিয়েছিলেন। আমাদের শুধু একটি বিষয়ই মনে হয়েছে, চীনা বিনিয়োগকারীরা প্রচুর পরিমাণ বিনিয়োগযোগ্য অর্থ নিয়ে বসে আছেন, বিনিয়োগের গন্তব্য খুঁজছেন এবং তারা বাংলাদেশেও আসতে চান। এ সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

আমরা যদি তাদের স্বাগত জানাতে পারি, বাংলাদেশে আনতে পারি, তাহলে আমাদের রফতানি বাড়বে, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প সুসংহত হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। চীনা বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আমাদের অর্থনীতির বর্তমান কাঠামোটাই পরিবর্তিত হতে পারে।

তবে সেই সুযোগকে আমাদের দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগাতে হবে। তাদের যদি বাংলাদেশে নিয়ে আসতে পারি, তাদের প্রযুক্তি, বিশেষত বিনিয়োগ ও আর্থিক শক্তিমত্তাকে যদি বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে চীনা বিনিয়োগ আমাদের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

চীনে রফতানি বৃদ্ধির জন্য আমাদের কার্যক্রম ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শুধু হংকং ও চীনেই আগামী বছর আমরা ৬টি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করব।