সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ২০১৮ সালে ছোট পরিসরে শুরু করেন চীন থেকে পণ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশে সরবরাহের ব্যবসা। পরবর্তী সময়ে সেই উদ্যোগই রূপ নেয় অনলাইনভিত্তিক ক্রস-বর্ডার বাণিজ্য প্লাটফর্ম ‘হোলসেল প্লাস’-এ।

হোলসেল প্লাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ বণিক বার্তাকে জানান, শুরুর দিকে ঢাকার চকবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তার কাছে চীন থেকে পণ্য সংগ্রহ করে সরবরাহ করতেন। পুরো কার্যক্রমই তখন ছিল অফলাইননির্ভর।

‘পড়াশোনার পাশাপাশি চীনের বাজার কাছ থেকে দেখতে গিয়ে বুঝতে পারি, এখান থেকে বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার বড় সুযোগ রয়েছে। সেই চিন্তা থেকেই ছোট পরিসরে কাজ শুরু করি’, বলেন তানভীর মাহমুদ।

শুরুর দিকে বাংলাদেশে মাত্র তিন-চারজন কর্মী নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তবে ব্যবসার গতিপথে বড় পরিবর্তন আসে ২০২০ সালের কভিড-১৯ মহামারীর সময়। সে সময় দেশে মেডিকেল ও সুরক্ষাসামগ্রীর চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। চীন থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশে সরবরাহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য সাড়া পায়। ওই অভিজ্ঞতাই ব্যবসাটিকে বৃহত্তর ও প্রযুক্তিনির্ভর প্লাটফর্মে রূপ দেয়ার চিন্তা সামনে নিয়ে আসে।

কভিড-পরবর্তী সময়ে কার্যক্রমকে শুধু অফলাইন সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অনলাইনে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০২৩ সালে চালু করা হয় ‘হোলসেল প্লাস’। পরবর্তী সময়ে এ কার্যক্রম আরো বিস্তৃত হয়ে হোলসেল প্লাস নামে পরিচালিত হতে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বর্তমানে তাদের প্লাটফর্মের মাধ্যমে চীনের প্রায় ১০ লাখ সরবরাহকারীর পণ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে।

হোলসেল প্লাসের ব্যবসায়িক মডেলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য চীন থেকে পণ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে সহজ করা। একজন উদ্যোক্তাকে সরাসরি চীনে গিয়ে সরবরাহকারী খোঁজা, ভাষাগত যোগাযোগ, পণ্য সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়া নিজে সামলানোর পরিবর্তে অনলাইন প্লাটফর্ম থেকেই পণ্য খুঁজে অর্ডার করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।

গ্রাহকের অর্ডার পাওয়ার পর চীনে পণ্য সংগ্রহ, ওয়্যারহাউজিং এবং বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে প্রতিষ্ঠানটি। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চীনে প্রায় ১০ হাজার বর্গফুটের নিজস্ব ওয়্যারহাউজ রয়েছে বলে জানিয়েছে হোলসেল প্লাস। সেখানে ছয়জন চীনা নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকার গ্রিন রোডের কার্যালয়ে কাজ করছেন ১৬ জন।

প্রতিষ্ঠানটির মতে, ছোট উদ্যোক্তাদের চীন থেকে পণ্য আমদানিতে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বড় অর্ডার বা ন্যূনতম ক্রয় পরিমাণের চাপ। হোলসেল প্লাসে ন্যূনতম ১ হাজার টাকার অর্ডার করা যায়। একটি পণ্যের দাম ১ হাজার টাকা হলে সেটি এককভাবেও অর্ডার করা সম্ভব। আবার কোনো পণ্যের ২০ ইউনিটের মোট মূল্য ১ হাজার টাকা হলেও সেই অর্ডার গ্রহণ করা হয়।

অর্ডারের সময় বর্তমানে পণ্যের মূল্যের ৬৫ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়। এরপর চীনে পণ্য সংগ্রহ ও বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। পণ্য বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর প্রযোজ্য ভ্যাট, ট্যাক্স ও শিপিং-সংক্রান্ত খরচ পরিশোধের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পণ্য হস্তান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, সাধারণত চীন থেকে বাংলাদেশে পণ্য পৌঁছাতে ১২ থেকে ২৪ দিন সময় লাগে।

তবে ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যে সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। পরিবহন, কাস্টমস, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার প্রভাব সরাসরি এ ধরনের ব্যবসার ওপর পড়ে। এমনই এক ঘটনায় বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল বলে জানান তানভীর মাহমুদ।

তিনি বলেন, ‘ওই সময় আমাদের বড় একটি ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। অনেক গ্রাহকের পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অর্থ ফেরত দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ২ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছিল।’

প্রায় ১০ লাখ টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগ নিয়ে শুরু হয়েছিল ব্যবসাটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কত, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা প্রকাশ করতে চাননি তানভীর মাহমুদ। তবে ছোট পরিসরের অফলাইন পণ্য সরবরাহের কার্যক্রম থেকে প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রযুক্তিনির্ভর ক্রস-বর্ডার বাণিজ্য প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র হলেও বাংলাদেশের অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য দেশটির বিপুল পণ্যবাজারে সরাসরি প্রবেশ এখনো সহজ নয়। সরবরাহকারী নির্বাচন, ভাষাগত বাধা, পেমেন্ট, পণ্য সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক পরিবহন ও আমদানি প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এ প্রক্রিয়া বেশ জটিল হতে পারে। হোলসেল প্লাস মূলত এ ব্যবধানটিকেই ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখছে।

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, একজন ক্ষুদ্র অনলাইন বিক্রেতা বা নতুন উদ্যোক্তাও যেন তুলনামূলক কম মূলধনে চীনের বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণ করতে পারেন।

২০১৮ সালে পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করা ছোট উদ্যোগের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি, চীনে নিজস্ব লজিস্টিক অবকাঠামো, বড় সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশী গ্রাহকভিত্তি। চীনের উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতাকে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসাই এখন হোলসেল প্লাসের ব্যবসায়িক মডেলের মূল জায়গা।