তবে একটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে, বাংলাদেশ এমন সব পণ্য উৎপাদন করে যা চীনের বাজারে সহজে এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি করা সম্ভব কিনা। তবে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ম্যানুফ্যাকচারিং খাত বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসারের ফলে বিগত দুই দশকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য দ্রুত বেড়েছে।
আশির দশকে বাংলাদেশ যখন তার অর্থনীতিকে উদারীকরণের পথে নিয়ে যেতে শুরু করে, তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। চীন থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে; কয়েক দশক আগে তা ১০০ কোটি ডলারেরও কম ছিল। বর্তমানে সেটি বেড়ে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বাংলাদেশের মোট আমদানির ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে চীন থেকে। এর বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। চীনের ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (এপিটিএ)-এর আওতায় শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধি অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। বিগত পাঁচ বছরে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। যদিও অতি সম্প্রতি চীনে বাংলাদেশের রফতানি ১০০ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে, তবে সামগ্রিক বাণিজ্যের চিত্রটি চীন থেকে আমদানির আধিক্যের কারণে ভারসাম্যহীন হয়ে আছে। ফলে বাস্তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন থেকে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের মধ্যে; অথচ একই সময়ে চীনে দেশটির রফতানির পরিমাণ বছরে ১২০ কোটি বিলিয়ন ডলারের নিচে সীমাবদ্ধ ছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান ম্যানুফ্যাকচারিং খাতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বৃহত্তম উৎস হলো চীন। বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামালের ৮০ শতাংশেরও বেশি চীন থেকে আসে। চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানীকৃত পণ্যের তালিকায় রয়েছে যন্ত্রপাতি ও শিল্প-সরঞ্জাম; বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য; সুতা, কাপড় ও আনুষঙ্গিক উপকরণ; রাসায়নিক ও সার; লোহা ও ইস্পাতজাত পণ্য; প্লাস্টিক ও কাঁচামাল এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে অনেক কম বৈচিত্র্যের পণ্য চীনে রফতানি করে; এর মধ্যে রয়েছে সীমিত পরিমাণে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, কৃষিপণ্য এবং সীমিত পরিসরে ওষুধ। তৈরি পোশাক রফতানির বিষয়টি বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করে এ কারণে যে চীনে বাংলাদেশের মোট রফতানির ৮০ শতাংশেরও বেশি জুড়ে রয়েছে তৈরি পোশাক—অথচ চীন নিজেই বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। যদিও চীন বাংলাদেশের জন্য বিপুলসংখ্যক পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা দিয়েছে, তবুও সীমিত রফতানি সক্ষমতা এবং কেবল পোশাক রফতানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে এ সুবিধাগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হিমশিম খেয়েছে। চীনের অনুকূলে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব। এছাড়া চীনা বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের গুণমান উন্নয়ন ও বাজার প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশকে তীব্র প্রতিযোগিতার মোকাবেলা করতে হয়।
নিঃসন্দেহে চীনের সঙ্গে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বায়ন ও উদারীকরণের সূচনা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ বাধা অপসারণের পর থেকে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি একটি সাধারণ বৈশ্বিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তা সত্ত্বেও এটি স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি সামাল দেয়া কঠিন চ্যালেঞ্জের বিষয়। বিপুলসংখ্যক পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা প্রদান করা
সত্ত্বেও চীনে বাংলাদেশের রফতানি খুব একটা বৃদ্ধি না পাওয়ার একটি বড় কারণ ‘অশুল্ক বাধা’। এর মধ্যে অনেক বাধাই দূর করা সম্ভব। এর মধ্যে যেগুলো উল্লেখযোগ্য তা হলো খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে দুবার ল্যাবরেটরি পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা এবং পরীক্ষার ফলাফল পেতে দীর্ঘসূত্রতা দূর করা।
চীনে রফতানি বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে একটি বিস্তারিত ও সময়াবদ্ধ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের পূর্ণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, বিশেষায়িত পাটপণ্য, আইটি আউটসোর্সিং এবং উচ্চমানের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের মতো সম্ভাবনাময় পণ্যগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে যেসব খাত এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি বা নতুনভাবে বিকশিত হচ্ছে, সেগুলোর ওপর মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কৃষি প্রক্রিয়াজাত ও সামুদ্রিক পণ্যকে এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে, কারণ চীন ক্রমেই সামুদ্রিক খাদ্যের আমদানি বাড়াচ্ছে এবং ফলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছে। চীন যেহেতু তাদের অভ্যন্তরীণ চামড়া প্রক্রিয়াকরণ বা ট্যানিং কার্যক্রম কমিয়ে আনছে, তাই তাদের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের চামড়া খাতটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হতে পারে। এছাড়া পাট ও পরিবেশবান্ধব পণ্যও রফতানির ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উঠে আসতে পারে—বিশেষ করে চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যের ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য এবং বৈচিত্র্যময় পাটপণ্য তৈরির ক্ষেত্রে, যা চীনের পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন’ উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একইভাবে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ চীনের স্বাস্থ্যসেবা বাজারে ‘অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস’ (এপিআই) এবং প্রস্তুতকৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম রফতানির ক্ষেত্রে জোরালো সম্ভাবনা গড়ে তুলতে পারে। এর পাশাপাশি আইটি আউটসোর্সিং, ডিজিটাল অর্থনীতির সেবা এবং ‘নীল অর্থনীতি’ বা সমুদ্র-অর্থনীতিভিত্তিক পণ্যের মতো উদীয়মান খাতগুলোকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। হালকা প্রকৌশল ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে, ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদনের জন্য চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগকে আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, যাতে উৎপাদিত পণ্যগুলো চীনে পুনরায় রফতানি করা যায়। চীনের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে রফতানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্য ও পরিমাণ বাড়াতে এ উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এক্ষেত্রে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো চীনের গুণগত মানদণ্ড বা মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা এবং এসব খাতে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে সাফল্য অর্জন।
সাধারণভাবে বলতে গেলে রফতানিমুখী শিল্পে আরো বেশি চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং লজিস্টিকস, মানদণ্ড পরিপালন ও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণের উন্নয়নই হবে চীনে রফতানি বাড়ার মূল চালিকাশক্তি। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর সরকারি পর্যায়ে সমঝোতার ভিত্তিতে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ (সিইআইজি) প্রতিষ্ঠার সাম্প্রতিক উদ্যোগটি দেশের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি চীনা ও অন্যান্য বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে, যা একই সঙ্গে চীনে রফতানি বৃদ্ধিতেও সহায়তা করবে।
সামগ্রিকভাবে ম্যানুফ্যাকচারিং প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তবে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম নীতিগত লক্ষ্য। এ ঘাটতি হ্রাস করা সম্ভব হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, ম্যানুফ্যাকচারিং খাত ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ, ঋণ ও কারিগরি সহযোগিতা এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনের অবদান বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরো সুদৃঢ় হবে।
তাছাড়া ‘দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা’-এর কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করা উভয় দেশের জন্যই পারস্পরিকভাবে লাভজনক হতে পারে। উল্লেখ্য, এ সহযোগিতা ব্যবস্থাটি পারস্পরিক সুবিধা, একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, যৌথ প্রবৃদ্ধির সুযোগ এবং কোনো শর্তারোপ না করার মতো নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এছাড়া ‘উন্নয়ন চুক্তি’-এর এ আধুনিক ধারণাটি এমন এক উন্নয়ন সহায়তার ব্যবস্থা করে, যা পাঁচটি ভিন্ন স্তরে কাজ করে: বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, ঋণ সুবিধা এবং অনুদান। স্বাভাবিকভাবেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নিবিড় সম্পৃক্ততা বাণিজ্যসহ উল্লিখিত পাঁচটি ক্ষেত্রে আরো ব্যাপক সহযোগিতার জন্য একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তার জন্য একটি সামগ্রিক কাঠামো প্রদান করবে। উভয় দেশের মধ্যে এ ধরনের পারস্পরিক সম্পৃক্ততা বাণিজ্যসহ পাঁচটি ক্ষেত্রে আরো ব্যাপক সহযোগিতার জন্য একটি বড় আকর্ষণ হিসেবেও কাজ করবে, যা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামগ্রিক সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে। কার্যকারিতার দিক থেকে বিবেচনা করলে উন্নয়নের এ নতুন সমঝোতাটি যৌথ দায়বদ্ধতার নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া; এর মাধ্যমে উভয় দেশ নিজেদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যৌথভাবে প্রচেষ্টা চালাতে পারবে। এ সমঝোতা বাংলাদেশকে অধিকতর সহায়তা ও উন্নত বাজার সুবিধা লাভের প্রচেষ্টায় সহায়তা করবে।
বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষকরা প্রায়ই যুক্তি দেন যে ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট’ (জিটিএপি) মডেলের ওপর ভিত্তি করে সম্পাদিত একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) যেকোনো দুই দেশের বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর সমাধানে সহায়ক হতে পারে। চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বেশকিছু সুবিধা থাকতে পারে, যেমন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় প্রাপ্ত সুবিধাগুলো অধিকতর স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হয়, কারণ এগুলো একটি চুক্তিবদ্ধ কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত, যা রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রণোদনা জোগায়। একতরফা বাণিজ্যের বিপরীতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অশুল্ক বাধা দূর করার বিধান থাকে এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি গভীরতর অর্থনৈতিক সংহতি, বাণিজ্য সহজীকরণ, মানদণ্ডের সামঞ্জস্য বিধান এবং পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ ও চীন উন্নয়নের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে একটি ‘কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট’ (সেপা) বা ‘ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’র বিষয়ে আলোচনা করতে পারে। এ চুক্তিতে ভবিষ্যতের জন্য তাদের যৌথ লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং এতে পারস্পরিকভাবে সম্মত সব খাতকে শামিল করা যেতে পারে; পাশাপাশি উভয় দেশ একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা সেপা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও নির্ধারণ করতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও ব্যাপক। চীন যখন এ অঞ্চলে তার সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করছে এবং মূলত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর মাধ্যমে এশীয় সংযোগ ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিচ্ছে, তখন ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (এআইআইবি)-এর মতো উদ্যোগগুলোতে তারা বিপুল সম্পদ কাজে লাগাতে সক্ষম হচ্ছে, যা সম্ভবত অন্যান্য আর্থিক উৎসের তুলনায় অধিকতর কার্যকর ভূমিকা রাখবে। চীনের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি তাদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এসব উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চীনে বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকেও সহায়তা জোগাবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সামষ্টিক ও খাতভিত্তিক—উভয় পর্যায়েই নীতিগত সামঞ্জস্যের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে উত্তরণের পথে শিল্প খাতে (বিশেষত ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে) বিনিয়োগই সম্ভবত বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আন্তঃখাত সংযোগ বা ‘লিঙ্কেজ’ সৃষ্টি করবে। এ প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে উন্নয়ন করিডোর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে (এসইজে) ‘গ্রোথ পোল’ বা প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সমন্বিত করা। এর মাধ্যমে অবকাঠামো, আইনি ও নীতিগত কাঠামো, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের মতো বিষয়গুলোতে, যা বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বিবেচিত—বিভিন্ন খাতে একই সঙ্গে ও সমন্বিতভাবে বিনিয়োগের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রতিযোগিতামূলক শিল্পের জন্য তুলনামূলক সুবিধাযুক্ত নির্দিষ্ট খাতগুলোর বিকাশে উপায় খুঁজে বের করা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাজারের সঙ্গে ও বাজারের অভ্যন্তরে সংযোগ জোরদার এবং রফতানিচালিত প্রবৃদ্ধির সুফল ঘরে তোলা—বাংলাদেশের জন্য এখন অত্যন্ত জরুরি। স্বাভাবিকভাবেই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো টেকসই নীতি-প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হলে তা বেসরকারি খাতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশকে বেশকিছু বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। যেমন কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক উপায়ে সর্বোত্তম অবকাঠামো সেবা প্রদান করা সম্ভব এবং নির্দিষ্ট কোনো অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীজনকে সর্বাধিক কার্যকর ও দক্ষভাবে সম্পৃক্ত করতে সরকার কী ধরনের কৌশল বা ব্যবস্থা (যেমন আর্থিক, নিয়ন্ত্রণমূলক ও অংশগ্রহণমূলক) গ্রহণ করতে পারে। সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এমন একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগ চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের পূর্ণ সুফল লাভের পথও প্রশস্ত করবে।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম), ঢাকা





