অনেকদিন থেকেই রাজধানীতে একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখছিলেন জাহিদুল ইসলাম। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। মধ্যবিত্ত এ চাকরিজীবীর স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসে একটি ব্যাংক। নিজের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় আর ব্যাংকঋণে বছর দুয়েক আগে ছোট আকারের একটি ফ্ল্যাট কেনেন জাহিদুল ইসলাম। এক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়েছেন ১৬ লাখ টাকা। ব্যাংকঋণের সুদের সঙ্গে প্রতি বছর বাড়তি ৩ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে এ চাকরিজীবীকে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকের নিত্যনতুন ফি আর সরকারি ভ্যাট।

দুই বছরেই ব্যাংকঋণ আর সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছেন জাহিদুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এমনিতেই নাভিশ্বাস অবস্থা। এর সঙ্গে বছর শেষে যুক্ত হচ্ছে আয়কর। ব্যাংকের প্রতিটি লেনদেন থেকে শুরু করে হিসাব রাখার বিপরীতে গুনতে হচ্ছে ফি। সব ধরনের ফির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। এর বাইরে দিতে হচ্ছে আবগারি শুল্ক। এভাবে তো জীবন চালানো যায় না।

জাহিদুল ইসলামের জীবনের গল্পটিই ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সব গ্রাহকের। ব্যাংকের হিসাব খোলা থেকে শুরু করে প্রতিটি সেবার বিপরীতেই গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ৪ থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বা শুল্ক। সেবার বিপরীতে ব্যাংক যে পরিমাণ অর্থ কাটছে, সে অনুপাতেই গ্রাহকদের কাছ থেকে শুল্ক আদায় করা হচ্ছে। কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) না থাকলে আমানতের সুদ বা মুনাফার ওপারও ভ্যাট গুনতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ হারে। এর বাইরে ঋণ কিংবা আমানত উভয় ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে আবগারি শুল্ক। সেবার বিপরীতে উচ্চহারের এ শুল্ককে সঞ্চয়ের প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

সেবার বিপরীতে শুল্কই শুধু নয়, করপোরেট করহারকেও দেশের ব্যাংক খাতের বিকাশে প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা হচ্ছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এমন ব্যাংকগুলোকে কর পরিশোধ করতে হচ্ছে পরিচালন মুনাফার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। তালিকাবহির্ভূত ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করতে হচ্ছে এর চেয়েও বেশি তথা ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোনো ব্যাংক বছর শেষে ১০০ টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করলে সেখান থেকে সরকারকে ৪০ টাকা কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ যেকোনো কেনাকাটায় পরিশোধ করতে হয় ১৫ শতাংশ ভ্যাট।

ব্যাংক খাতের বিদ্যমান করপোটের করহারকে সীমাতিরিক্ত বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের করপোরেট কর অনেক বেশি। এটিকে অবশ্যই সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। একই দাবি করছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের করপোরেট করহারকে কোনোভাবেই যৌক্তিক বলার সুযোগ নেই। পরিচালন মুনাফার ওপর ব্যাংকগুলোকে সাড়ে ৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার পরিচালন মুনাফা থেকে ব্যাংক যে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করে, সেটির ওপরও সাড়ে ৩৭ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে। একই অর্থের ওপর দুবার কর আদায় করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। গ্রাহকদের ওপরও বিভিন্ন ধরনের অযৌক্তিক ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। অবগারি শুল্ক সাধারণ মানুষকে সঞ্চয়বিমুখ করছে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এর আগে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ব্যাংক খাতের মার্জার-অ্যাকুইজিশনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এ ঘোষণার কোনো বাস্তবায়ন আমরা দেখিনি। দেশের ব্যাংক খাতের মঙ্গলের জন্য অবশ্যই মার্জার-অ্যাকুইজিশন নীতির প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সুশাসন ফেরাতে ব্যাংক কোম্পানি আইনকে আরো বেশি সুর্নিদিষ্ট ও সময়োপযোগী করতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে আরো বেশি স্বচ্ছতা আনা দরকার।

প্রায় সব সেবার বিপরীতেই গ্রাহকদের কাছ থেকে ফি আদায় করছে ব্যাংকগুলো। আর প্রত্যেক ফির বিপরীতে গ্রাহকদের ৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট পরিশোধ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ সেবার ফির বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধ করতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ হারে। এর বাইরে আছে নির্দিষ্ট অংকের অবগারি শুল্ক।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অর্থ লেনদেনের ওপর ভ্যাট আরোপ করাকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। ব্র্যাক ব্যাংকের এ চেয়ারম্যান বণিক বার্তাকে বলেন, বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আর সুশাসনের ঘাটতির কারণে দেশের ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য সবল ব্যাংক অপরিহার্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য হলো বাংলাদেশের ব্যাংক খাত খুবই দুর্বল। অনেকেই মনে করেন ব্যাংকগুলো বছর শেষে অনেক মুনাফা করে। কিন্তু সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) ও ইকুইটির বিপরীতে আয়ের (আরওই) হার সেটি বলছে না। একটি ব্যাংকের আরওএ ও আরওই যে পর্যায়ে থাকা দরকার, দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকেরই তা নেই। এ কারণে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা প্রত্যাশিত ডিভিডেন্ড পাচ্ছেন না। পুঁজিবাজারে ব্যাংকের শেয়ারের দামও বাড়ছে না। উচ্চ করপোরেট করহার আর ঋণ ও আমানতের সুদহারের বিধিনিষেধের কারণেই এটি হচ্ছে। ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হলে বাধ্য করার নীতি থেকে বেরোতে হবে। ব্যাংকের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।