রান্নার জ্বালানি হিসাবে একসময় গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক হারে কাঠ-খড়ি পোড়ানোর প্রচলন ছিল। আর শহরাঞ্চলে ব্যবহার হতো কেরোসিনের চুলা। প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর কেরোসিনের চুলা বিলুপ্ত হয়েছে বহু বছর আগে। অন্যদিকে, গ্রামীণ জনজীবনে কাঠ-খড়ি পোড়ানোর প্রচলনও কমেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রত্যন্ত জনজীবনে এখন পৌঁছে গেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কারণে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার সুবাদে রান্নায় এখন এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে এ খাতে অর্থনৈতিক বিনিয়োগও বাড়ছে। এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ায় এ খাতে এখন ১৮-১৯টি কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে। সামগ্রিকভাবে এসব বিনিয়োগ এখন বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। যার পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা।
দেশে এলপি গ্যাসের এ প্রসার দুই-এক বছরের নয়। শুরুটা হয়েছিল ৯০-এর দশকে। শুরুতে জ্বালানি হিসেবে পণ্যটির পরিচিতি না থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল অপারেটরদের। বিশেষ করে নিরাপত্তা, সহজলভ্যতা ও সচেতনতা বিবেচনায় গ্রাহক চাহিদা ছিল ধীরগতির। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে গত এক দশকে অন্যান্য পণ্যের মতো সহজলভ্য হয়েছে এলপি গ্যাসও। এই সময়ে বাজার প্রসারিত হয়েছে দ্রুতগতিতে। এলপিজি সহজলভ্য হওয়ায় বর্তমানে রান্নার জ্বালানি হিসেবে গ্রাহকের কাছে সমাদৃত হচ্ছে।
বেসরকারি এলপি উদ্যোক্তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪০ লাখ গ্রাহক এ গ্যাস ব্যবহার করছে। যার মাধ্যমে তিন কোটি মানুষ সুবিধা পাচ্ছে। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কাছে পণ্যটির পরিচিতি পৌঁছেছে মূলত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে। এলপিজি গ্যাসের বাজার প্রসারে শুরুতে এ খাতে বিনিয়োগ করেছে বসুন্ধরা, ওমেরার মতো কোম্পানি। বিদেশ থেকে তরলীকৃত এই গ্যাস দেশে আমদানির পর বোতলজাত করে শুরু হয় ব্যবসায়িক কার্যক্রম। এরপর এসব পণ্য পরিবেশক নিয়োগ করে খুচরা বাজারে নিয়ে গেছেন তারা। এলপিজি অপারেটরদের ভাষ্যে, চাইলে গ্রাহক এখন ৩০ মিনিটে এলপি গ্যাস সরবরাহ পাবেন।
এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা বর্তমানে ১১ লাখ টন। আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ এ চাহিদা ২৫-৩০ লাখ টনে উন্নীত হবে বলে জানান এ খাতের ব্যবসায়ীরা। বেসরকারি ১৮টি অপারেটর স্থানীয় চাহিদার ৯৫ শতাংশ পূরণ করছে। বর্তমানে গৃহস্থালি চাহিদার ৫০ শতাংশ এলপি গ্যাসের সরবরাহ সক্ষমতার কথাও জানিয়েছেন তারা। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট বিবেচনায় এলপি গ্যাস খাতে সরকারের বিনিয়োগ সহায়তা বাড়লে আবাসিক গ্যাসের চাহিদার বড় একটি অংশই এলপি গ্যাস দিয়ে পূরণ করা সম্ভব।
দেশের এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়ায় এ খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে ব্যাপক হারে। কারখানা, কার্যালয়, বন্দর, পরিবেশক, ডিলার থেকে শুরু করে বর্তমানে সাড়ে ৪ লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে খাতটিতে। তবে এ খাতে পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ১০ লাখ মানুষের। বাজারে পণ্যটি পৌঁছে দিতে বিভিন্ন কোম্পানির অন্তত ৫ হাজার ডিলার এবং ৪৫ হাজার খুচরা বিক্রেতা রয়েছে। বর্তমানে ১৩টি রেগুলেটরের মাধ্যমে এলপি ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। এ খাতে কোম্পানিগুলোর সাড়ে ৩ কোটি সিলিন্ডার সরবরাহ রয়েছে।
দেশের এলপি খাত আগামীতে কতটা প্রসারিত হবে, এ খাতে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ তা জানান দেয়। বর্তমানে এলপি গ্যাস ব্যবসা সম্প্রসারণ খাতে ৫৮টি কোম্পানি লাইসেন্স নিয়েছে। এরই মধ্যে ২৭টি অপারেটর ব্যবসা পরিচালনা করছে। বাকিরা অপারেশনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি খাতটিতে বিনিয়োগ ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ছোট বাজারে অনেকগুলো কোম্পানি চলে আসায় এলপি ব্যবসায় অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এতে ছোট কোম্পানিগুলো মূলধন সংকটে পড়ছে। যারা বিনিয়োগে আসেনি তারাও এখন বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছেন।
প্রযুক্তির কল্যাণে এবং ক্লিন ফুয়েলের ব্যবহার বাড়ায় এলপি গ্যাস এখন আর রান্নাঘরে আবদ্ধ নেই। যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে এলপি গ্যাসের ব্যবহার জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গাড়ির ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব, মাইলেজ এবং নিরাপত্তা বিবেচনায় অটোগ্যাস জনপ্রিয় হচ্ছে। নতুন ভবনে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে রেটিকুলেটেড সিস্টেমও। মূলত সিলিন্ডার বহনের ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতে আরো এক ধাপ সহজলভ্য করছে অপারেটররা। এলপি গ্যাসের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং গ্রাহক সুবিধা আরো বাড়ানো গেলে বাজার প্রসারিত হবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। গ্রাহক যাতে পণ্যটি তার হাতের কাছে পেতে পারে সেজন্য এলপি গ্যাসের সাটেলাইন ব্যবস্থাপনা, বার্জ ও গ্যাসের মতো অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।





