আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে এভিয়েশন খাতে আরোপিত বিভিন্ন ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দেশের বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো। এ বিষয়ে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টদের সংগঠন এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সেক্রেটারি জেনারেল ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল ইসলাম

আগামী বাজেটে সরকারের কাছে এয়ারলাইনসগুলোর প্রত্যাশা কী?

আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষত আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে এভিয়েশনের হাব তৈরি করতে চান। যার অংশ হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল হচ্ছে। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। সেখানে সরকারি তরফ থেকে প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। সেই বিনিয়োগকে ফলপ্রসূ করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক এভিয়েশন ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে। এভিয়েশন ইকোসিস্টেমের বড় অংশটি হলো এয়ারলাইনস। এয়ারলাইনস টিকে না থাকলে কানেক্টিভিটি থাকবে না। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে উন্নয়ন চলমান রয়েছে, অভ্যন্তরীণ এয়ার যোগাযোগ কিন্তু এর বড় একটি অনুষঙ্গ। কিন্ত আমাদের দেশে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো ব্যবসায় টিকে থাকতে পারছে না। কেন টিকে থাকতে পারছে না, তার মূল অনুসন্ধান করতে হবে। উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, যন্ত্রাংশ আমদানি, জ্বালানি তেল, মানবসম্পদ উন্নয়ন সব ক্ষেত্রেই অত্যধিক ভ্যাট ও ট্যাক্স আরোপ করা রয়েছে। যেটা এয়ারলাইনস অপারেটরদের জন্য কোনোভাবেই সহনীয় নয়। একদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা আমাদের এভিয়েশন খাতটা আরো উন্নত হোক কিন্তু মাঠ পর্যায়ে আমরা বিপরীত চিত্র দেখছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা পূরণে বেসরকারি এভিয়েশন খাতের প্রচেষ্টা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাজেটে এভিয়েশন খাতে যে বরাদ্দ থাকে সেটি মূলত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য। সেখানে প্রণোদনার কোনো বিষয় থাকে না। আমরা আসলে প্রণোদনা চাইও না। 

আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো দাবি রয়েছে?

বাংলাদেশে যেকোনো ব্যবসাকেই বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সবকিছু মিলে আমাদের রিস্ক ফ্যাক্টর বেশি। আর এভিয়েশন খাতে কথা বলা হলে, এখানে রিস্ক ফ্যাক্টর আরো বেশি। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এভিয়েশন খাতে রিস্ক বেশি। সে তুলনায় আমাদের দেশে আরো বেশি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যদি এয়ারলাইনস ব্যবসায় অকল্পনীয় করপোরেট ট্যাক্স ধার্য করা থাকে, সেটা এ খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য অসহনীয় থাকে। কারণ আমাদের অগ্রিম ট্যাক্স দিতে হয়, যা আমাদের নগদ অর্থের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে। সেক্ষেত্রে করপোরেট ট্যাক্স যদি কম থাকে তাহলে আমাদের উৎসাহ থাকে। একই সঙ্গে নগদ অর্থের ওপর চাপ কমে আসে। এ কারণে এয়ারলাইনস ও এভিয়েশন অপারেটরদের ওপর বর্তমানে আরোপিত ৩০ শতাংশ করপোরেট করহার কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

বর্তমানে এয়ারলাইনসগুলোর জন্য অতি উচ্চহারে অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ বিদ্যমান। সে সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে পরিচালন ব্যয় এয়ারলাইনসগুলোর সাধ্যের বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে নতুন আরোপিত নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ফির চাপ এভিয়েশন খাতকে নেতিবাচক অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং নিরাপত্তা ও উন্নয়ন ফির ওপর আরোপিত ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার প্রয়োজন। চার্টার্ড উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার পরিবহন সেবার ওপর ২৫ শতাংশ সার্ভিস ডিউটি (এসডি) ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে। আসন্ন বাজেটে এওএবির পক্ষ থেকে ২৫ শতাংশ সার্ভিস ডিউটি কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ সেবায় বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট রহিত করারও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

জেট ফুয়েলের মূল্যের ওপর যে ভ্যাট রয়েছে, এ বিষয়ে আপনাদের কোনো দাবি রয়েছে?

প্রতি বছর বাজেটে আমাদের যেসব দাবি থাকে সেখানে জ্বালানি তেলের ভ্যাটের বিষয়টি থাকে। আমাদের দাবির মূল বিষয় তিনটি—প্রথম, আমরা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে জ্বালানি তেল কিনতে চাই। এক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে যে দাম থাকবে সেটিই আমাদের জন্য প্রযোজ্য হবে। আমাদের দেশে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নেই। বিপিসি যে দাম নির্ধারণ করে দেয় সেটিই চূড়ান্ত, যা আসলে মনোপলি। দ্বিতীয় যেটি প্রয়োজন তা হলো, বিশ্ববাজারে যে মূল্য থাকে সেটির সঙ্গে বিপিসির দামের কোনো মিল থাকে না। বিশ্ব স্ট্যান্ডার্ডের তুলনায় বিপিসির দাম অনেক অনেক বেশি। তৃতীয়ত যেটি রয়েছে সেটি হলো, ট্যাক্স ও ভ্যাটের জন্য অভ্যন্তরীণ সেক্টরে জ্বালানি তেলের দামের পার্থক্য আরো বেশি। এ বৈসাদৃশ্য কিন্তু অন্য কোনো দেশে দেখা যায় না।  

আপনারা জ্বালানি তেলের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স মওকুফ চাচ্ছেন। কিন্তু অন্য দেশের এয়ারলাইনসগুলো কি ভ্যাট ও ট্যাক্স দিয়ে জ্বালানি কিনছে না?

আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য আলাদা মূল্যে জ্বালানি কিনতে হয়। ভ্যাট ও ট্যাক্সের কারণে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য অধিক মূল্যে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কিন্তু এ ধরনের পার্থক্য দেখা যায় না। কোনো কোনো দেশে দামের পার্থক্য থাকলেও সেটি হয়তো সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ সেন্ট। অধিকাংশ দেশই উড়োজাহাজের জ্বালানি তেলের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স আরোপ করে না। ফলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য জ্বালানি তেলের মূল্য একই থাকে। আমরা কিন্তু সেই আঙ্গিকেই চেয়েছি, যে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য তেলের দাম পার্থক্য সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা।

উড়োজাহাজ, ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ আমদানি সম্পর্কিত ভ্যাটের বিষয়ে আপনারা নানান সময় বিভিন্ন দাবি তুলে আসছেন। সে বিষয়ে আসন্ন বাজেটে আপনারা কিছু চেয়েছেন?

একটি উড়োজাহাজে লাখ লাখ খুচরা যন্ত্রাংশ রয়েছে। যার মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ছাড়ের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অধিকাংশ যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রেই শুল্ক ছাড় নেই। ফলে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে আমরা প্রচুর কর দিয়ে যাচ্ছি। ক্ষেত্রবিশেষে ২০ শতাংশ থেকে শুরু করে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমরা ট্যাক্স দিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে মিলিয়ন ডলারের কোনো যন্ত্রাংশ আনার সময় সেটির ওপর যখন অত্যধিক শুল্ক থাকে, সেটি এয়ারলাইনসের জন্য কখনই সহনীয় থাকে না।