ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের অন্যতম উপকরণ ইস্পাত। দেশে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের ওপর ভর করে ক্রমেই বড় হচ্ছে ব্যয়বহুল খাতটি। এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ। মহামারীতে কারখানাগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্টদের গুনতে হয়েছে বড় অংকের লোকসান। এ ধকল কাটতে না কাটতেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যা সংকটকে আরো বড় করে তুলেছে। বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে ধাতুটির কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা। বেড়ে গিয়েছে দাম। এ পরিস্থিতিতে ইস্পাত পণ্য উৎপাদনে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ সহজ ও সাশ্রয়ী করতে আসন্ন বাজেটে সরকারের নীতিসহায়তা চেয়েছেন উদ্যোক্তারা।
ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল ও রড উৎপাদনে ব্যবহূত রাসায়নিক চাহিদার সিংহভাগই মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে। ফলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়া বা কমার সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাজারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ইস্পাত উৎপাদনের কাঁচামাল স্ক্র্যাপের ৮০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে কাঁচামাল আমদানি করে রড উৎপাদন করা হয়। তথ্য বলছে, ২০২০ সালের অক্টোবরে পণ্যটির প্রধান কাঁচামাল মেল্টিং স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি ৩০০-৩৫০ ডলারে স্থির ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা বেড়ে ৫৫০-৫৯০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া উৎপাদনে ব্যবহূত প্রধান কেমিক্যাল ফেরো অ্যালয়সের দাম টনপ্রতি ৮০০-৮৫০ ডলার ছিল। বর্তমানে তা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৫০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।
মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারতসহ বেশকিছু দেশ রডের কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ক কমিয়েছে। বাংলাদেশ যদি এ পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে কাঁচামাল সংকটে রডের মূল্য অস্বাভাবিক বাড়বে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে অবাসন নির্মাণসহ সরকারের সব অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠবে। ব্যাহত হবে উন্নয়ন কার্যক্রম।
সংকট মোকাবেলায় ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আমদানি শুল্ক কমানোর একটি একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ফেরাস ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ক্র্যাপের কাস্টমস ডিউটি (সিডি) টনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা এবং স্পঞ্জ আয়রনের ক্ষেত্রে ৮০০ টাকা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া উভয় পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে এআইটি (অগ্রিম আয়কর) ৫০০ থেকে ১০০ টাকায় নামিয়ে আনা, এমএস রডের উৎস কর কর্তন ও বিক্রয় পর্যায়ে ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের আবেদন জানানো হয়েছে।
মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে প্রস্তুতকৃত বিলেট ও বিলেট থেকে প্রস্তুতকৃত এমএস পণ্যে টনপ্রতি ভ্যাট ২ হাজার থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই ভ্যাট ১ হাজার থেকে কমিয়ে ২৫০ টাকা নির্ধারণের আবেদন করেছে সংগঠনটি।
উদ্যাক্তারা বলছেন, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে বিশ্ববাজারে মেল্টিং স্ক্র্যাপের দুষ্প্রাপ্যতা। আন্তর্জাতিক বাজারে দুই বছরের ব্যবধানে স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি প্রায় ৮৪ শতাংশ বা ২৭০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। গত অর্থবছরের বাজেটে রডের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কর কমানো হয়নি। শুধু স্টেইনলেস ইস্পাতের পুরনো টুকরা বা বর্জ্য আমদানিতে নির্ধারিত শুল্ক টনপ্রতি দেড় হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছিল। যদিও গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এ পণ্য এক কেজিও আমদানি হয়নি। বরং পণ্যটি দেশ থেকে রফতানি হয়।
মেট্রোসেম স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ইস্পাত ও রডের কাঁচামাল বিশ্ববাজারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধিসহ সরবরাহ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের। দাম নিয়ন্ত্রণে কাঁচামাল আমদানির ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। রড উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় পণ্যটির দামও বাড়ছে। এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লেগে যাবে। বিশ্ববাজারে ইস্পাতের কাঁচামালের দাম বাড়ায় ভারত ও চীন শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু আমাদের এখনো টনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। এটা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারসহ অন্যান্য প্রস্তাব কার্যকর করা হলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রসার ঘটবে। স্বস্তি ফিরবে ভোক্তা পর্যায়ে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশের বাজার থেকে ইস্পাত ও রড ক্রয় করে। কিন্তু দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে এখন ঠিকাদাররা পণ্য ক্রয় করতে পারছেন না। ফলে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের নির্মাণকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রডের দাম গত ছয় মাসে যেভাবে বেড়েছে, তাতে গ্রামে বাড়ি নির্মাণকাজে হাত দেয়ার সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই।
ইস্পাত পণ্য প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য ও উদ্যোক্তাদের হিসাব বলছে, এক দশক আগেও দেশে বছরে সম্মিলিতভাবে এমএস রড উৎপাদন হতো ২৫ লাখ টন। বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী বছরে গড়ে উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে প্রায় ৬০ লাখ টন। যদিও বর্তমানে জিপিএইচসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কারখানা সম্প্রসারণ পদক্ষেপের কারণে ইস্পাতের (রড) সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এ খাতে উদ্যোক্তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় তিন লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতে জড়িত। গত কয়েক বছর সরকারি খাতে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও প্রবাসী আয়ে গ্রামে পাকা ঘর নির্মাণ বাড়তে থাকাকেই ইস্পাত খাতের প্রবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও কারখানা সম্প্রসারণ করে বাড়ানো হচ্ছে উৎপাদন সক্ষমতা।





