গত পাঁচ দশকে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদনও বেড়েছে কয়েক গুণ। পাশাপাশি বেড়েছে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়। তবে উৎপাদন বাড়লেও মোট বাজেটে কৃষি খাতের অংশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছর সার্বিক কৃষি খাতে মোট বাজেটের ২৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। আবার জিডিপি বৃদ্ধির অনুপাতে বাড়েনি কৃষিতে ভর্তুকির হার। ফলে উৎপাদন সহায়ক উপাদানের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদিত ফসলের প্রকৃত মূল্য না পাওয়ায় বছর বছর লোকসান গুনছেন কৃষক। এতে কৃষকের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে সামান্যই। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোকে কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও এর সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে অনুন্নয়ন খাতে। ফলে দেশের টেকসই কৃষির উন্নয়নে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে আরো বিচক্ষণ ও দূরদর্শী হতে হবে। তা না হলে ঝুঁকির মুখে পড়বে দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা।
আবার শস্যের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে ভারসাম্যহীনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষি উপকরণ। মানা হচ্ছে না সঠিকভাবে জমির চাষ পদ্ধতি। এতে কৃষকের যেমন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি কমছে জমির উর্বরতা, যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলে উৎপাদন বাড়লেও ভবিষ্যতে জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই টেকসই ও লাভজনক কৃষি উৎপাদন, গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফসলের উন্নত জাত ও চাষাবাদ প্রযুক্তির টেকসই উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং আয়ের সুযোগ সৃষ্টি, বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক কৃষির প্রচলন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদামতো মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান ও কৃষিপণ্যের রফতানি বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ ও জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারে এমন কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকের উদ্দীপনা থাকতে হবে বাজেটে।
পাশাপাশি ধানভিত্তিক খাদ্যনিরাপত্তা ও ফসলের বৈচিত্র্য আনয়ন, কৃষকবান্ধব খাদ্যশস্য ক্রয়নীতি, ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমি বিষয়ে সঠিক নীতি গ্রহণ, গুদামজাত ও বাজারজাত, সেচ সুবিধা ও ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনশীল কৃষির জন্য গবেষণায় জোর দেয়া প্রয়োজন। কৃষকের জন্য বীমা ব্যবস্থা প্রচলন করা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। উৎপাদিত পণ্য বাণিজ্যিকীরণের বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা থাকতে হবে বাজেটে।
বাজেটে খাদ্য ও কৃষি ভর্তুকি এবং প্রণোদনা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রয়োজন। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধপরবর্তী বৈশ্বিক খাদ্য সংকট, করোনাপরবর্তী কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা, লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষির গতি চালু রাখা, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি ও গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ ও আর্থসামাজিক অবস্থার গতি সঞ্চার করতে পারে এমন বাজেটই প্রয়োজন। সহজ শর্তে কৃষিঋণ বিতরণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের ঋণ পেতে বেগ পেতে হয়। আগামী পাঁচ বছরের জন্য কৃষকদের মনোবল চাঙ্গা রাখার উদ্দেশ্যে এবারের বাজেটে কৃষকের জন্য বিশেষ ফান্ড গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। টাকার অংকে যত কমই হোক, এ ফান্ড গ্রামাঞ্চলে নগদ অর্থের প্রবাহ সৃষ্টি করবে। ফলে কৃষকের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি হবে। কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে। বাজেটে সার্বিক কৃষি খাতের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হবে সেটি যেন এ খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হয়, এমন নীতি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। এছাড়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় খাতভিত্তিক বরাদ্দের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। এটি যেন কোনোভাবেই কমে না যায়। কৃষিপণ্য বাজারজাত ও গুদামজাত, দাম নিশ্চিত করা, পানির সঠিক ব্যবহারের বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।
কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অন্যতম প্রদান কারণ হলো শস্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের জন্য দেশে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বাজেটে সরকারিভাবে খাদ্যশস্য ক্রয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট কৌশল থাকা দরকার। মৌসুমের শুরুতে ফসলের মূল্য নির্ধারণ না করা হলে এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি না করা গেলে উৎপাদিত ফসল পানির দামে বিক্রি করতে কৃষক বাধ্য হবে। সামনের দিনগুলোতে সেচ সুবিধা ও ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ভূগর্ভস্থ সেচের পানির ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে উদ্যোগ ও বরাদ্দ রাখতে হবে।
শহরগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর একটা বড় অংশের জোগান আসছে শহরসংলগ্ন কৃষি এলাকা থেকে। শহরসংলগ্ন কৃষিতে সাধারণত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উচ্চমূল্যের পুষ্টিকর ফসল ও কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয় এবং জমিসহ অন্যান্য উপকরণ খরচও বেশি পড়ে। তাই এ অঞ্চলের কৃষির জন্য বিশেষ সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। বাজেটে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের দিকে সুনজর কম থাকে। সবজি, ফল, আলু, চাল ও ভুট্টার বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে হবে। এজন্য খাদ্যশিল্পের বিকাশ দরকার। এ লক্ষ্যে বাজেটে অনুকূল আমদানি শুল্ক, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কৃষকদের ভালো মূল্যপ্রাপ্তির লক্ষ্যে স্থানীয় প্রক্রিয়াজাত ব্যবসার বিকাশের জন্য প্রযুক্তি ও আর্থিক বরাদ্দের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কৃষি যন্ত্রপাতি চালু রাখা এবং এগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গ্রাম পর্যায়ে পাঁচ লাখের অধিক মেকানিক, যন্ত্রচালক এবং তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হাজার হাজার ওয়ার্কশপ কর্মী রয়েছেন। আধুনিক দক্ষ ও লাভজনক কৃষির জন্য তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও ক্ষেত্রভেদে পুঁজি সহায়তা দেয়া দরকার। বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকায়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দের পাশাপাশি দক্ষ মেকানিক সার্ভিস গড়ে তোলার জন্যও বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকারের সঙ্গে এখানে যন্ত্র সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও সংযুক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য তথ্যের সঠিকতা প্রয়োজন। একটি টেকসই বাণিজ্যিক কৃষির রূপান্তরের লক্ষ্যে বাজেটে একটি শক্তিশালী কৃষি কমিশন গঠন প্রয়োজন।





