বর্তমানে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠাগুলোর (এনবিএফআই) প্রধান সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের উৎস না পাওয়া। বিভিন্ন দেশে বন্ডের মাধ্যমে এনবিএফআইগুলো তদের তহবিলের একটা বড় অংশ উত্তোলন করে। কিন্তু নানা জটিলতায় দেশে বন্ড মার্কেট থেকে তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় আসন্ন বাজেটে এ খাতের প্রত্যাশা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মমিনুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মেসবাহুল হক

নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আসন্ন বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

আমরা খুব একটা সংকটময় মুহূর্ত পার করছি। বৈশ্বিক করোনা মহামারীর পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হচ্ছিল। কিন্তু সেটা বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে বেশকিছু পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতি ডিস্টাবিলাইজেশন ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে। এ সময় ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এসব প্রতিষ্ঠান অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থপ্রবাহ ঠিক রেখে মাইক্রো ইকোনমির ভারসাম্যহীতাকে কমিয়ে আনবে। তবে বর্তমানে এনবিএফআইগুলোর  প্রধান সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের উৎস না পাওয়া। বিভিন্ন দেশে বন্ডের মাধ্যমে এনবিএফআইগুলো তদের তহবিলের একটা বড় অংশ উত্তোলন করে। কিন্তু নানা জটিলতায় আমাদের দেশে বন্ড মার্কেট থেকে তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশেও বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তা না হলে উন্নয়নশীল দেশের জন্য যে পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে তা পাওয়া যাবে না। তাই আমার অনুরোধ থাকবে আসন্ন বাজেটে যেন বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। সেজন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিতে হবে। এছাড়া বর্তমানে ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের ট্যাক্স বিদ্যমান রয়েছে। এনবিএফআইয়ের ট্যাক্স ব্যাংকের থেকে অন্তত আড়াই শতাংশ কমানো যেতে পারে। তাছাড়া কভিড-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন খাতে বিশাল অংকের প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে সরকার। তবে এনবিএফআইগুলোকে কোনো ধরনের পুনঃঅর্থায়নের আওতায় আনা হয়নি। যদিও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এনবিএফআইগুলোকে এ ধরনের অনেক সুবিধা দিয়েছে। তাই আসন্ন বাজেটে এনবিএফআইগুলোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। এ তহবিলের অর্থ শুধু অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে। এতে বর্তমানে অর্থনীতিতে যে প্রতিঘাত এসেছে সেটা থেকে অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এনবিএফআইগুলো যে তহবিল সংকটে ভুগছে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।

বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা কোথায়?

বন্ড মার্কেটে ডিমান্ড ও সাপ্লাই সাইড প্রয়োজন। সাপ্লাই সাইডে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বড় বড় করপোরেট হাউজ বন্ড ইস্যু করে। এছাড়া এনবিএফআইগুলো বন্ড ইস্যুর অন্যতম প্রধান খাত। সাধারণত ১০০ কোটি টাকার বেশি উত্তোলনের জন্য বড় করপোরেট হাউজগুলো বন্ড ইস্যু করে। কিন্তু অনেক ছোট ছোট হাউজ আছে যাদের ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দরকার। এসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে এনবিএফআইগুলো বন্ড ইস্যু করে। তবে বর্তমানে এনবিএফআইগুলো একটা বন্ড ইস্যু করতে চাইলে তা সম্পন্ন করতে প্রায় ছয় মাস লেগে যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন প্রায়োজন হয়। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা শ্রীলংকায় কিছু বিধামালা দেয়া আছে। এসব বিধিমালা প্রতিপালন করে যদি এনবিএফআইগুলো বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করতে চায় তাহলে নতুন করে কোনো অনুমোদন লাগে না। বিধিমালাগুলো মেনে চললেই হয়। সুতরাং আমাদের দেশেও বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনেক সহজীকরণের অবকাশ রয়েছে। 

এনবিএফআই খাতে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের পরিবর্তন বা উন্নয়ন করলে জাতীয় রাজস্বে আপনাদের অবদান বাড়বে বলে মনে করেন?

এনবিএফআই খাতের গুরুত্বটা প্রথমে আমাদের সরকার বা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে অনুধাবন করতে হবে। আমাদের বেসরকারি বিনিয়োগের হারটা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। সেক্ষেত্রে যদি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ চাই, তাহলে এনবিএফআইগুলোকে আরো শক্তিশালী করার পাশাপশি বেসরকারি খাতে ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্টগুলো ফ্যাসিলিটেড করতে হবে। এজন্য খুব দ্রুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন—বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ(আইডিআরএ), অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের(এনবিআর) প্রতিনিধি, আর্থিক খাতে কর্মরত নির্বাহীদের পাশাপাশি এনবিএফআই নিয়ে কাজ করে এমন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এটি আর্থিক খাত সংস্কার কমিটি প্রণয়ন করতে হবে। বর্তমানে এনবিএফআইয়ের জন্য যে রেগুলেটরি ও মিস ম্যানেজমেন্ট স্ট্রাকচার রয়েছে সেটা রিভিউ করবে এ কমিটি। এটাকে কীভাবে পুনর্বিন্যাস করা যায়, এটা করা হলে একটা বড় ধরনের কাজ হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় এনবিএফআই নিয়ে কী ধরনের রেগুলেটরি স্ট্রাকচারের মধ্য দিয়ে খাতটি এগিয়ে গিয়েছে বিষয়টি দেখে আমাদের দেশে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে এনবিএফআইগুলোরও অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সম্প্রতি যে কয়েকটা এনবিএফআই ফেল করেছে, তারা কিন্তু ব্যবসায়িক কারণে নয় বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠার অভাবেই সংকটে পড়েছে। এজন্য যারা দায়ী ব্যক্তি তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান খারাপ অবস্থায় চলে গিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় এগুলোকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেলে বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে সার্বিকভাবে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ওপর আরো আস্থার সংকট তৈরি হবে। তাছাড়া এনবিএফআই খাতে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য সুশাসনের যে কাঠামো রয়েছে সেটাকে আরো দৃঢ় করতে হবে। বর্তমানে বিদ্যমান স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। পরিশোধিত মূলধনও ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়াতে হবে। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কার্যক্রম আরো ভালোভাবে করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ভালোমতো নিয়ন্ত্রণমূলক কাজ করতে পারছে কিনা সেটা দেখার জন্য তৃতীয় পক্ষ দিয়ে পর্যবেক্ষণও করা যেতে পারে। এনবিএফআইগুলোকে বিশেষায়িত খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। বিশেষায়িত খাতে বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠান থাকা গুরুত্বপূর্ণ।      

জাতীয় অর্থনীতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ও অবদান কী?

এনবিএফআইগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের শিল্প অবকাঠামো, আবাসন, এসএমই, নারী উদ্যোক্তাসহ টেকসই অর্থায়নে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের জোগান দিয়ে আসছে। আর্থিক খাতে নতুন নতুন পণ্য ও সেবার সূচনা করেছে। পুঁজিবাজার ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে চলেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে অবদান আরো বাড়ানো প্রয়োজন।

২০০৮ সালে লিজ ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে বিশেষ কর সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে?

১৯৮০-৯০ সাল বেসরকারি শিল্প খাতের সূচনার যুগ। বড় বড় কোম্পানি যখন কারখানার সূচনা করেছে, একটা মেশিন লাগবে তখন নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ইজারা নিয়ে তারা কজটা শুরু করেছে। এক্ষেত্রে ট্যাক্স রেয়াত পাওয়া যেত। কিন্তু ২০০৮ সালে লিজ ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে বিশেষ কর সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়। তাই বর্তমানে এবিএফআইগুলোর লিজ ফাইন্যান্সিং পোর্টফোলিও ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। আমি মনে করি, সব খাতের জন্য না হলেও বর্তমানে অর্থনীতির জন্য যে খাতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেক্ষেত্রে লিজ ফাইন্যান্সের বিশেষ কর সুবিধা বহাল রাখা উচিত।

ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এনবিএফআইগুলোর অসম প্রতিযোগিতা কমিয়ে আনতে আপনার পরামর্শ কী?

ব্যাংক ও এনবিএফআইগুলোর কাজের পরিধি সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। ব্যাংকের কোর রিস্ক গাইডলাইন হুবহু এনবিএফআইগুলোর জন্য দেয়া হয়েছে। যে এনবিএফআই কখনো প্রজেক্ট বা লিজ ফাইন্যান্সিং করে না অর্থাৎ হাউজিং ফাইন্যান্সের বাইরে কোনো অর্থায়ন করে না, তাকে যদি সার্বিক ব্যাংক খাতের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন দিয়ে দেয়া হয়, তাহলে সে কী কমপ্লাই করবে? আবার কোনো এনবিএফআই শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে তাকে যদি বলা হয় তোমার পণ্যে বৈচিত্র্য নেই, তাই তোমাকে মাইনাস মার্কিং করলাম তাহলে তো হবে না। তাছাড়া ব্যাংকগুলোর জন্য মোট ঋণের অনুপাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট ট্যাক্স ব্যাংকগুলোর চেয়ে কমিয়ে স্টক ব্রোকারেজ, মার্চেন্ট ব্যাংক বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর সমতুল্য হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। 

খেলাপিদের বিষয়ে এবারের বাজেটে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করেন কিনা?

দেশের ব্যাংকগুলোর মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও উচ্চখেলাপি ঋণে জর্জরিত। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কখনই শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছতে পারবে না। তাই বেশকিছু দিন ধরে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংজ্ঞা ও তাদের কীভাবে সামলাতে হবে সেটাকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর্থিক কোম্পানি আইন-২০২১-এর খসড়ায় ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সামাজিকভাবে হেয় করার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তির ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। এ আইনটা দ্রুত বিল আকারে পাস করিয়ে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নয়, তাদের ক্ষেত্রে অন্যভাবে সহায়তা দিতে হবে। এছাড়া অর্থঋণ আদালতে বিদ্যমান মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অর্থঋণ আদালতের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বর্তমানে এনবিএফআইগুলো রাজস্ব খাতে কতটা অবদান রাখছে?

গত পাঁচ বছরে এনবিএফআইগুলো ১ হাজার কোটি টাকার বেশি সরাসরি ট্যাক্স দিয়েছে। বেশির ভাগ এনবিএফআই বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং দেশের রাজস্ব বাড়াতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আরো বড় হয়, তাহলে রাজস্বে আরো অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে।