সিমেন্টের কাঁচামালের ক্ষেত্রে বর্তমানে উৎস হতেই আয়কর কেটে নেয়া হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে যা পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন দেশের সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, এ নিয়মের ফলে সিমেন্ট কোম্পানিগুলো ব্যাপক পুঁজি ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ অবস্থায় আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে উৎস হতেই আয়কর কেটে নেয়ার এ নীতি পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)। সংগঠনটি বলছে, আগামী বাজেটে যদি আয়কর কেটে নেয়ার এ নিয়মে পরিবর্তন আনা না হয়, তাহলে দেশের সিমেন্ট খাত অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

দেশের সিমেন্ট খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা ও এ খাতের বিকাশে আসন্ন বাজেটে কী ধরনের নীতিসহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতটির উদ্যোক্তারা—এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা হয় বিসিএমএর সভাপতি ও ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবিরের। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সিমেন্ট খাত এমন একটি শিল্প যেখানে স্বল্প বিনিয়োগে প্রযুক্তি সহায়তা পাওয়া যায় না। পাশাপাশি বৃহৎ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। এ শিল্প ব্যাপক পরিমাণে লজিস্টিকনির্ভর, যা নৌ ও সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল। দেশে এ খাতে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে আনুমানিক প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। নতুন করে আরো কিছু বিনিয়োগ চলমান রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণেরও  বেশি। ৩৮ মিলিয়ন টনের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ৮০ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন। আগে দেশী ও বিদেশী কোম্পানি মিলে ৭৬টি কোম্পানি চলমান ছিল। বর্তমানে চালু রয়েছে ৩৪টি। বাজারে এখন যারা টিকে আছে তাদের আকার আগের তুলনায় বড়। এ খাতে বিগত বছরগুলোয় গড় প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থবছর শেষে যা ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

জ্বালানিসহ আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের সিমেন্ট খাতেও। এ অবস্থায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ খাতের কোম্পানিগুলো কী কৌশল অবলম্বন করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বিসিএমএ সভাপতি বলেন, বৈশ্বিক কারণে সব জ্বালানির মূল্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সিমেন্টের মূল কাঁচামাল ক্লিংকার উৎপাদনে মূলত জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহূত হয়। আবার পরিবহন খাতেও জ্বালানি তেল ব্যবহূত হয়। তাই উৎপাদন ও পরিবহন উভয়ই খাতেই ব্যাপক খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিমেন্টের মতো পণ্য মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাহিদা কমে যায়। ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিজনিত সমস্যায় পড়তে হয়। আবার মূল্যসহায়ক হলে বিক্রি বেড়ে যায়। তাই উৎপাদনকারীদের আকাঙ্ক্ষাই থাকে মূল্য ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা। এছাড়া বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা তো রয়েছেই। ইচ্ছা করলেই কেউ মূল্য বাড়িয়ে বাজারে টিকে থাকতে পারবে না। এ অবস্থায় আমদানি শুল্ক টনপ্রতি ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২৫০ টাকা করা যেতে পারে। আর অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা অতিপ্রয়োজন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সিমেন্ট কোম্পানিগুলো লাভের কথা চিন্তা না করে টিকে থাকার জন্যই লড়াই করছে বলে মন্তব্য করেন মো. আলমগীর কবির। তার মতে, বৈশ্বিক কারণে সিমেন্ট শিল্প যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের কর নীতির কারণে। রাজস্ব বা কর ব্যবস্থাপনা যদি ব্যবসাবান্ধব না হয়, তাহলে সে শিল্প কখনই উন্নয়নের দিকে যেতে পারবে না। সরকারি নীতিসহায়তা ব্যতীত কোনোভাবেই কোনো শিল্প টিকে থাকতে পারবে না।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায় মুনাফা হলেই আয়কর দেয়া যায়। কিন্তু আয় হচ্ছে না। অথচ জোর করে আয়কর নেয়া কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। আমদানি শুল্ক, ভ্যাট যা উৎসে কর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু আয়কর নেয়া যাবে আয়ের উৎস থেকে। অর্থাৎ বার্ষিক লাভক্ষতির হিসাব থেকে। অথচ কাঁচামালের উৎস থেকেই আয়কর কেটে নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে গত তিন বছর আমরা এনবিআরকে বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।

ডলারের দাম বাড়ার কারণে দেশের সিমেন্ট খাতে কী প্রভাব পড়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের দেশের মুদ্রানীতি নিয়ে কিছুটা আপত্তি থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রানীতি নিয়ে কথা বলতেই হচ্ছে। কারণ, আমদানিনির্ভরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার নির্ভরশীলতা ব্যাপক। আমরা বিগত এক মাসে দেখতে পেলাম বৈদেশিক মুদ্রার মূল্যের ব্যাপক তারতম্য। এরই মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণহীন হয়েছিল, যা আবার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা বাজার মূলত ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানে যদি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকত, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার দামে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতো না। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারকরা, সর্বোপরি সাধারণ ভোক্তারা। বৈশ্বিক কারণে বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষ করে মার্কিন ডলারের মূল্য বিশ্বব্যাপী যতটা বৃদ্ধি পেয়েছে, তার চেয়ে আমাদের দেশের বিনিময় হার অত্যধিক। এ অবস্থায় সরকারের নীতিসহায়তা একান্ত জরুরি। নয়তো অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই ব্যাপক ধস নেমে আসতে পারে। ফলে এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০ লাখ লোকের রুজি-রোজগারে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।