অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও সরকারের বাজেট বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বেসরকারি খাতের ব্যাংক। দেশের ব্যাংক খাতের ৭০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ এখন ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ব্যাংকগুলোর হাতে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতৃত্ব দিচ্ছেন মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার। বিএবির পাশাপাশি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আসন্ন বাজেটে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা ও প্রস্তাব নিয়ে এ শিল্পোদ্যোক্তা কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান

কেমন বাজেট চান?

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বিস্ময়। এক যুগে বাংলাদেশ অভাবনীয় উন্নতি করেছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বাংলাদেশ এখন অনেকটাই শিল্পনির্ভর। দেশের বাজেটের আকার ছাড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকা। করোনাভাইরাসের মতো বৈশ্বিক মহামারীতে সারা বিশ্বের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু এ দুর্যোগেও বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির ধারা অক্ষুণ্ন রেখেছে। মহামারী কাটিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বে এটি সম্ভব হয়েছে।

তবে করোনার অভিঘাত কাটিয়ে ওঠতে আরো সময় লাগবে। এর মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক পণ্যবাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নতুন সংকট তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। শিল্পের কাঁচামালের দামও এখন আকাশচুম্বী। প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে পণ্য পরিবহন ব্যয়। এ পরিস্থিতির মধ্যে একটি গণমুখী বাজেট তৈরি করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন। তার পরও আমরা চাই, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শিল্পবান্ধব একটি বাজেট। অর্থনীতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে দেশের শিল্পকে বাঁচাতে হবে। কর ব্যবস্থাকে সর্বজনীন করে গড়ে তুলতে হবে।

অনেক দিন থেকেই আপনারা ব্যাংকের করপোরেট করহার কমানোর দাবি তুলছেন। এবারের বাজেটেও কি একই দাবি জানাচ্ছেন?

বাংলাদেশের ব্যাংকের করপোরেট করহার প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ নয়। বিশ্বে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কর আর কোনো দেশের ব্যাংক থেকে আদায় করা হয়, সেটি আমার জানা নেই। আমরা বহুদিন থেকেই ব্যাংকের করপোরেট কর কমানোর দাবি জানাচ্ছি। আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার করহার কিছুটা কমিয়েছে। তার পরও এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এ করহার অনেক বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী চলতি বছর আমরা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ করেছি। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় যে পরিমাণ বেড়েছে, তাতে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করা সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণের উচ্চহারের কারণে ব্যাংকগুলো এমনিতেই প্রত্যাশা অনুযায়ী মুনাফা করতে পারছে না। পুঁজিবাজারে ব্যাংকের শেয়ারদরই সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়িত। শেয়ার হোল্ডারদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ডিভিডেন্ড দিতে না পারায় ব্যাংকের শেয়ারদর বাড়ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে করপোরেট কর না কমালে অনেক ব্যাংকই নিট মুনাফায় থাকতে পারবে না। এজন্য ব্যাংকের করপোরেট কর কমানোর দাবিটি এবার আরো বেশি জোরালো হয়েছে। এটি মনে রাখতে হবে, ব্যাংক না বাঁচলে অর্থনীতিও বাঁচবে না।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল। ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিদিনই ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আপনাদের দাবি কী?

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো আমদানিনির্ভর। জ্বালানি তেলসহ বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এ কারণেই ডলারের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। খুচরা বাজারে প্রতি ডলারের দাম ১০০ টাকা পার হয়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। তবে আশার কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্যোগী হয়েছে। এরই মধ্যে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের সর্বোচ্চ দর বেঁধে দিয়েছে। ডলারের দাম বেঁধে দেয়ার ক্ষেত্রে যেন রফতানিকারক ও প্রবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটি দেখতে হবে। আমদানিতে ৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও কারণে ডলার সংকট শিগগিরই কাটবে বলে মনে হচ্ছে না। এক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোর ও সতর্ক হতে হবে। বাজেটে এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে আমরা দিকনির্দেশনা চাই।

শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে বাজেটে সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

রফতানিমুখী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে না পারা এবং পর্যটন খাতের বিপর্যয়ের কারণে শ্রীলংকা দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। বিশ্বের অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে। আমরা চাই সরকার রফতানিমুখী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আরো বেশি কার্যকর উদ্যোগ নেবে। করোনার সময়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নীতি ছাড় দেয়া হয়েছিল। ওই নীতি ছাড় ও প্রণোদনা সহায়তার কারণে দেশের রফতানিমুখী শিল্প সুরক্ষা পেয়েছে। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুরক্ষা দিতে আরো কী কী উদ্যোগ নেয়া যায়, সেটি ভেবে দেখতে হবে।