সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে চা উৎপাদন ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে গত বছর উৎপাদন অতীতের যেকোনো সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু ব্যাপক উৎপাদন সত্ত্বেও পানীয় পণ্যটির রফতানি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কারণ দেশে উৎপাদিত চা দ্বারা অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করার পর তেমন উদ্বৃত্ত থাকে না। রফতানি বাড়ানোর জন্য এ মুহূর্তে টেকসইভাবে চা উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের (বিটিবি) তথ্য বলছে, ২০০১ সালে দেশে চা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার কেজি। ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার কেজি। ওই বছর ১ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার চা রফতানি করা হয়। রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ৮৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৯ সালে চা উৎপাদন ৯ কোটি ৬০ লাখ ৭০ হাজার কেজিতে উন্নীত হয়। রফতানি হয় মাত্র ছয় লাখ কেজি। রফতানি আয় দাঁড়ায় ১৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। সুতরাং এক দশকের ব্যবধানে উৎপাদন যেখানে বেড়েছে ৮০ শতাংশ, ভোগ ছিল তার দ্বিগুণ। রফতানি ছিল তলানিতে। ২০২১ সালে ৯ কোটি ৬৫ লাখ চা উৎপাদন করেছে বাংলাদেশ।

বিনিয়োগ স্বল্পতার কারণে বর্তমানে আর্থিক সংকটে চা শিল্প। বিনিয়োগের জন্য ঋণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ উৎপাদনকারীদের বিদ্যমান ব্যাংকঋণের সুদের হার অনেক বেশি। এ প্রতিবন্ধকতা নিরসনের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে উন্নয়ন ও ওয়ার্কিং ঋণের ব্যবস্থা করা দরকার। কৃষি ব্যাংক ছাড়াও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে চা শিল্পকে আর্থিক সুবিধা প্রদান করলে আর্থিক সংকট অনেকাংশেই লাঘব হবে। চা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য। চায়ের মাঠ ও কারখানা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য নিম্ন সুদে, সহজ শর্তে পর্যাপ্ত তহবিল প্রয়োজন।

এদিকে টেকসই উপায়ে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে না পারলে আগামীতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে চা বিদেশে রফতানি করা খুব কঠিন হবে। উৎপাদন বাড়াতে অধিক ফলনশীল নতুন নতুন ক্লোন চা চারা ও উন্নত বীজ উদ্ভাবন করতে হবে। আবাদযোগ্য ভূমিকে উৎপাদনে নিয়ে আসতে হবে। চা আবাদি জমির মধ্যে প্রায় ১৬ শতাংশ অতিবয়স্ক ও অলাভজনক চা এলাকা রয়েছে। এসব জমি থেকে হেক্টরপ্রতি বার্ষিক গড় উৎপাদন আসে মাত্র ৪৮২ কেজি। অতিবয়স্ক চা এলাকার কারণেই হেক্টরপ্রতি জাতীয় গড় উৎপাদন বৃদ্ধি করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তাছাড়া চা বাগানের জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, চা কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা এ শিল্পের উন্নয়নের পথে অন্তরায়। এসব কারণে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে রফতানিমুখী উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। অলাভজনক চা গাছ পুনরায় রোপণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। উদ্ভাবন করা যেতে পারে নতুন উৎপাদন কৌশল ও প্রণালি।

বিদ্যমান সংকট নিরসনে চা কারখানা আধুনিকীকরণ জরুরি। বাড়াতে হবে অবকাঠামোগত সুবিধা (যোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন)। বর্তমান উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে চা উৎপাদনে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানও বাড়বে।

বিদ্যমান বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণ ও নতুন বাজার সৃষ্টি রফতানি বাড়ানোর প্রধান শর্ত। এক্ষেত্রে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। রফতানি বৃদ্ধিতে দিতে হবে প্রণোদনা।

গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা এক নীতিমালায় চা রফতানিতে উৎপাদনকারী ও রফতানিকারকদের প্রণোদনার সিদ্ধান্ত এসেছে। নিজস্ব বাগানে উৎপাদিত চা রফতানির ক্ষেত্রে এফওবি মূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে এ প্রণোদনা পাবেন উৎপাদনকারী ও রফতানিকারকরা। এ সুবিধা চা উৎপাদন বৃদ্ধি ও রফতানিকে উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ ও রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে চা শিল্পের উন্নয়নের জন্য কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা ভিশন-২০২৫ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে সাড়ে ১২ কোটি কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের সাতটি জেলায় এক লাখ হেক্টর জমিতে চা আবাদ করা হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিপুল পরিমাণে উন্নতমানের চা রফতানি করা সম্ভব।

স্বাধীনতার আগে সিলেট ও চট্টগ্রামই ছিল চা আবাদের কেন্দ্র। দেশের আবহাওয়া চা চাষের অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ব্রিটিশ আমল থেকেই চা উৎপাদনে এগোতে থাকে বাংলাদেশ। সত্তরের দশকের শুরুতে চা বাগান ছিল ১৫০টি। ২০০২ সাল থেকে সিলেট ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুরের সমতল ভূমি ও বান্দরবান জেলায় চা উৎপাদন শুরু হয়।

সত্তরের দশকে চায়ের বার্ষিক উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ১৩ লাখ ৮০ হাজার কেজি। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ কোটি ৬৩ লাখ ৯০ হাজার কেজিতে। ওই বছর বিশ্ববাজারে ২১ লাখ ৭০ হাজার কেজি চা রফতানি করে বাংলাদেশ। চা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে চা বাগান ১৬৭টি। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে ৯১টি, হবিগঞ্জে ২৫টি, চট্টগ্রামে ২১টি, সিলেটে ১৯টি, পঞ্চগড়ে আটটি, রাঙ্গামাটিতে দুটি ও ঠাকুরগাঁওয়ে একটি চা বাগান রয়েছে।