দেশের ইলেকট্রনিকস খাতের উন্নয়নে নানা সহযোগিতা দিয়ে আসছে সরকার। আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে এ খাতে অনেকটাই এগিয়েছে দেশ। আসন্ন বাজেটে এ খাতের জন্য আরো কী কী সুবিধা প্রয়োজন, সেসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক  মো. নুরুল আফসার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন

ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবারের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা  কী?

দেশের ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজার একটা সময় বিদেশী পণ্যের দখলে ছিল। এখন ধীরে ধীরে দেশীয় উৎপাদকরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। মানসম্মত পণ্য তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছি আমরাও। তবে টিকে থাকতে গেলে অবশ্যই বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হবে। সেজন্য আমরা সরকারের কাছে বিভিন্ন সময় নানা দাবিদাওয়া নিয়ে হাজির হই। সে হিসেবে কিছু সুবিধা তো পাচ্ছি। তবে সেগুলো আরেকটু সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব হওয়া প্রয়োজন। কিছু কাঁচামাল আমদানি করেই পণ্য উৎপাদন করতে হয়। সরকার কয়েক বছর ধরে কাঁচামাল আমদানির ওপর ভ্যাট ছাড় দিচ্ছে। এটি প্রতি বছর নতুন করে ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু আমরা কেউই আগে থেকে জানি না পরের বছরও এটি চলমান থাকবে কিনা। অন্যদিকে মাত্র এক বছরের পরিকল্পনায় বড় বিনিয়োগ করা যায় না। তাই আমরা চাই কাঁচামাল আমাদানির ওপর অন্তত পাঁচ বছরের জন্য যদি একই সঙ্গে ভ্যাট ছাড়ের ঘোষণা দেয়া হয়, তাহলে বড় অংকের নতুন বিনিয়োগ করা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সাজানো সহজ হয়।

দীর্ঘমেয়াদে ঘোষিত সুবিধা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলে?

আমরা ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ইলেকট্রনিক পণ্য খাতে ব্যবসা করে আসছি। এক দশক ধরেই আমরা বড় বিনিয়োগের কথা ভাবছি। কিন্তু বড় বিনিয়োগ করতে গেলে বিদেশী পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও দেশের বাজরে টিকে থাকার বিষয়ে ন্যূনতম একটা নিশ্চয়তা প্রয়োজন। আমরা ২০২৫ সালের মধ্যে রফতানিতে যেতে চাই। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চাই এ খাতে। সেজন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। আর এ পরিকল্পনা করতে গিয়ে আমরাও চাই অন্তত পাঁচ বছরের জন্য সুবিধাগুলো নিশ্চিত করুক সরকার। এতে মাঝপথে পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসির নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবারের বাজেটে এ বিষয়ে আপনাদের দাবি বা প্রত্যাশা কী?

আমরা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কনকা, গ্রি ও হাইকো ব্র্যান্ডের পণ্য দেশেই উৎপাদন করি। এসব ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদন করতে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। দেখা যাচ্ছে, এলসি করার সময় আগে ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করে বাকি টাকা পণ্য আসার পর পরিশোধ করার নিয়ম ছিল। এখন আগে ৭৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করে বাকি ২৫ শতাংশ পণ্য আসার পর পরিশোধ করার নিয়ম করা হয়েছে। আমরা চাই আগের নিয়মে এলসি করতে। এতে আমাদের লেনদেন ও অর্থ জোগানে সুবিধা হবে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় ব্র্যান্ডের পণ্যের আধিপত্যের ক্ষেত্রে কী কী সম্ভাবনা দেখছেন?

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানা হিসাব-নিকাশের কারণে চীনসহ ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনকারী বড় দেশগুলোর ব্যবসায় কিছুটা সংকোচন হচ্ছে। তাদের ব্যয় বাড়ায় পণ্যের দামও বাড়ছে। এ সুযোগ নিতে চায় বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো। ফলে সরকারি সহযোগিতা পেলে এ খাত পোশাক খাতের মতো রফতানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি করতে পারবে। কারণ এরই মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একটা সুনাম আছে গোটা বিশ্বে। সুযোগ-সুবিধা পেলে ইলেকট্রনিকস খাত পোশাক খাতের মতো বিশ্বে একটি নামিদামি ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাংকঋণের সুদহার নিয়ে অনেক দিন ধরে ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদকরা কথা বলছেন। এটি আসলে কেমন হওয়া প্রয়োজন? এখানে আপনাদের দাবি কী?

বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে অন্তত ৯ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পের বিকাশে এ সুদহার কমিয়ে আনা প্রয়োজন। আমরা এবারের বাজেটে সরকারের কাছে এ বিষয়ে দাবি জানিয়েছি। একই সঙ্গে আমরা বলেছি ব্যবসার আকার বৃদ্ধিসহ আরো বাড়তি বিনিয়োগ করতে চান এ খাতের ব্যবসায়ীরা। দেশীয় পণ্যের জন্য বিদ্যমান সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং আমদানি হওয়া ইলেকট্রনিকস পণ্যে ভ্যাট বাড়াতে হবে। দেশে উৎপাদিত পণ্যের জন্য দেশের বাজারে প্রতিযোগিতা সহজ করা উচিত। এছাড়া করপোরেট ট্যাক্স ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বাজারে দেশীয় ইলেকট্রনিকস পণ্যের চাহিদা কেমন? আর বিদেশী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কীভাবে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে?

ফ্রিজ, এসি এগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই বিলাসবহুল পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এগুলো এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হয়ে উঠেছে। এটি মাথায় রেখে ইলেক্ট্রো মার্ট নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি কারখানা স্থাপন করেছে। সেখানে আমরা ফ্রিজ ও এসি উৎপাদন করি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন কোম্পানি ইলেকট্রনিকস হোম অ্যাপ্লায়েন্সসহ নানা পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করে। দেশে ও দেশের বাইরে চাহিদা সাড়া জাগানো বলেই ঝুঁকি নিয়ে এটি করতে পেরেছে। এখন সুবিধা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই আমরা যদি তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের পণ্য দিতে পারি, তাহলে শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও দ্রুত একটা অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। এর জন্য সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। কারণ এখন দেশীয় এসব কোম্পানি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ডিজাইন, ফিনিশিং ও গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি করছে। রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের কারখানাও।