দেশের পর্যটন খাতের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে একান্ত আলাপ করেছেন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি আমিনুল হক শামীম

পর্যটন বিকাশে বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

করোনাভাইরাস মহামারীতে দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে একটি পর্যটন। করোনা-পরবর্তী সময়ে অন্যান্য খাতকে টেনে তুলতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সেক্ষেত্রে পর্যটন খাত অনেকটাই পেছনে। তাই এবারের বাজেটে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মতো একটি বিশেষায়িত ব্যাংক চালুর প্রস্তাব করছি। এছাড়া করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে আর্থিক প্রণোদনা এবং স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা প্রয়োজন। কারণ পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি ১০৯টি খাত ও পরোক্ষভাবে ১ হাজার ১০০টি খাত সংযুক্ত। একজন পর্যটকের জন্য ১০টি প্রত্যক্ষ ও ৩৫টি পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য পর্যটনকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত।

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কেমন?

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা ১০০ কোটিরও বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬০ কোটি। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বিপুলসংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৩ শতাংশ ভ্রমণ করবেন এশিয়ার দেশগুলোয়। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজার ধরতে পারে, তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশ বর্তমানে এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে।

পর্যটন খাতে বিনিয়োগের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন?

দিন দিন বাংলাদেশে পর্যটনে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে দারুণ সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পর্যটন শিল্প। ২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটন শিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। গোটা দেশকে আটটি পর্যটন জোনে ভাগ করে প্রতিটি স্তরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথমবারের মতো সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, নতুন করে বিনিয়োগ এ খাতে অপার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

পর্যটকদের আকর্ষণে অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কেমন?

এমন উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এমন উদ্যোগ সফল করার জন্য আমাদের কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। যেমন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ সঞ্চয় স্কিম, আলাদা ঋণদানের মাধ্যমে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বিনিয়োগের বিশেষ প্যাকেজ চালুর উদ্যোগ নেয়, তাহলে পর্যটন খাতে খুব দ্রুত সমৃদ্ধি ঘটবে। সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ মিললে অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে আয় হতে পারে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

পর্যটক নিরাপত্তায় দেশে বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাচ্ছি।

এটা সত্য, একসময় দেশী-বিদেশী পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত। কিন্তু সে অবস্থার এখন আমূল পরিবর্তন। পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু ট্যুরিজমে পার্বত্য অঞ্চল বিশাল সম্ভাবনাময় হলেও নিরাপত্তার ইস্যুতে পর্যটন স্পট গড়ে তোলায় অনাগ্রহ রয়েছে। যদিও প্রাকৃতিকভাবেই সেসব অঞ্চল আকর্ষণীয়। এর পরও দেশী-বিদেশী পর্যটকরা শুধু নিরাপত্তা ইস্যুতে সেখানে যেতে চান না। বিষয়টিতে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন।

পর্যটন খাতকে কতটা কাজে লাগাতে পারছে বাংলাদেশ?

একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করি। পর্যটন খাতে ছাড়পত্র নিয়ে ২০১৯ সালে বান্দরবানের নীলাচলে ১৫ একর জায়গার ওপর বিশাল অংকের বিনিয়োগ করি। পরিকল্পনা ছিল আন্তর্জাতিক মানের একটি পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের। কিন্তু গত বছরগুলোয় কোনো কাজই করতে পারিনি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দাউদুল ইসলামের অসহযোগিতাই ছিল এর কারণ। এমন হয়রানির কারণে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা থেকে পিছিয়ে আসেন ক্ষুদ্র থেকে বড় উদ্যোক্তারাও।

পরে বান্দরবানের তারকা মানের হোটেল গড়ে তোলার অগ্রগতি কী?

বান্দরবানে হোটেল তৈরির কার্যক্রম বন্ধ আছে কারণ বান্দরবন জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাশক অন্যায় ভাবে যে জটিলতা তৈরি করে গিয়েছেন বর্তমানেও তা নিরসন হয়নি। ২০০৯-১০ সালের জেলা প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে আমাদের ক্রয় করা এবং দখলে থাকা জমি অন্যায়ভাবে নীলাচলের পর্যটন কেন্দ্রের জমি বলে দাবি করেছেন এবং তার ধারাবাহিকতা এখনো আছে, বিষয়টি সমাধানের উদ্দেশ্যে এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির আবেদন করছি।

দেশে ইকো-ট্যুরিজমকে বিকশিত করার জন্য কেমন পরিকল্পনা নেয়া উচিত?

ইকো-ট্যুরিজমের গুরুত্ব অনুধাবন করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ইকো-ট্যুরিজমের বিকাশে মনোনিবেশ করেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশেও ইকো-ট্যুরিজমের সম্পদে ভরপুর। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। এসব ঘিরে ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তুলতে পারলে অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। এক্ষেত্রে সরকার উদ্যোক্তাদের ইনটেনসিভও দিতে পারে।

বিদেশী মুদ্রা অর্জনে পর্যটন খাতের ভূমিকা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?

২০১৯ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বিদেশী পর্যটকরা এ দেশে ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছেন। অন্যদিকে দেশীয় পর্যটকরা খরচ করেন ৬৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অথচ ভারত, থাইল্যান্ডসহ আশপাশের দেশগুলোয় বৈশ্বিক অনেক পর্যটক আসেন। পর্যটন শিল্পের সবটুকু সম্ভাবনা বাংলাদেশ যদি কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আদর্শ হতে পারে। কক্সবাজারে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এগুলোয় প্রায় প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। পরোক্ষভাবে ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।

পর্যটন খাতের বিকাশে ব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়াস রয়েছে। এর কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে কি?

ট্যুরিজম বোর্ড গঠন হওয়ার পর থেকে বিভিন্নভাবে ব্র্যান্ডিং করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। ট্যুরিজম বোর্ড গঠন হয়েছে ২০১০ সালে। দুই বছর মহামারী বাদ দিলে ১০ বছর আমরা দেশে-বিদেশে পর্যটনকে উপস্থাপন করতে পেরেছি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে পর্যটন সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৪ দেশের মধ্যে ১১৮তম। আর ২০১৯ সালে বিশ্বের ১৪০টি দেশের মধ্যে এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৫। আশা করছি সামনের দিনগুলোয় বৈশ্বিকভাবেই ব্র্যান্ডিংয়ের সুফল মিলবে।