এনবিআর সবসময়ই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক মনোভাব প্রদর্শন করে আসছে। একইভাবে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকা (এমসিসিআই) রাজস্ব আহরণ বিষয়ে জাতীয় ইস্যুতে এনবিআরকে সহযোগিতা করে আসছে। এমসিসিআইয়ের অধিকাংশ সদস্যই এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের সদস্য। আমার ধারণা মতে, সামগ্রিক জাতীয় রাজস্বের প্রায় ৪০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি আসে এমসিসিআইয়ের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও শিল্প গ্রুপ যারা প্রতি বছরই সর্বাধিক পরিমাণ জাতীয় রাজস্ব প্রদান করে থাকে, যেমন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, গ্রামীণফোন, স্কয়ার, এসিআই ও ট্রান্সকম গ্রুপসহ অন্যান্য বহুজাতিক ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আমাদের সদস্য। সে হিসেবে এমসিসিআই ও এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় রাজস্ব সংগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
এমসিসিআই বরাবরই রাজস্ব আদায় সহজীকরণে এনবিআরকে সহযোগিতা করে আসছে। করায়ন পদ্ধতি সংস্কারের সঙ্গেও এমসিসিআই একাত্মতা প্রকাশ করে। আমরা সবসময়ই একটি উন্নত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুকরণে গুরুত্ব আরোপ করে আসছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলছে এবং সব ক্ষেত্রে আমরা উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করছি। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বর্তমান সরকারের দক্ষ নেতৃত্বে এবং বর্তমান চেয়ারম্যানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় এনবিআর দেশের উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবারের মতো এবারো এনবিআর ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। বাজেট প্রণয়ন উপলক্ষে এনবিআর সব ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছ থেকে প্রস্তাব চেয়েছে।
আমাদের বাজেট প্রস্তাবের মধ্যে সবসময়ই বাজেট ব্যবস্থাপনা অধিকতর গতিশীল করার দিকে জোর থাকে। আমরা বিশ্বাস করি, বাজেট ব্যবস্থাপনা গতিশীল ও স্বচ্ছ হলে ব্যবসায়ীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে রাজস্ব প্রদান করবেন। আমরা আমাদের বাজেট প্রস্তাবে সামগ্রিক কল্যাণ তথা দেশের কল্যাণ ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণ চিন্তা করে থাকি। যাতে একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য করা সহজ হয়, অন্যদিকে দেশের রাজস্ব আয়েও যেন ঘাটতি না থাকে।
গত বছরের শুরুতে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট (সিডিপি) কর্তৃক বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার জন্য সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছে। সেই সুপারিশ অনুযায়ী ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে পুরোপুরি বের হয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিগণিত হবে। এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশের কিছু বাণিজ্য ও অন্যান্য সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তখন সবচেয়ে সমস্যায় পড়বে রফতানি খাত। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও ২০২৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপির আওতায় এ শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকবে। তখন এসব বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নিয়মিত হারে শুল্ক বসবে। সম্প্রতি প্রকাশিত ডব্লিউটিওর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাড়তি ট্যাক্সের কারণে বছরে রফতানি ৫৩৭ কোটি ডলার বা সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে।
বিগত অর্থবছরে করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারীর কারণে যদিও রাজস্ব আয় চাপের মধ্যে ছিল, তথাপি এনবিআর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে রাজস্ব আহরণের গতিকে স্বাভাবিক রাখতে। তবে এ মহামারী দীর্ঘায়িত হওয়ায় কিছু ক্ষেত্র ছাড়া (ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য) ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর এ প্রভাব বেশি।
আমি এনবিআর চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু বিষয় বলতে চাই। বিগত অর্থবছরে প্রায় সব ক্ষেত্রে (প্রাইভেট, পাবলিক ও ব্যাংক) করপোরেট করহার ২.৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। সেজন্য আমরা সরকারের নীতিনির্ধারক ও এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের দেশে কার্যকর করপোরেট করহার অনেক বেশি। এখানে অননুমোদিত ব্যয় এবং উৎসে কর কর্তন এত বেশি যে আমরা ব্যবসায়ীরা এ করপোরেট করহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর সুবিধা ভোগ করতে পারছি না। বাস্তবে এ করপোরেট করহার পাবলিক কোম্পানির ক্ষেত্রে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ আর থাকে না, তা ক্ষেত্রবিশেষে ৫০-৬০ শতাংশ হয়ে যায়। সুতরাং বিষয়টি আবারো ভেবে দেখার জন্য চেয়ারম্যান মহোদয়কে অনুরোধ জানাচ্ছি। খসড়া করাদেশের কপি করদাতাকে দেখানো এবং করদাতার ব্যাখ্যা গ্রহণের পর করাদেশ চূড়ান্ত করার জন্য বর্তমান আইনে বিধান রাখা প্রয়োজন। এখন দেখা যায় যে কখনো কখনো শুনানি পর্যায়ে চাহিদা মোতাবেক প্রমাণাদি দাখিল করার জন্য এককভাবে করাদেশ প্রণয়ন করে বিশাল অংকের কর দাবি করা হচ্ছে। ফলে করদাতার সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তারা অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিলে আপিল/ট্রাইব্যুনাল করার জটিলতা অনেকাংশে কমে যাবে।
কর নির্ধারণ, আপিল, ট্রাইব্যুনাল, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পর্যায়ে অনলাইনে শুনানি গ্রহণের বিধান বর্তমান আইনে প্রবর্তন করা প্রয়োজন। কেননা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হলে একদিকে যেমন সময় বাঁচবে, অন্যদিকে শুনানিতে হাজিরা নিশ্চিত হবে। অর্থ আইনের বিধান অনুযায়ী আইনের কোনো পরিবর্তন হলে করপোরেট করহার ১ জুলাই থেকে কার্যকর করে পূর্ববর্তী বছরের আয়ের ওপর ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয়। পক্ষান্তরে উৎসে কর কর্তনের হার ১ জুলাই থেকে কার্যকর করে পরবর্তী বছর থেকে প্রয়োগ করা হয়। এমসিসিআই সুপারিশ করছে যে অর্থ আইনের যেকোনো পরিবর্তন পরবর্তী বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার বিধান রাখা। তাহলে বার্ষিক সাধারণ সভা ও শেয়ার ধারকদের অনুমোদিত আর্থিক বিবরণী বিষয়ে অনেক ঝামেলা এড়ানো সম্ভব হবে।
২০২১-২০২৪ মেয়াদের রপ্তানি নীতিতে ৮০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানির লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব যদি পণ্যে বৈচিত্র বাড়ানো যায়। যা নিশ্চিতের অন্যতম ক্ষেত্র কর সুবিধা। পোশাক খাতে সাধারণ কারখানার জন্য ১২ শতাংশ এবং গ্রীন কারখানার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ করপোরেট কর হার আরোপ আছে। পোশাক বহির্ভূতখাতগুলোর জন্যও এ সুবিধা প্রয়োজন। আসন্ন বাজেটে এ সুবিধা নিশ্চিত করতে নীতি নির্ধারকদের অনুরোধ জানাচ্ছি।





