বাংলাদেশে ক্যাশলেস সোসাইটি কেন গড়ে উঠছে না? এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাংকগুলো কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

বাংলাদেশে ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো পিওএস ও কিউআর অবকাঠামো যথেষ্ট বিকশিত না হওয়া, ইন্টারনেটের ধীরগতি ও সাইবার ভীতি। এছাড়া কার্ড বা কিউআর থেকে ক্যাশ সেটলমেন্ট প্রক্রিয়া সহজ না হওয়া এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে করের ভয় নগদ টাকার ওপর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে রাখছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সব শ্রেণীর গ্রাহকের সুবিধার্থে ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর ব্যবহারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ ও বাংলা ভাষায় রূপান্তর করতে হবে। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে ডিজিটাল লেনদেনের বিপরীতে ইনস্ট্যান্ট ক্যাশব্যাক, ট্রানজেকশন ডেটাভিত্তিক জামানতহীন ‘স্মার্ট ন্যানো-লোন’ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গ্রাহকদের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে ব্যাংকগুলোকে এআই-ভিত্তিক শক্তিশালী সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে ক্যাশলেস লেনদেনে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের মধ্যে অহেতুক ভীতি দূর করতে হবে।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে গ্রাহকদের জন্য আপনাদের বিশেষ কোনো অফার আছে কিনা?

ঈদুল আজহা উপলক্ষে ইসলামী ব্যাংক খিদমাহ ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের জন্য রয়েছে মাস্টারকার্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘ইলেকট্রনিকস ক্যাম্পেইন’ অফার, সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন মূল্যমানের একাধিক গ্যাজেট ভাউচার। কক্সবাজার, সিলেট ও গাজীপুরে হোটেল-রিসোর্টেও রয়েছে আকর্ষণীয় ছাড়। এছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ড মার্চেন্টে কেনাকাটার ক্ষেত্রে উৎসবকালীন তিন থেকে ৩৬ মাস পর্যন্ত শূন্য শতাংশ ইএমআই সুবিধা। একই সঙ্গে নির্ধারিত অংশীদারদের সঙ্গে বিশেষ ক্যাশব্যাক অফার তো থাকছেই। ‘বাই ওয়ান গেট ফোর’সহ গ্রোসারি ও রিটেইল দোকানগুলোতেও রয়েছে বিশেষ মূল্যছাড়। ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকরা বিশ্বব্যাপী ১২০টিরও বেশি দেশের প্রায় দেড় হাজার বিমানবন্দর লাউঞ্জে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার সুবিধা পাচ্ছেন। এক হাজারের বেশি ব্র্যান্ড আউটলেটে নানা রকম ছাড়সহ আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক ও ৩৬ মাস পর্যন্ত শতাধিক ব্র্যান্ড মার্চেন্টে শূন্য ইএমআই সুবিধা রয়েছে। আমাদের গ্রাহকদের বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে ঈদের এ উৎসবের আমেজকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই আমরা।

ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল অ্যাপস, এমএফএস, কিউআর কোড ও ডিজিটাল ওয়ালেটের বিস্তার ক্যাশলেস অর্থনীতিকে কতটা এগিয়ে নিচ্ছে? এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

খিদমাহ ক্রেডিট কার্ড, আধুনিক মোবাইল অ্যাপস, এমএফএস ও সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ কোডের দ্রুত বিস্তার আমাদের ক্যাশলেস অর্থনীতির ভিত্তি তৈরিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, যা প্রতিদিনের কেনাকাটা থেকে শুরু করে ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো জটিল প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো ব্যাংক খাতের এ ডিজিটাল অবকাঠামোকে সাধারণ গ্রাহকের কাছে আরো সহজবোধ্য করতে স্মার্ট ও নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করা এবং আর্থিক ও প্রযুক্তিগত স্বাক্ষরতা বৃদ্ধিতে সার্বক্ষণিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যাশলেস সমাজ বিনির্মাণে সক্রিয় অবদান রাখা। ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব ফ্ল্যাগশিপ অ্যাপ সেলফিনে এসব পরিষেবা চালু আছে, যা একটি মিনি শাখার মতো কাজ করে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

শহরাঞ্চলে ক্যাশলেস লেনদেনের কিছুটা বিস্তৃতি দেখা গেলেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখনো এর কোনো প্রভাব দেখা যায় না। এজন্য ব্যাংকগুলোর কী ধরনের উদ্ভাবনী ধারণা প্রয়োজন?

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে ক্যাশলেস ব্যবস্থার আওতায় আনতে প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের বাইরে গিয়ে কিছু বিশেষায়িত ও সহজবান্ধব উদ্ভাবন প্রয়োজন। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ছাড়াও সাধারণ ফিচার ফোনেই যেন নিরাপদ লেনদেন করা যায়, সেজন্য ‘ইউএসএসডি-ভিত্তিক স্মার্ট ওয়ান-ট্যাপ পেমেন্ট’ ব্যবস্থা চালু করা দরকার। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো জামানত ছাড়া কেবল তাদের প্রতিদিনের ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড বা ডেটা বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক ‘অটোমেটেড ন্যানো লোন’ বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যা তাদের ক্যাশলেস হতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করবে। গ্রামীণ বাজারে ক্যাশ-আউট চার্জ পুরোপুরি তুলে দিয়ে প্রতিটি দোকানে একক ‘ভয়েস-অ্যাক্টিভেটেড বাংলা কিউআর’ স্থাপন করা প্রয়োজন, যা টাকা জমা হওয়া মাত্রই বিক্রেতাকে বাংলা ভয়েস মেসেজ দিয়ে নিশ্চিত করবে যে টাকা জমা বা উত্তোলন হয়েছে। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটগুলোকে ‘ডিজিটাল ক্যাশ-ইন পয়েন্ট’-এ রূপান্তর করা এবং ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর সম্পূর্ণ ‘ভয়েস কমান্ড-চালিত বাংলা ইন্টারফেস’ তৈরি করা উচিত, যাতে নিরক্ষর মানুষও মুখে বলেই সহজে লেনদেন করতে পারেন। সর্বোপরি ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে দৈনিক ১০-২০ টাকা জমার মতো ‘মাইক্রো-সেভিংস স্কিম’ সরাসরি ডিজিটাল ওয়ালেটে যুক্ত করার উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রামীণ অর্থনীতিকে দ্রুত ক্যাশলেস করে তুলবে।