বাংলাদেশে উৎসব এখন শুধু সাংস্কৃতিক উদযাপনের উপলক্ষ নয়। এটি দেশের ভোগব্যয়, খুচরা বাণিজ্য ও সেবা খাতকে গতিশীল করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ঈদ, পূজা কিংবা পহেলা বৈশাখ, প্রতিটি বড় উৎসবকে ঘিরে দেশের বাজারে তৈরি হয় এক বিশেষ অর্থনৈতিক গতি, যা খুচরা বাণিজ্য, ভ্রমণ, ই-কমার্স, রেমিট্যান্স, খাদ্য, ফ্যাশন ও সেবা খাতকে একসঙ্গে সচল করে তোলে। বিশেষ করে ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা ও ব্যয় এখন দেশের ‘ফেস্টিভ্যাল ইকোনমি’ বা উৎসব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

ঈদকে সামনে রেখে নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যে ক্রেতারা এখন সুবিধাজনক, সময়সাশ্রয়ী ও মূল্যভিত্তিক কেনাকাটার দিকে আরো বেশি ঝুঁকছেন। সরকার ঈদ উপলক্ষে বিপণিবিতান রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়ায় বাজারে কেনাকাটা বেড়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকলেও ভোক্তাদের ব্যয় আচরণে স্থিতিস্থাপকতা দেখা যাচ্ছে। মানুষ ইলেকট্রনিকস, কোরবানি-সংক্রান্ত সেবা, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

এ উৎসব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে পেমেন্ট আচরণের রূপান্তরে। যদিও তা এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়, বরং একটি ধীরগতির পরিবর্তন প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনো প্রায় ৭২ শতাংশ লেনদেন নগদ অর্থে সম্পন্ন হয়, যেখানে ডিজিটাল লেনদেনের অংশ প্রায় ২৮ শতাংশ। এ বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে নগদের আধিপত্য এখনো বিদ্যমান। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট ধীরে ধীরে বিস্তৃত ও গ্রহণযোগ্যতার দিকে এগোচ্ছে, বিশেষ করে উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে।

ঈদকে ঘিরে ভোক্তা আচরণে এ পরিবর্তন আরো স্পষ্ট হয়। কার্ড পেমেন্ট, ই-কমার্স, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং অনলাইন ট্রান্সফার সব মিলিয়ে উৎসবকালীন কেনাকাটা ও সেবাভিত্তিক লেনদেনে ডিজিটাল চ্যানেলের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে প্রসেসিং ও ডেলিভারি, আবার ভ্রমণ বুকিং, লাইফস্টাইল সেবা কিংবা দৈনন্দিন মুদি কেনাকাটা, সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো একটি সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।

কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে মাস্টারকার্ড, বিভিন্ন ব্যাংক এবং বিস্তৃত ইকোসিস্টেম অংশীদারদের অংশগ্রহণে ডিজিটাল গরুর হাট চালু রয়েছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য অংশের লেনদেন ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এ উদ্যোগে মাস্টারকার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

উৎসব অর্থনীতি এখন আর শুধু ‘পণ্য কেনা’কেন্দ্রিক নয়, বরং এটি ‘অভিজ্ঞতা, সুবিধা ও আস্থা’ নির্ভর ভোগব্যয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নিরাপদ চেকআউট, দ্রুত ডেলিভারি এবং রিওয়ার্ডভিত্তিক অফারগুলো ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি ভোক্তার আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়াচ্ছে। চলতি ঈদ মৌসুমে এ প্রবণতাকে আরো উৎসাহিত করতে ব্যাংক ও পেমেন্ট নেটওয়ার্কগুলো বিভিন্ন অফার ও রিওয়ার্ড ক্যাম্পেইন চালু করেছে।

মাস্টারকার্ড ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট ইলেকট্রনিকস পণ্যে অনলাইন কেনাকাটায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়, ইন-স্টোর ডিসকাউন্ট সুবিধা এবং ‘মাস্টারকার্ড লাখ টাকার উৎসব’ ক্যাম্পেইনের আওতায় গ্যাজেট ভাউচার জয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ট্রাভেল, ফ্যাশন, রিসোর্ট এবং গ্রোসারি খাতেও ডিজিটাল পেমেন্টভিত্তিক অফারগুলো ভোক্তাদের ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে আরো আগ্রহী করে তুলছে।

একটি টেকসই ‘ক্যাশ-লাইট’ অর্থনীতিতে যেতে প্রযুক্তিগত, নীতিগত সহায়তা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাস্তবে এখনো অনেক মার্চেন্ট ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে অনীহা দেখান। কারণ হিসেবে দেখা যায়, পিওএস মেশিন, স্মার্ট কার্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ওপর উচ্চ কর ও পরিচালন ব্যয় তাদের নিরুৎসাহিত করে। বর্তমানে স্মার্ট কার্ডের ওপর ৭৬ শতাংশের বেশি এবং পিওএস মেশিনের ওপর ৩৮-৫৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে। এ করহার ১৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা গেলে ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো আরো দ্রুত বিস্তৃত হবে।

একই সঙ্গে গ্রাহক ও মার্চেন্ট, উভয়ের জন্য প্রণোদনাভিত্তিক কাঠামো চালু করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, তিন বছরের জন্য ৫ শতাংশ সম্মিলিত প্রণোদনা দেয়া। যেখানে গ্রাহক পাবেন ৩ শতাংশ এবং মার্চেন্ট ২ শতাংশ, এটি ডিজিটাল লেনদেনে বড় ধরনের গতি আনতে পারে।

বাংলাদেশের উৎসব অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে ব্যাংক, এমএফএস, ফিনটেক, মার্চেন্ট ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা জরুরি। একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে সব ধরনের পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমান সুযোগ নিয়ে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও নিরাপদ সেবা দিতে পারে। পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং গ্রামীণ অঞ্চলে পেমেন্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।