ধীরে ধীরে দেশের নদী-খাল, বন-মাটি, জীববৈচিত্র্য তীব্র হুমকির মুখে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে শুরু কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যে।

পরিবেশের অন্যতম উপাদান হলো বন। সেই বনই দেশে আশঙ্কাজনক হারে কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিবেশ, পরিবর্তন ও দুর্যোগ পরিসংখ্যান শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আট বছরে দেশের বনভূমি কমেছে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৫ সালে বন এলাকা ছিল ১৮ হাজার ৪৯৯ দশমিক শূন্য ৮ বর্গকিলোমিটার বা ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ এলাকা। কিন্তু ২০২৩ সালে এসে কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪৯৮ দশমিক ১৮ কিলোমিটারে বা ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিকভাবে বন উজাড়ীকরণের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে সেটি ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

বনের মতো ভালো নেই দেশের নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়। শিল্প-কলকারখানা থেকে তরল বর্জ্য নদীতে পতিত করার মধ্য দিয়ে মারাত্মকভাবে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। গার্হস্থ্য ব্যবহার্য বিভিন্ন ডিটারজেন্ট, তেল ও চর্বি পদার্থ বিপজ্জনক দূষণকারী হওয়ায় পানিতে মিশে নদীতে প্রবাহিত হওয়ার ফলে নদী দূষিত হয়। ডায়িং কারখানাগুলোতে এক টন কাপড় উৎপাদন করতে নদীতে বর্জ্য যাচ্ছে ২০০ টন। ট্যানারি থেকে প্রতিদিন প্রায় ২১ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে।

ঢাকার প্রাণখ্যাত বুড়িগঙ্গা এখন কার্যত মৃত। একসময় বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ পানিতে ভেসে চলত নৌকা, ঘাটে ঘাটে মানুষ নামত গোসল করতে, শিশুরা ডুব-সাঁতারে মত্ত থাকত নদীর পানিতে। সেই নদীর পানি আজ কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত, প্রাণহীন-নিস্তব্ধ। বুড়িগঙ্গার পানি আর জীবন বহন করে না, বহন করে বিষ। ঢাকার শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য ও প্লাস্টিকের বর্জ্যে নদীর পানি হয়ে উঠেছে বিষাক্ত মিশ্রণ। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, ঢাকার আশপাশের তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যাও এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। শুধু এগুলোই নয়, মেঘনা, যমুনা, পদ্মা, কর্ণফুলীসহ দেশের প্রধান নদীগুলোর পানিও এখন মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য।

পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের তুলনায় এখন দূষণের মাত্রা তিন গুণ বেড়েছে। বুড়িগঙ্গায় দূষণ ২০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ শতাংশে, পদ্মায় ১৮ থেকে ৬৫, যমুনায় ১০ থেকে ৫৫ এবং মেঘনায় ১৫ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ঢাকার নদীগুলোয় প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ কোটি লিটার বর্জ্য মিশছে, যার অন্তত ৬০ শতাংশই অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য। অক্সিজেনের মাত্রা নেমে এসেছে ১ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম/লিটারে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য একেবারেই প্রতিকূল।

বিপজ্জনকভাবে দূষিত হচ্ছে মাটিও। মাটি দূষণ বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা, যেখানে মাটির স্বাভাবিক ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলি নষ্ট হয়ে যায় এবং মাটি আর উদ্ভিদ উৎপাদন ও পরিবেশগত কার্যক্রম বজায় রাখতে সক্ষম থাকে না। বাংলাদেশে মাটি দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস কৃষিতে নির্বিচারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। স্বাধীনতার পর খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে উচ্চফলনশীল জাতের ফসল চাষের পাশাপাশি ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ব্যবহার দ্রুত বাড়ে। শুরুতে ফসল উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবণতা মাটির জৈব উপাদান কমিয়ে দিয়েছে, মাটির গঠন শক্ত ও অনুর্বর করে তুলেছে এবং উপকারী অণুজীব ধ্বংস করেছে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহারের ফলে মাটিতে নাইট্রেট জমা হচ্ছে, যা শুধু ফসলের গুণগত মান কমাচ্ছে না, বরং ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে। একই সঙ্গে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ মাটিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত অনেক কীটনাশক আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ বা সীমিত হলেও সেগুলোর ব্যবহার এখনো দেখা যায়, যা মাটির পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যকেও চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

পরিবেশের অন্যতম উপাদান বায়ু। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব। গত বছর প্রকাশিত সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। পিএম ২.৫ ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, লোয়ার রেসপিরেটরি ইনফেকশন এবং লাং ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষত, ছোট শিশুরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রতি বছর পিএম ২.৫ সংশ্লিষ্ট লোয়ার রেসপিরেটরি ইনফেকশনে ৫ হাজার ২৫৮ শিশুর মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে বিশ্বের দূষিত দেশের তালিকায় শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। প্রতি ঘনমিটার বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বালিকণার বার্ষিক গড় মান ছিল ৭৯ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম; যা বার্ষিক জাতীয় মানদণ্ড ৩৫ মাইক্রোগ্রামের দ্বিগুণের বেশি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি।

সিআরইএর মতে, বাংলাদেশের জাতীয় বায়ুমানের মানদণ্ড (৩৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার) পূরণ করা সম্ভব হলেও মৃত্যুহার ১৯ শতাংশ, আয়ুষ্কালজনিত সমস্যা ২১ শতাংশ এবং অক্ষমতা নিয়ে বসবাসের বছর ১২ শতাংশ কমতে পারে। ডব্লিউএইচওর গাইডলাইন কঠোরভাবে মেনে চলা সম্ভব হলে প্রতি বছর ৮১ হাজার ২৮২ মানুষের জীবন রক্ষা করা যাবে।

মানুষের ক্রম আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অস্তিত্ব। নদীভাঙনের কারণেও কমছে এর আয়তন। হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। বাঘ ও হরিণ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে পাচার, বনের মধ্য দিয়ে ভারী নৌযান চলাচল নানা ক্ষতি করছে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত এ বনভূমির।

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে বনভূমির আয়তন ক্রমেই কমছে, বাড়ছে জলাভূমির পরিমাণ। ৩৭ বছরে সুন্দরবনের আয়তন কমেছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস সম্প্রতি ‘সুন্দরবন জয়েন্ট ল্যান্ডস্কেপ ন্যারেটিভ-২০১৬’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭৭৬ সালে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ছিল ১১ হাজার ২৫৬ বর্গকিলোমিটার। ২০১৫ সালে এর আয়তন দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারে। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান স্পারসো এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ১৯৭৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে এ বনের আয়তন কমেছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার।

দেশের সামগ্রিক পরিবেশের চেয়েও খারাপ অবস্থা রাজধানী ঢাকার। বিভিন্ন সমীক্ষা, প্রতিবেদন সবকিছুতে ঢাকা বাসযোগ্যতার একেবারে নিচের দিকের শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে অপ্রতুল নাগরিক সুবিধা, অপরিকল্পিত আবাসন, অসহনীয় যানজট, মৌলিক সুবিধাপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে ঢাকা এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বসবাসের অযোগ্য শহরে। দেশের মোট জিডিপিতে ঢাকার অবদান প্রায় ৩৬ শতাংশ। দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৩২ শতাংশই হয়েছে এখানে। অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হলেও স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত নগরীর পরিকল্পিত সম্প্রসারণ ঘটানোর কোনো উদ্যোগই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও ধারণার চেয়েও দ্রুত নগরীর কলেবর ও জনসংখ্যা—দুটোই বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজ-সংস্কৃতির কেন্দ্র হওয়ার দরুন ঢাকায় জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে উচ্চ হারে।

বর্তমানে ঢাকায় জনসংখ্যার পরিমাণ দুই থেকে সাড়ে তিন কোটিতে ছাড়িয়ে গেছে। সীমিত জায়গায় বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস হলেও নগরীর আবাসন, যোগাযোগ, স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আনুষঙ্গিক সব অবকাঠামোই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাস করছে ঢাকাবাসী, যেগুলোয় নাগরিক পরিষেবা পেতে পদে পদে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। তীব্র যানজটে কমেছে শহরের মানুষের গতি। স্বাস্থ্য অবকাঠামো অপ্রতুল। নেই মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নেই খেলার মাঠ, হাঁটার পার্ক।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে ঢাকায় বছরে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে। বর্তমানে ঢাকার ৪০ শতাংশ আবাসিক এলাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব দাঁড়িয়েছে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৯৯ হাজার জন। ১৯৯১ সালের পর থেকেই ঢাকার উপকণ্ঠগুলোয়ও বাড়তে শুরু করেছে জনসংখ্যার ঘনত্ব। এ সময়ের মধ্যেই ঢাকার সম্প্রসারণ হয়েছে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে। একই সঙ্গে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে ঢাকার উপকণ্ঠের পরিমাণ।

এশিয়া ও আফ্রিকার দ্রুতবর্ধিষ্ণু দেশগুলোর বড় শহরগুলোয় নগরায়ণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে গবেষণা করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সেন্টার ফর সাসটেইনেবল, হেলদি অ্যান্ড লার্নিং সিটিস অ্যান্ড নেইবারহুডস (এসএইচএলসি)। সংস্থাটির গবেষণা বলছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকার মূল শহরের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ শতাংশ হারে। শহর উপকণ্ঠে প্রবৃদ্ধির হার আরো বেশি, ৪৩ শতাংশ। ১৯৯১ সালে ঢাকার উপকণ্ঠের আয়তন ছিল ১১৬ বর্গকিলোমিটার, ২০১৯ সালে হয়েছে ২৩৪ বর্গকিলোমিটার। শিগগিরই ঢাকার উপকণ্ঠের পরিমাণ মূল শহরের আয়তনকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

ঢাকার যেকোনো সড়কে যেকোনো সময় হর্ন বাজা এখন নিত্যদিনের চিত্র। সরকার বিভিন্ন সময়ে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও পরে নিজেই সেই সিদ্ধান্তের কথা ভুলে গেছে। অথচ প্রতি বছর বিশেষ দিবসগুলো এলে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিতরণ করা সচেতনতামূলক লিফলেটে লেখা থাকে, ‘শব্দ দূষণে মৃত্যুও হতে পারে।’ জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘ফ্রন্টিয়ার্স’-এ প্রকাশিত ‘ইভ্যালুয়েশন অব নয়েজ পলিউশন ইমপ্যাক্ট অন হেলথ ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় শব্দের মাত্রা অনুমোদিত সীমার বহু ওপরে পৌঁছে গেছে। এ ভয়াবহ শব্দদূষণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে যানবাহনের তীব্র হর্ন, মডিফাইড মোটরসাইকেল এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ। এ শব্দদূষণের প্রভাবে মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে হার্টের সমস্যা ও ইন্দ্রিয়জনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, একজন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ৭০ ডেসিবলের বেশি মাত্রার শব্দের মধ্যে বসবাস করলে তার শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ঘুমের সমস্যা ও মানসিক চাপের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। অথচ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাতে ১০৭ ডেসিবল এবং দিনে তার চেয়েও অনেক বেশি মাত্রার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, যা নগরজীবনের নীরব ঘাতক হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ করছে। তবে এর সঙ্গে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত তিন দশকে বর্জ্য উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহর ও পৌর এলাকায় প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পদার্থ তৈরি হচ্ছে, সেগুলো যথাযথভাবে সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না। যত্রতত্র উন্মুক্তভাবে ময়লা ফেলে রাখা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ।

দেশে এখনো বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা কোনো ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইকরণের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তারা প্রতিদিন উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করে যাচ্ছেন যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজধানী ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সাধারণত দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত ল্যান্ডফিল হলো আমিনবাজারে এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত ল্যান্ডফিল হলো মাতুয়াইলে। এ দুই ল্যান্ডফিলের আয়তন প্রায় সমান, ১০০ একরের কাছাকাছি হবে। দুটি ল্যান্ডফিলই স্যানিটারি ল্যান্ডফিল হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এগুলো উন্নতমানের উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল হিসেবে কাজ করছে। কারণ এখানে বর্জ্য নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ার্ড পদ্ধতি, যেমন গ্যাস কালেক্টর ব্যবহারের কোনো সুবিধা নেই এবং ময়লা ঢেকে রাখার জন্য কোনো কভারও ব্যবহার করা হয় না। যদিও লিচেট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট রয়েছে, তবুও সঠিকভাবে লিচেট সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। এছাড়া এ দুই ল্যান্ডফিলই নদীর তীরে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এছাড়া বর্জ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সমস্যা প্রকট। কারণ বাংলাদেশে সব ধরনের বর্জ্য একত্রে সংগ্রহ করা হয়। অথচ উন্নত দেশগুলোয় প্লাস্টিক, ধাতু, খাদ্য ইত্যাদি আলাদা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে মেডিকেল বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করে পোড়ানো হয় কিন্তু পোড়ানোর পর উৎপন্ন গ্যাস পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সাম্প্রতিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের পলিউশন কন্ট্রোল ল্যাবরেটরির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে নির্গত লিচেটের দূষণমাত্রা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। উভয় ল্যান্ডফিল থেকে নির্গত লিচেটের মাধ্যমে আশপাশের মাটি, ভূগর্ভস্থ পানি ও জলাশয়ের পানিতে ডব্লিউএইচওর নির্ধারিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে ক্ষতিকর ধাতুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এছাড়া উচ্চ মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক উপস্থিতি লিচেট ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এছাড়া সংলগ্ন এলাকাতেও ব্যাপক পরিমাণে ক্ষতিকর ধাতু ও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যার প্রধান উৎস হচ্ছে এই ল্যান্ডফিল। এ ধরনের অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে, যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।

পরিবেশসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত উন্নতি না হলে প্রবৃদ্ধির খাতা নেতিবাচকই থেকে যায়। রাজনৈতিক দৃঢ় সিদ্ধান্তই দেশের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে তাদের প্রত্যাশা।