নব্বইয়ের দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি রোধে নানা কার্যক্রম ও পরিকল্পনা শুরু হয়। তার পরও দেশে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনার মতো বড় শহরগুলোর মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবেশ ও উন্নয়নকে মুখোমুখি মনে করার ফলেই জলবায়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মাস্টারপ্ল্যানগুলোয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার জন্য মাস্টারপ্ল্যান করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংস্থাটি ১৯৯৫-২০১৫ সাল মেয়াদে ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি) নামে একটি মাস্টারপ্ল্যান করে। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুটি বিবেচনায় আনা হয়নি। তবে ২০১৬ সালে রাজউক প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় জলবায়ুর পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে নগর পরিকল্পনা করা হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ১৯৯৫-২০১৫ সালের জন্য চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান এবং ১৯৯৫-২০০৫ সাল মেয়াদে আরবান ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে জলবায়ু ইস্যুটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি।
চট্টগ্রামের পাশেই আছে সমুদ্রবেষ্টিত কক্সবাজার জেলা। শহরটির জন্য ‘ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ফর কক্সবাজার টাউন অ্যান্ড সি বিচ আপ টু টেকনাফ’ শীর্ষক উন্নয়ন পরিকল্পনা নেয়া হয় ২০১১ সালে। এর মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কক্সডিএ) করা প্ল্যানটিতে রাখা হয়নি জলবায়ুর মতো বহুল আলোচিত ও জরুরি বিষয়।
খুলনা শহরের জন্য তিনটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। স্ট্রাকচারাল প্ল্যান ফর খুলনা মেট্রোপলিটন এরিয়া (২০০১-২১), ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান ফর খুলনা মাস্টারপ্ল্যান এরিয়া (২০১৮-২৩) ও খুলনা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান মোংলা (২০১১-৩১)—এ তিন পরিকল্পনায়ও জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুটি সেভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি খুলনা। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তাদের প্রণীত প্রথম মাস্টারপ্ল্যানে (২০০৪-২৪) জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি। তবে ২০২২-৪১ সালের জন্য প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় না নেয়ার তথ্য উঠে এসেছে ‘বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৫’ উপলক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থে। ওই গ্রন্থে একটি গবেষণা প্রবন্ধে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। প্রবন্ধের লেখক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা-১) আবুল বাকের মো. তৌহিদ দেখিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলো ১৯৯৫-২০১০ সাল পর্যন্ত করা মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়নি। যদিও বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকির দেশে বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ সংকট মূলত দেশের নগর পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের বোঝাপড়ার ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবুল বাকের মো. তৌহিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাটি নতুন। ২০১০ সালের আগে করা মাস্টারপ্ল্যানগুলোয় পরিবেশকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ২০১০ সালের পর করা মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু পরিবর্তনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
২০১০ সালের পর প্রণয়ন হয়েছে খুলনা ও কক্সবাজারের মাস্টারপ্ল্যান। সেখানে জলবায়ুর বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্ল্যানিংয়ের অনেক দিক আছে। স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং, আরবান এরিয়া প্ল্যান। মোটা দাগে বলা যায়, এসব শহরে হয়তো জলবায়ুর বিষয়টি কমতি আছে, সেটা পূরণ করতে হবে। নতুন প্ল্যানে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন ড্যাপ ২০২২-৩৫ প্রকল্প পরিচালক ও রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, বন্যা, অতিবৃষ্টি আমাদের অনেক বছরের সমস্যা। এখন নগর এলাকায় নতুন করে পানি সংকট, গরমের তীব্রতা, শীতের স্বল্পতার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। যেগুলো মোকাবেলায় কিংবা সহনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নগরীর অবকাঠামো, স্থাপনা, সড়ক, ডেনসিটি জোনিং, সবুজায়ন ইত্যাদি ভূমিকা রাখতে পারে। সে বিবেচনায় আমরা ড্যাপে জলবায়ু বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করেছি।’
মূলত গাইডলাইনের অভাবে এখনো দেশের অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনাগুলোয় জলবায়ুর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যখন কোনো বড় শহরের পরিকল্পনা করা হয়, তখন টার্ম অব রেফারেন্সে জলবায়ু অভিঘাত মোকাবেলার বিষয়ে গাইডলাইন দেয়া উচিত। কিন্তু অনেক মাস্টারপ্ল্যানেই বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। সংশ্লিষ্টদের না জানার কারণেই এমনটি হয়েছে। নয়তো কক্সবাজার, চট্টগ্রামের মতো সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু গুরুত্ব পাবে না—এটা কীভাবে হতে পারে। কক্সবাজার তো সারা বছরই ঝড়, জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলা করে। তাদের এটা আরো বেশি অ্যাড্রেস করা দরকার ছিল। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’
১৯৯২ সালে আর্থ সামিটের পর জলবায়ু ইস্যু ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। এর পর থেকেই আরবান প্ল্যানিংয়ের মৌলিক অংশ হয়ে ওঠে জলবায়ু পরিবর্তন।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, মাস্টারপ্ল্যানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব না পাওয়া সরকারের নীতিনির্ধারকদের অজ্ঞতা ও দায়িত্বে অবহেলার চিত্রই ফুটিয়ে তোলে।





