নাজমুল আহসান সরকার রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সম্প্রতি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যয়, বিদেশী মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং এ খাতের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম

দেশে চিকিৎসা শিক্ষা প্রদানে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবস্থান কেমন?

আমাদের দেশের বেশির ভাগ মেডিকেল কলেজই পুরনো। সবই ভালো করছে। মন্ত্রণালয় থেকে মেডিকেল শিক্ষায় এরই মধ্যে আলাদা একটি উইং করা হয়েছে। যেখানে সচিব, ডিজি থেকে শুরু করে মেডিকেল এডুকেশন ডিরেক্টর রয়েছেন তারা সার্বক্ষণিক মনিটর করেন। সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করেই আমরা আমাদের মেডিকেল কলেজগুলো পরিচালনা করি। আমাদের ৮০ শতাংশ কলেজই ভালো, বাকি ২০ শতাংশ কলেজ যেগুলো নতুন সেগুলো পিছিয়ে। সেক্ষেত্রে মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি, কীভাবে পিছিয়ে পড়া কলেজগুলো এগিয়ে নেয়া যায়। তারা যেসব বিষয়ে পিছিয়ে রয়েছে সেগুলো এগিয়ে নেয়ার জন্য আলোচনা চলছে। আশা করি আমরা সব কলেজই সমানতালে এগিয়ে যাব। 

সরকারি নীতিমালা বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো আদৌ মানছে? আপনার কলেজের বিষয়ে জানতে চাই...

আমাদের মেডিকেল কলেজ স্থাপন নীতিমালায় বলা রয়েছে, আমাদের কী কী ল্যাব থাকতে হবে, কেমন অবকাঠামো দরকার। মন্ত্রণালয়ের গাইডলাইন অধিকাংশ কলেজই অনুসরণ করছে। আমি বলব, ৯০ শতাংশ কলেজের অবস্থান ভালো। যারা নতুন তারাও সেটআপ করছে। মেডিকেল শিক্ষার একটি সমস্যা হলো প্র্যাকটিকাল শিক্ষা। এজন্য দরকার হাসপাতাল। আমি বলব, হাসপাতাল হলো মেডিকেল কলেজের প্রধান ল্যাব। এখানে রোগীর সঙ্গে সরাসরি শেখার সুযোগ থাকে। এ জায়গায় আমরা পিছিয়ে। এখনকার বেশির ভাগ কলেজই সেটি ওভারকাম করছে। আমাদের মেডিকেল কলেজটি রংপুর সরকারি মেডিকেল কলেজের পাশাপাশি। এখানে এক হাজার বেড থাকলেও সবসময় রোগী থাকে আড়াই থেকে তিন হাজার। ফলে অনেক রোগী আমাদের কলেজে আসেন। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই সহায়ক। তারা সরাসরি শিখতে পারছেন। 

আমার বাবা ১৯৭৫ সালে রংপুর অঞ্চলে প্রথম প্রাইভেট ক্লিনিক করেন। তিনি সরকারি চিকিৎসক ছিলেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে ক্লিনিক করেন। বাবার স্বপ্নই আমরা বাস্তবায়ন করছি। আমরা ধীরে ধীরে হাসপাতাল, ডেন্টাল কলেজ ও মেডিকেল কলেজ করেছি। উত্তরবঙ্গে প্রথম প্রাইভেট ক্লিনিক করেন আমার বাবা। তার পরিচিতির জন্যই সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, কুঁড়িগ্রাম এবং পাশাপাশি জেলাগুলো থেকে আমাদের হাসপাতালে রোগী আসেন। তারা আমাদের সুচিকিৎসার জন্য অনেক দূর থেকে ছুটে আসেন। 

দেশের বেসরকারি মেডিকেলে সার্কভুক্ত দেশসহ নানা দেশ থেকে ডিগ্রি নিতে আসেন। এসব দেশে চিকিৎসা বিষয়ে পড়াশোনার খরচ বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। শুধু কি খরচ বিবেচনায়ই তারা শিক্ষা নিতে আসেন না বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার মানও ভালো?

বিদেশী মেডিকেল শিক্ষার্থী বিশেষ করে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপসহ অনেক দেশের শিক্ষার্থী রয়েছেন। ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীই বেশি। ভারতে মেডিকেল বিষয়ে পড়াশোনা করতে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি টাকা লাগে, নেপালে লাগে ৮০-৯০ লাখ টাকা। আর আমাদের দেশে এসব বিদেশী শিক্ষার্থী ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকায়ই কোর্স শেষ করতে পারেন। আগে ভারতের শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ নেপালে পড়তে যেত আর নেপালের শিক্ষার্থীরা আসত বাংলাদেশে। ভারতের শিক্ষার্থীরা জানত না বাংলাদেশে নেপালের চেয়েও কম টাকায় মেডিকেল ডিগ্রি নেয়া যায়। আমরা ভারতে কয়েকটা সেমিনার করি তখন তারা জানতে পারেন বাংলাদেশে নেপালের চেয়ে কম টাকা লাগে। এর পর থেকে ভারতের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে আসা শুরু করেন। প্রত্যেক দেশেই মেডিকেল কাউন্সিলে পরীক্ষা দিতে হয়। সেখানে বাংলাদেশ থেকে যারা ডিগ্রি নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন তাদের পাসের হার বেশি। আমাদের এখানে পড়াশোনার মান ভালো না হলে তারা নিজ দেশের মেডিকেল কাউন্সিলের পরীক্ষায় ভালো করতে পারতেন না। তাদের ফলই বলে দিচ্ছে আমাদের পড়াশোনার মান কেমন। 

বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার কলেজে শিক্ষা ব্যয়, প্রশাসনিক ও অন্যান্য ব্যয় কেমন?

আমাদের কলেজে একটি প্যাকেজ করে দিয়েছি। বর্তমান সেশনে যারা আছে তাদের ৪২ হাজার ডলার করেছি। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কোর্স ফি এবং আবাসন খরচসহ। এ টাকা তারা পাঁচ বছরে কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারেন। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের কলেজটি রংপুরে হওয়ায় ভারত, নেপাল, ভুটানের আবহাওয়া, কালচারে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা এ দেশে এসে সহজেই মানিয়ে নিতে পারছেন। যে কারণে আমাদের কলেজে এসব দেশের শিক্ষার্থীর হারও বেশি। 

চিকিৎসা শিক্ষার প্রসারে বিশেষ করে বেসরকারি খাতের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আর কী কী অধিকতর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

সরকারি টিমের সঙ্গে আমাদের বেসরকারি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের সম্পৃক্ত করে একটি গাইডলাইন করে কীভাবে বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষাকে উন্নত করা যায় সে ব্যাপারে কাজ করা যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব কলেজ পিছিয়ে রয়েছে সে কারণগুলো চিহ্নিত করে তাদের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। আশা করি শিগগিরই টিম গঠন করে কাজ শুরু হবে। 

অন্যান্য দেশে মেডিকেল কলেজের সঙ্গে দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অবস্থান সম্পর্কে আপনার মতামত বলুন।

যেসব দেশ থেকে শিক্ষার্থী আসেন এর মধ্যে ভারতের মেডিকেল কলেজগুলো শীর্ষে। এরপর আমাদের অবস্থান। এরপর নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান। আমরা যে লেভেলে আছি একেবারে খারাপ না। ভারতের শিক্ষার যে মান আমাদের বেসরকারি মেডিকেলের অবস্থান তার কাছাকাছি বলেই মনে করি। ভারতের থেকে পিছিয়ে আছি বলে মনে করি না। চাহিদার তুলনায় আমাদের দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিমাণ কম। আগে আমাদের দেশে এত কোর্স ছিল না। আশা করছি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা ওভারকাম করতে পারব। গবেষণায়ও আমরা পিছিয়ে। এজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে আমাদের দেশে অনেক আধুনিক চিকিৎসা এখন চালু হয়েছে। আগে আমরা ওপেন হার্ট সার্জারির কথা ভাবতেই পারতাম না কিন্তু বিগত ১০ বছরে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। যেসব বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আগামী ১০ বছরে আমরা এগিয়ে যাব ইনশা আল্লাহ।