কর্নেল (অব.) আলমাস রাইসুল গনি প্রাইম মেডিকেল কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। বেসরকারি মেডিকেল কলেজটি পরিচালনায় কাজ করছেন দীর্ঘদিন। দেশের চিকিৎসা শিক্ষায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অবস্থান, দায়িত্ব ও সাফল্যের বিষয়ে আলমাস রাইসুল গনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

দেশে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ছে। যথাযথ চিকিৎসা শিক্ষা প্রদানে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ভূমিকা কী?

দেশে শিক্ষা ও সেবার খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মেডিকেল কলেজ শিক্ষায় বেসরকারি খাতও এগিয়ে চলেছে। অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ যথাযথ নিয়মে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু কলেজ এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। 

চিকিৎসা শিক্ষার জন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবকাঠামো কতটুকু মানসম্পন্ন? 

একটি মানসম্মত উচ্চশিক্ষার জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণসহ উচ্চমানের ল্যাব আবশ্যক। অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এগুলোর ব্যবস্থা করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমি যদি আমাদের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কথা বলি তাহলে আমাদের যে অবকাঠামো ছিল সেগুলোর কিছু সংস্করণ ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধাসংবলিত কিছু অবকাঠামো করার উদ্যোগ চলমান। এ বিষয়ে কিছু কাজ চলছে। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই আমরা সেই কাজগুলোও শেষ করে একটি পূর্ণাঙ্গ অবস্থানে ফিরে যাব। 

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ মানসম্মত চিকিৎসা দিচ্ছে না—সরকারের পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সীমাবদ্ধতা কোথায়? 

সরকারের কিছু নীতিমালা রয়েছে, আমরা সেগুলোর আলোকেই কাজ করি। অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা থাকতে পারে কিন্তু সবাই চেষ্টা করছে সরকারি যে নীতিমালা রয়েছে সেগুলো অনুসরণ করে যথাযথ পরিবেশ বজায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে।  

শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশাসনিক ও শিক্ষা ব্যয় কেমন? 

একজন শিক্ষার্থীর ছয় বছরে ইন্টার্নশিপসহ যে সময় রয়েছে ভর্তি, টিউশন ফি, থাকা, খাওয়া সবকিছু নিয়ে প্রায় ৪৬-৪৮ হাজার ডলার খরচ হয়।  

ব্যয় কম, না বাংলাদেশে শিক্ষার মানের জন্য তারা আসেন? আপনার কী মনে হয়?

এটি শুধু যে পড়াশোনার ব্যয় কম সেটা নয়। এখানে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বেশি। আরেকটি  বিষয় হলো তাদের কারিকুলাম আর আমাদের কারিকুলাম প্রায় একই। এখানকার এবং যে দেশ থেকে পেয়ে থাকি ভারত ও নেপাল সেখানকার রোগের ধরন আর আমাদের দেশের প্রায় একই রকম। এছাড়া আমাদের শিক্ষার মান ভালো। এখান থেকে পাস করার পর তাদের একটি মেডিকেল পরীক্ষা দিতে হয়। যেটাকে আমরা বলি ফরেন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট এক্সামিনেশন। এবং নিজ দেশে ফিরে মেডিকেল কলেজ লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দিতে হয়। আমাদের দেশ থেকে যারা যাচ্ছে তারা সেখানকার পরীক্ষা ওই দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় ভালো করছে। তার মানে তারা ভালো  শিক্ষা পাচ্ছে এদেশে তাই নিজ দেশে ফিরে গিয়েও তারা ভালো করছে চিকিৎসা ক্ষেত্রে। আরেকটি বিষয়, পাশের দেশ হওয়ায় পরিবেশ ও কালচারের সঙ্গেও তারা সহজে মিলে যায়। 

অবকাঠামো, গবেষণা, নীতিগত ও কৌশলগত ক্ষেত্রে আর কী কী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আমাদের সবকিছু সরকারি নীতিমালার ওপরই চলে। টাইম টু টাইম আমরা তাদের কাছ থেকে নির্দেশনা পাচ্ছি। তার পরও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মান যাতে বজায় থাকে সেজন্য মন্ত্রণালয় থেকেও তাদের প্রচেষ্টা থাকে। অনেক সময় কিছু মেডিকেল কলেজকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে অন্যরাও যেন সে কাজগুলো করে সেটাও পদক্ষেপ নেয়া হয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমি মনে করি ধীরে ধীরে এটি উন্নত হচ্ছে। 

যেসব দেশ থেকে আমাদের এখানে পড়তে আসেন শিক্ষার্থীরা সেসব দেশের মেডিকেল কলেজের সঙ্গে আমাদের দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের তুলনামূলক চিত্রটি কেমন?

মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার পর ফরেন যে পরীক্ষা হয় তার ফল যদি বিবেচনা করি তাহলে দেখা যায় এখানকার পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স ভালো সেক্ষেত্রে আমরা বলতেই পারি এদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর পড়াশোনার মান খারাপ না।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজের চিকিৎসা শিক্ষার প্রসারে সরকার আর কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে?

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আমাদের অর্থায়নে চলে। তাই দেশে-বিদেশে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষায় বেসরকারি শিক্ষকদের সমান সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে। আমাদের হাসপাতালগুলোয় যারা আসে তাদের আমরা ফ্রি বেড ও চিকিৎসা দিই। এখানে যদি সুযোগ থাকে তাদের খাদ্য ও ওষুধ দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উপকরণ ও চিকিৎসা সেবার যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সহায়তা করতে পারে। সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বিভিন্ন রকমের এমওইউ হতে পারে। যেমন আমাদের সঙ্গে রংপুর মেডিকেল কলেজের এমওইউ আছে যার মাধ্যমে আমরা প্যাসেন্ট কেয়ার ও গবেষণায় একে অন্যের সাপোর্ট নিতে পারি। 

এই মেডিকেল কলেজগুলোয় বিদেশী শিক্ষক গবেষণা কার্যক্রমে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কোলাবোরেশন হচ্ছে কিনা?  বাংলাদেশে চিকিৎসা দিচ্ছেন, একই সঙ্গে পড়াচ্ছেন, গবেষণা করছেন, অন্য দেশের সঙ্গে কোলাবোরেশন এ বিষয়টা একটু কম হচ্ছে বাংলাদেশে?

বিদেশী মেডিকেল কলেজগুলোর সঙ্গে চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার বিষয়টি আমাদের কোলাবোরেশন করার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে মেডিকেল কলেজ টু কলেজ বা শিক্ষকদের সঙ্গে গবেষণামূলক কিছু করা যেতে পারে। 

বেসরকারি মেডিকেল কলেজের যাত্রা ১৯৮৫ সালে। এ দীর্ঘ সময়ে আমরা কতটা সফল হয়েছি? নাকি আরো অপেক্ষা করতে হবে?

নিশ্চয়ই আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে যদি সরকারি মেডিকেল কলেজের তুলনা করি শিক্ষার্থীরা যে খুব একটা পিছিয়ে, এ রকম না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা ভালো ফল করছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা এগিয়ে যাচ্ছে।