বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে এখন অবধি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেটসহ ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে ৭০টির বেশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজও। বর্তমানে দেশে মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন পপুলার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর খান আবুল কালাম আজাদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন

বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার যাত্রা কবে থেকে কীভাবে শুরু হয়?

বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এটি উপমহাদেশের ১১তম মেডিকেল কলেজ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট থেকে শুরু হয়ে একে একে স্বাধীনতার সময় পর্যন্ত আটটি মেডিকেল কলেজ আমাদের এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯১ সালে আবার একটি পরিবর্তন হয়। আরো কিছু সরকারি মেডিকেল কলেজ আমাদের এখানে আসে। পরবর্তী সময়ে আরো বাড়ে। পরে আমরা চিন্তা করলাম বাংলাদেশের ডাক্তারও আমাদের দরকার। সে জন্য আমরা চাচ্ছিলাম যে প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপে মেডিকেল কলেজ করতে। সে হিসেবে আমাদের প্রথম বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হয়। একে একে এখন ৭০টিরও বেশি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলো। আমরা তখন দেখতাম রোগী অনুযায়ী আমাদের ডাক্তারের সংখ্যা কম, নার্সের সংখ্যা কম। একে একে নার্সিং কলেজ অনেকগুলো স্থাপিত হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়েছে। আমাদের প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণ উপযুক্ত চিকিৎসক তৈরি করা। যারা বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসা করতে পারবেন এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য হবেন। যেমন আমরা দেখি একজন মার্কিন চিকিৎসক যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কাজ করছেন। আমরা চাই আমাদের চিকিৎসকরাও সেভাবে কাজ করুক। আমাদের দেশ যতই ছোট হোক অবকাঠামো যা-ই হোক, আমরা চাই যোগ্য ডাক্তার তৈরি করতে।

বিদেশী শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে পড়তে আসার নিয়মগুলো কী?

প্রথমত, আমরা চাই বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসা করবে এমন যোগ্য ডাক্তার তৈরি করতে। এরপর আমাদের ডাক্তাররা যখন বিশ্বব্যাপী কাজ করতে গেলেন বা উচ্চশিক্ষার জন্য গেলেন তখন দেখা গেল তাদের ধীশক্তি বা চারিত্রিক গুণ বা কর্মশক্তি (ক্যালিবার) অনেক ভালো। এটা একটা প্রথম সূত্রপাত, আমাদের ডাক্তাররা অত্যন্ত যোগ্যতার ও সুনামের সঙ্গে সারা পৃথিবীর ডাক্তারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন। তারা চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সুনাম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সে কারণে বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা সারা পৃথিবীতে একটা ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারল। বিশেষ করে আমাদের আশপাশের দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা আসছে। যেমন ভারতে অনেক সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। তার পরও সেখান থেকে এখানে মেডিকেল শিক্ষার জন্য বহু শিক্ষার্থী প্রতি বছর আসছে।

ভারতের যারা আমাদের এখানে পড়তে আসতে চায় তারা কিন্তু ভারতেই একটা পরীক্ষায় পাস করে আমাদের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আসতে হয়। কেউ চাইলেই এখানে এসে মেডিকেলে ভর্তি হতে পারছে না। দুই ক্যাটাগরিতে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভুটান, মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের স্কলারশিপের ব্যবস্থা রয়েছে। তারা এখানে এসে বাংলাদেশের ছাত্রদের সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারছে। ভারতের জন্য প্রতি বছর আমরা ২২ থেকে ২৩টি স্কলারশিপ দেই, পাকিস্তানের জন্য ২১ বা ২০টি দেই, শ্রীলংকার জন্য ১৩টি দেই, নেপালের জন্য ১৪-১৫টি দেই। আবেদন তো অনেকেই করে, তাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এখানে পড়ার সুযোগ পেতে হয়। যেমন ভারতের ২২টি সিটের জন্য ২০০ থেকে ৩০০ আবেদন পড়ছে। সেটি আমাদের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটা পরীক্ষার মাধ্যমে ঠিক করে দেয়া হয়। এছাড়া অনেকে দেখা গেছে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কিন্তু অস্ট্রেলিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের নাগরিক অথবা সেখানেই এখন বসবাস করছেন। এমন অনেকেরই সন্তানরা আমাদের এখানে পড়াশোনা করছে।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নিয়মগুলো কী?

বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে সরকার থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হলো বাংলাদেশী শিক্ষার্থী নিতে হবে ৫৫ শতাংশ এবং ৪৫ শতাংশ বিদেশী। অর্থাৎ এ অনুপাতে বাংলাদেশী ও বিদেশী। এখন সরকারি মেডিকেল কলেজে নামমাত্র টাকায় পড়াশোনা হয়। আর বেসরকারিতে সরকার নির্ধারণ করে দিচ্ছে কত টাকা নেয়া যাবে। এই যে একটা দিগন্তের উন্মোচন হলো, এটাতে বোঝা গেল আমাদের মেডিকেল শিক্ষার মান কতটুকু। পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশ থেকে আমাদের এখানে শিক্ষার্থী আসছে পড়তে। নেপালে যখন মেডিকেল শিক্ষা বা চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না, তখন আমাদের এখান থেকে ডাক্তার নিয়ে যাওয়া হলো। ভুটানের সব ডাক্তার আমাদের এখান থেকে গেছে। শ্রীলংকার ডাক্তারদের আমরা পড়াচ্ছি। আমাদের ডাক্তাররা মানের দিক থেকে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় খুবই দক্ষ।

মেডিকেল কলেজে দেশী বা বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়াটা কেমন?

ভর্তির প্রক্রিয়া সরকারি বলেন আর বেসরকারি বলেন, সবাই একই কাতারে। একই পরীক্ষায় আগে পাস করতে হয়। সেখান থেকে তারপর বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে চলে যাচ্ছে। সেখানে নানা অপশনের ভিত্তিতে ভর্তি হচ্ছে। আমি ইচ্ছে করলেই বলতে পারি না আপনার ছেলেকে অমুক মেডিকেল কলেজে ভর্তি করে দিন। এটা সম্ভব না। বিদেশী শিক্ষার্থী যারা আমাদের এখানে পড়তে আসবে, আমাদের জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাদের অংশ নিতে হচ্ছে। কিন্তু তাদের একটা মার্কিং লেভেল তাদের দেশের কনস্যুলারের মাধ্যমে করা হয়। সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আসতে হয়। অর্থাৎ ভর্তি প্রক্রিয়াটা এত স্বচ্ছ ও সবার জন্য সুষম যেটা সবার আগ্রহের কারণ। আমাদের এখানে কোনোরকম কারো হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।

মেডিকেল শিক্ষার মাধ্যমে আমরা দেশের পতাকা বিদেশে ওড়াতে পেরেছি। বিদেশী যেসব শিক্ষার্থী এখানে পড়তে আসে তারা যে টাকাটা দিচ্ছে সেই টাকার ৬০ শতাংশ (সার্কভুক্ত নয়) সরকারের ফান্ডে যায় এবং ৪০ শতাংশ বেসরকারি মেডিকেল পায়। আবার বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোকেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারকে দিতে হয়, বিএমডিসিকে দিতে হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এ অর্থের একটি অংশ চমৎকারভাবে জমা হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে হয়তো অনেক বড় বাজেটের কিছু নয়, তবে একটা অংক তো দেশ পাচ্ছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে, এটার সঙ্গে থাকতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএমডিসির অনুমতি। অর্থাৎ তিনটি প্রতিষ্ঠান সরকারি ও বেসরকারি সব মেডিকেল কলেজকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এখানে কোনো রকম এদিক-সেদিক হওয়ার সুযোগ নেই। লাইসেন্স নবায়ন করার জন্যও প্রতি বছর এসব প্রতিষ্ঠান মেডিকেল কলেজগুলোতে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। প্রত্যেকটা মেডিকেল কলেজ সচেতন না হয়ে উপায় নেই। অতীতেও দুই-একটি মেডিকেল কলেজ যথেষ্ট চেষ্টা করেও মানদণ্ড অর্জন করতে পারেনি। এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এবারো একটি মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দিয়েছে। তার মানে হলো এ শিক্ষা ব্যবস্থার পুরোটাই নজরদারিতে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমার এখানে ডাক্তার নেই। আমার ডাক্তার তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে বিদেশে পাঠিয়ে ডাক্তার তৈরি করতে গেলে আমার অনেক টাকা লাগবে। এত টাকা তো আমার কাছে নেই। ফলে এখানেই ডাক্তার তৈরিতে যা যা করা লাগবে তাই করতে হবে। আমি আমার ছেলেকে আমার দেশে পড়াব। এখানেই যোগ্য মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করব।’ তিনি (প্রধানমন্ত্রী) প্রত্যেকটি জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপন করতে বলেছেন। রাঙ্গামাটির মতো জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ হয়ে গেছে। অনেক স্থাপনা নেই কিন্তু ক্রমেই হচ্ছে। একটি স্থাপনা থাকলে সেখানে ধীরে ধীরে উন্নতি করা যাবে। জমি থাকলে সেখানে চাষাবাদ করা যাবে।

দেশে মেডিকেল শিক্ষায় গবেষণা কতদূর এগিয়েছে? এ বিষয়ে বাংলাদেশ কীভাবে উন্নতি করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

এখন আমাদের উচিত কারিকুলামে মনোযোগী হয়ে সেটিকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে একজন শিক্ষার্থী শুধু চিকিৎসক হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। সেবাদানে, জ্ঞানার্জনে ও গবেষণায় দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ১ শতাংশ ডাক্তারকে তারা রাখে গবেষণার জন্য। সবাই গবেষণা করবে না, আবার সবাই করতে পারবেও না। ফলে আমাদেরও এখানে আরো মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে বিদেশী শিক্ষার্থী আরো বেশি আকৃষ্ট করতে কী করণীয়?

দূতাবাসগুলো বাংলাদেশের চমৎকার মেডিকেল শিক্ষা নিয়ে নানা প্রচারণামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। মানুষ যেন আগ্রহী হয় এবং দ্রুত ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা দরকার। বিদেশী যেসব অভিভাবক বাংলাদেশকে তার সন্তানের মেডিকেল শিক্ষার জন্য পছন্দ করেন, তাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা, তাদের মাঝে আগ্রহ তৈরি করা প্রায়োজন। একটা উদাহরণ দেই, নেপালের একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট তার নাতির জন্য পপুলার মেডিকেলকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু বিদেশী কোটায় আমাদের খালি না থাকায় প্রেসিডেন্টের নাতিকে ভর্তি নিতে পারিনি। এখানে এত বেশি চাহিদা থাকে যে যথাসময়ে দেশী-বিদেশী সব কোটা পূরণ হয়ে যায়।

মেডিকেল কলেজগুলোতে আসন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সক্ষমতার একটি বিষয় রয়েছে। সে অনুযায়ী আমাদের দেশের মেডিকেল কলেজগুলো কতটা প্রস্তুত?

এটা তো চাহিদা অনুযায়ী জোগান দিতে হবে। আমাদের এখানে অনেকে আবেদন করে কিন্তু আসন কম থাকায় আমরা নিতে পারি না। অতএব, আমাদের একটা ধারণা হয়েছে কত শিক্ষার্থী আমাদের এখানে ভর্তি হতে চায় এবং তাদের কতজনকে নিতে গেলে কী পরিমাণ অবকাঠামোগত ও অন্যান্য দিকে উন্নতি করতে হবে। ফলে মেডিকেল কলেজগুলোতে যদি আসন বাড়াতে হয় তাহলে সে অনুযায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষক বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের আসন কম থাকায় যারা ভর্তি হতে পারছে না তারাও কিন্তু বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে এসেছে। তার পরও তাদের আমরা নিতে পারি না। কারণ সরকার থেকে নির্ধারণ করে দেয়া আছে আপনি এতজন শিক্ষার্থী নিতে হলে আপনার এতটি ক্লাসরুম থাকতে হবে, এতজন শিক্ষক থাকতে হবে। অবকাঠামোগত এ মান থাকতে হবে—এমন সব বিষয় ঠিক করে দেয়া আছে। ফলে এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সংশয়ের কিছু নেই। অনেক মেডিকেল কলেজ ৫০টি আসন দিয়ে শুরু করেছে। এখন তারা এক থেকে দেড়শ আসনে উন্নীত হয়েছে। এখন একটা চাহিদা থাকবে। সে হিসেবে আমরাও চাই এগিয়ে যাক। তবে ডাক্তার অবশ্যই একটা বিশেষ কিছু। কারণ তার কোনো ভুল হওয়া যাবে না। ছোট একটি ভুল হওয়া মানেই অনেক বড় ক্ষতি। ফলে তাকে তৈরি করার সময় সব দিক শতভাগ একাডেমিকেও নিশ্চিত করতে হয়। তাই যেনতেন প্রকারে আসন বাড়িয়ে দিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারব না।