সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একটা চুক্তি আছে। যার বদৌলতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা বিদেশে যেতে পারে ও বিদেশী শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে পারে। ভারত ও নেপাল থেকে এখানে শিক্ষার্থীরা আসে। দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতেও কিছু বিদেশী শিক্ষার্থী পড়তে আসে, তবে সেটা স্কলারশিপে। আর বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশী শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে ডলার দিয়ে। বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে শুধু মেডিকেল শিক্ষাতেই এ ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশী টাকায় প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিদেশী মুদ্রা আমাদের কাছে আসে। আগে যখন মোট ৫০ শতাংশ বিদেশী শিক্ষার্থী আসতে পারত তখন একটু বেশি আসত। কিছুদিন আগে সেটা ৪৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন আবার কিছু শিক্ষার্থী বেড়েছে, মেডিকেল কলেজ বেড়েছে, তাই পার্সেন্টেজ কমলেও পরিমাণে বেড়েছে। 

এ দেশে বিদেশী শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নে আগ্রহের পেছনে বেশকিছু কারণ আছে। প্রথম কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজের সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই শিক্ষার মান অনেক ভালো। এ ভালোটা হয় দুটি কারণের ওপর ভিত্তি করে। একটি যদি ফ্যাকাল্টি ভালো হয় আর দুই যদি অনেক বেশি পেশেন্ট পাওয়া যায়। যে হাসপাতালে যত বেশি রোগী, সেখানে একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বেশি থাকে। খেয়াল করে দেখেছি, যারা এখান থেকে পাস করে যায়, তাদের দেশে গিয়ে লাইসেন্স এক্সাম দিতে হয়। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, যা প্রমাণ করে যে, দেশের বেসরকারি কলেজে চিকিৎসা শিক্ষার মান অনেক ভালো। আরেকটা বিষয় হলো বাংলাদেশের মানুষ খুবই আন্তরিক। বিদেশী শিক্ষার্থীরা যখন এখানে পড়তে আসে তখন আন্তরিকতার সঙ্গে নিজেদের ছেলে-মেয়ের মতো করে ওদেরকে পড়ানো হয়। আমরা শুধু ওদের শিক্ষা দিই তা না, বাকি দেখাশোনাও করে থাকি। তাদের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক ও খাদ্যাভ্যাসেরও মিল আছে। তাছাড়া দূরত্বও একটি বিষয়। এসব কারণেই তারা আমাদের কাছে বেশি পড়তে আসে। এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখি, নেপাল বা ভারতে মেডিকেল শিক্ষা নিতে গেলে বাংলাদেশী টাকায় ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা খরচ করতে হয়, যা বাংলাদেশে ৫০ লাখ টাকার ওপর না। এটাও অনেক বড় ফ্যাক্টর। 

বাইরের দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা স্কলারশিপ বা নিজের খরচে পড়তে এলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। তাছাড়া রেমিট্যান্স হিসেবে যে ২ হাজার কোটি টাকা আসে সেটাও আমাদের দেশের জন্য বড় বিষয়। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন অনেক ভালো। বিডার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যায়। কভিডের দুই বছরে রোগী যেতে না পারায় ৫ বিলিয়ন ডলার আমরা সাশ্রয় করেছি। চিকিৎসা নেয়ার জন্য প্রতি বছর যে পরিমাণ ডলার চলে যাচ্ছে এখন সেটা রোধ করার সময় এসেছে। এখানে সরকার, আমরা যারা স্বাস্থ্য সেবায় আছি এবং পুরো বাংলাদেশের মানুষ মিলে ত্রিপক্ষীয় কাজ করার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে আস্থা একটা বিষয়, সেটাও ডেভেলপ করতে হবে। 

আমাদের এখানে আমরা বিদেশী ও দেশী শিক্ষার্থীদের খুব ভালো বন্ধুত্ব দেখতে পাচ্ছি। পৃথিবীর যেকোনো দেশে গেলেই ইংরেজি একটি মাধ্যম। যে ভাষা শুধু জানলে চলবে না, বলতেও হবে। এ যুগের সব ছেলে-মেয়ে ইংরেজি খুব ভালো বলতে পারে। ফলে দুই দেশের শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। আর যে মেলবন্ধন তৈরি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাতে দুই দেশের সম্পর্ক আরো উন্নত হচ্ছে। 

তবে বিদেশী শিক্ষার্থীদের আরো আগ্রহী করতে আরো কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে। যেমন, কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করতে হবে। আসন সংখ্যা বাড়াতে হবে। ফ্যাকাল্টির সমস্যা এখনো আছে। তা দূর করতে হবে। এরই মধ্যে আমরা সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি বিদেশী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৪৫ থেকে আগের মতো ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার। তাহলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে। তাতে করে কারেন্সির ফ্লোও বাড়বে। দেশের মেডিকেল কলেজে শিক্ষার গুণগত মানে আরো মনোযোগ দিতে হবে। একসময় ছেলে-মেয়েরা বেসিক সায়েন্সে পড়াশোনা করতে চাইত না। এখন করছে, কারণ তাদের অ্যাবসর্ব হওয়ার স্কোপ বেড়েছে। সরকারি মেডিকেল, বেসরকারি মেডিকেল বেড়েছে। বিশেষ করে মেয়েরা বেশি পড়তে চায়। আগে অনেক বেশি পোস্ট ছিল না, এখন হয়েছে। কিন্তু এখনো সেভাবে হায়ার এডুকেশন হয় না। আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম, বেসিক সায়েন্সের শিক্ষকদের বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ করা হোক। আর বেসিক সায়েন্সে এমডির কোটা একটু বাড়ানো হোক। শ্রীলংকা থেকে আগে শিক্ষার্থীরা আসত, এখন বন্ধ, সেখানে শিক্ষার্থী লেনদেন শুরু করতে হবে। মালয়েশিয়া চীনের সঙ্গেও আমাদের শিক্ষার্থী বিনিময় বাড়াতে হবে। নলেজ শেয়ারিংয়ের উদ্যোগ নিতে হবে।

এভাবে দেশে যদি বিদেশী শিক্ষার্থীরা আসে তাতে দেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়। তাছাড়া এর অর্থনৈতিক ভূমিকাও রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত সহযোগিতা আমাদের দরকার। দেশের বাইরে আমরা সরকারের সঙ্গে যদি কিছু এডুকেশন ফেয়ার করতে পারি, তাহলে ওরা আমাদের মেডিকেল কলেজগুলো চিনবে, নার্সিং কলেজগুলো চিনবে। নার্সিং কলেজে আগে শুধু ডিপ্লোমা করা যেত, এখন মাস্টার্স করাচ্ছি। সেটা আমাদের বাইরের দেশকে জানাতে হবে। নার্সিংয়েও আমরা ভালো জায়গায় যেতে পারি। অদক্ষ মানবসম্পদ পাঠিয়ে আমরা ১৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করি, দক্ষ নার্স ও কেয়ারগিভার পাঠালে এ ১৫ বিলিয়ন ৪৫ বিলিয়নে পরিণত হবে। আমার ধারণা, আগামী দুই বছরে সে বিষয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।

মনোযোগ দিতে হবে গবেষণায়। রিসার্চ বিষয়টাই অনেক ব্যাপ্তি ও পরিধির। বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার অনেক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের ডাক্তাররা স্যালাইন তৈরি করেছেন, কালাজ্বর নির্মূল করেছিলেন। মেডিকেল চিকিৎসা শিক্ষায় শিক্ষকরা গবেষণা করেন। কিন্তু বেশি এগোতে পারেন না, কারণ খরচ তাদের করতে হয়। সরকার যদি বেসরকারি খাতের চিকিৎসা শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করে ম্যান্ডেটরি করে দেয় এবং তাদের ফান্ডিংয়ের সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও সম্পৃক্ত করে নেয়, তাহলে গবেষণার সম্ভাবনা বাড়বে এবং তা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নে সাহায্য করবে।