ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দেশের মেডিকেল শিক্ষায় বিদেশী শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কারণ, এর প্রভাব ও দেশের ভাবমূর্তি আরো উন্নত করার ক্ষেত্রে করণীয় বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শর্মিলা সিনড্রেলা

বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোয় বিদেশী শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নে আগ্রহের পেছনে বিশেষ কী কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন?

দীর্ঘদিন বিদেশী ছাত্রদের আনাগোনায় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজগুলো মুখরিত। অগ্রজদের দেখেও অনুজরা এখানে আসে। এখানকার মেডিকেল শিক্ষা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং ব্রিটিশ রিকগনাইজড। সেসব কারণেই বিদেশী শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে বাংলাদেশ। এর আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, আমাদের আবহাওয়া ও বন্ধুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি। সার্কভুক্ত দেশগুলো বিশেষ করে ভারত ও নেপাল থেকে বেশি শিক্ষার্থী আসছেন। শ্রীলংকা থেকে একসময় বেশি আসত, এখন একটু কম আসে। সেক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বলয়টা প্রায় একই রকম হয়, এছাড়া আবহাওয়াও কাছাকাছি। সব মিলিয়ে খাদ্যাভ্যাস, কৃষ্টি, রিলেশনশিপ তাদের জন্য খুবই স্বচ্ছন্দময়। দ্বিতীয় কারণ হলো অর্থনৈতিক সাশ্রয়। দেশের অনেকেই বলেন, এখানে মেডিকেল শিক্ষা অনেক ব্যয়বহুল, খরচ অনেক বেশি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে স্বল্পমূল্যে মেডিকেল শিক্ষা গ্রহণ করা বাংলাদেশেই সম্ভব। কারণ ভারতে এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করতে ইন্টার্নশিপসহ প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হয়। নেপালে ব্যয় হয় প্রায় ৭৫-৮০ লাখ টাকা। সেখানে বাংলাদেশে সব মিলিয়ে ৩৫-৪০ লাখের মধ্যে একজন বিদেশী শিক্ষার্থী নিয়মিতভাবে পাঁচ বছর থাকা-খাওয়াসহ সম্পন্ন করে দেশে ফিরতে পারেন। দেশে ফিরেই কিন্তু তারা আবার বড় বড় হাসপাতালে চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। পোস্টগ্র্যাজুয়েশনের সুযোগ পাচ্ছে। শুধু তাদের দেশে না বিদেশেও, অনেক ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিতে তারা চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মানের জন্য এ দেশে মেডিকেল শিক্ষায় বিদেশীদের এত আগ্রহ। 

দেশে ভর্তি ব্যবস্থাপনায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশী শিক্ষার্থী যারা আসছেন তাদের ভর্তিতে কোনো জটিলতা বা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন?

বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি ব্যবস্থাপনায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। দেশীয়দের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে সেটি অটোমেশন সিস্টেম। আমরা অটোমেশনকে স্বাগত জানাই কিন্তু একটি কাজ এমনভাবে করতে হবে যেন দ্বিপক্ষীয় উপকার হয়। আমি শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের কথাই ভাবলাম, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বা স্টেকহোল্ডারদের কথা ভাবলাম না, এমন নীতিমালা কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। অটোমেশন প্রক্রিয়াটি আমাদের কাছে জটিল মনে হচ্ছে। গতবার পর্যন্ত যেভাবে ছিল যে রিটেনে পাস করবে নির্দিষ্ট মার্কস পেয়ে, যোগ্যতা অনুযায়ী আমরা তাদের ভর্তি করব। কিন্তু আনফরচুনেটলি এবার নতুন একটি প্রক্রিয়া করার কারণে অনেক মেডিকেল কলেজে অনেকদিন পার হয়ে যাওয়ার পরও পরিমাণমতো শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না। অনেক মেডিকেল কলেজে সিট খালি রয়েছে। এতে যারা হেলথ সেক্টরে বিনিয়োগ করছে বা আমরা যারা বিনিয়োগ করেছি, এতে করে তারা উৎসাহ হারাচ্ছে। সুতরাং এ জিনিসটিকে নিয়ে টার্বুলেন্স করার বা গবেষণা করার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটিকে পেট্রোনাইজ করা উচিত। প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথরিটির প্রাইভেট মেডিকেল কলেজকে সাবসিডাইজ করা উচিত। প্রায়ই বলা হয় বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের খরচ বেশি, সেটা তারা মিনিমাইজ করুক। পিপিপি পুরোটা নিয়ে নিক, তারা আমাদের নজরদারি করুক, একটা ফান্ডিং করে বলে দিক, এটা আপনাদের দিলাম, শর্ত একটাই নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তরা যেন সরকারি হাসপাতালের মতোই সেবা পান। ব্যাংকও কিন্তু সেভাবে আমাদের সুবিধা দিচ্ছে না। আর দশটা সাধারণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে তারা যেভাবে আচরণ করছে আমাদের সঙ্গেও একই আচরণ করছে। আমি নামে সেবা খাত কিন্তু সেবা খাতের কোনো সুবিধা পাচ্ছি না। সুস্থ জাতি গঠনে হেলথ সেক্টরের বিকল্প নেই। এটি সরকারের ব্রেইন চাইল্ড হওয়া উচিত। লন্ডনে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে ৪০ হাজার টাকা ভিজিট দিতে হয়, আমাদের এখানে ৭০০ বা ১০০০ টাকা। তাতেও অনেক কথা শোনানো হয়। এর কারণ স্বাস্থ্য বীমা। তাদের বীমা আছে আমাদের নেই। বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমা চালু করলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। শিক্ষার্থীদেরও স্বাস্থ্য শিক্ষা বীমায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তাহলে তাদের পড়াশোনায় যে খরচটা হবে, পড়াশোনা শেষে ডাক্তারি করে তারা টাকা ফেরত দেবে। তাহলে কিন্তু কারো চাপ পড়বে না, দরিদ্র হয়ে যেতে হবে না। 

বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসছেন। সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য কি আলাদা কোনো ব্যবস্থা আছে?

আলাদা কিছু নেই। বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার যে নীতিমালা করেছে, সেটাই, সেখানে নির্দিষ্ট অংকের ফি আছে। সেখানে বরং তাদের জন্য একটা বেনিফিট আছে। তাদের বাসস্থান, নিরাপত্তার ব্যবস্থা আমরা করছি। তবে তাদের কমফোর্ট আরো বাড়ানোর চিন্তা করতে হবে। এটি দুই দেশের আন্তঃদেশীয় সিদ্ধান্তের বিষয়, সার্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে যদি বিদেশী শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয় তাহলে সেসব আমরা সাদরে গ্রহণ করতে রাজি আছি। এতে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। 

বিদেশী যে শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশে পড়াশোনা করতে আসছেন সেটা কি দেশের রিজার্ভের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব রাখছে?

যখন একটা আয় হয় তখন তার রেমিট্যান্স প্রভাব তো দেশে পড়বেই। যে বিদেশী ছাত্রটি আমাদের দেশে পড়তে আসছে তা যদি না আসত তাহলে যে ডলার আসছে সেটা আমাদের দেশে আসত না। সুতরাং সামগ্রিকভাবে একটা সামষ্টিক প্রভাব আছেই। 

বিদেশী ও দেশী শিক্ষার্থীর মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় বা লেনদেন আরো জোরদার করার বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই। 

ভারত ও নেপাল থেকে যারা আসছে তাদের ও আমাদের সংস্কৃতি প্রায় একই রকম। মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকায় নানা নেতিবাচক খবর পেলেও আমাদের এখানে তেমন কিছু নেই। এর কারণ আমাদের নজরদারি। স্থানীয় ও বিদেশী শিক্ষার্থীদের সখ্যতা বেশ বেশি। দেশী-বিদেশী ছাত্ররা বা ছাত্রীরা রুমমেট হিসেবে থাকছে। সেখানে বোঝা যায় তাদের সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমরাও প্রায় তাদের প্রশ্ন করি, কেমন লাগছে? তারাও বলে, আমরা এখানে খুব কমফোর্টেবল। এখানে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াও তারা পছন্দ করে। তারা এও বলেছে, এখানে খুব স্বল্প টাকায় জীবন ধারণ করা সম্ভব। যা আর কোথাও সম্ভব না। এসবই তাদের ভালো লাগার জায়গা। তাই মনে হয় বাংলাদেশ মেডিকেল শিক্ষা বিদেশীদের জন্য একটি আশীর্বাদ। 

দেশে আরো বেশি বিদেশী শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করতে ও বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

কিছুদিন আগে দেশী-বিদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-৫০ ছিল। এখন সেটা ৪৫ করা হয়েছে। বিদেশী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আবার ৫০ শতাংশে ফিরিয়ে নেয়া যেতে পারে। মেডিকেল শিক্ষায় আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। আসনসংখ্যা বৃদ্ধি না করলে বিদেশী ছাত্র আসবে কোথায়? আমার আসন ৬০টি, সেখানে বিদেশী নিতে পারি ২৭ জন। আসন যদি ১০০ হতো তাহলে নিতে পারতাম ৪৫ জন। তাতে রেমিট্যান্স বাড়ত। বিদেশী শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিডার অনুমতি নিয়ে এ দেশে সেবা দিচ্ছেন। তারা মানবিকভাবেও বেশ ভালো। ভারতীয় ডাক্তারদের গুণাবলি তাদের মধ্যে দেখি। তাদের যদি কমফোর্টেবিলিটি, চাকরির নিশ্চয়তা, এখানে থাকার বিষয়ে রেস্ট্রিকশন কম দেয়া হয় তাহলে তাদের আরো আগ্রহ বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস। বিদেশী শিক্ষার্থীদের কাছেও প্রণোদনা হিসেবে স্বাস্থ্য শিক্ষা বীমা দেয়া গেলেও আগ্রহ বাড়বে। কারণ বিদেশ থেকে যারাই এসেছেন তারা সবাই যে খুব সচ্ছল তা নয়, অনেকে দেখি অনেক কষ্ট করে আসেন।