অনেক দেশের তুলনায় চিকিৎসাবিদ্যা ভালো হওয়ায় বিদেশী শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোকে বেছে নিচ্ছেন। দেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিতে কী কী করণীয় সেসব বিষয়ে কথা বলেছেন প্রাইম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. নুর ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এসএম পিয়াল

দেশে চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস ৮০ বছরের। এ সময়ে বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার উৎকর্ষ কতটুকু অর্জিত হয়েছে?

ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া এ অঞ্চলের চিকিৎসা শিক্ষার যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেছে। স্বাধীনতাপূর্ব মাত্র ৮-৯টি মেডিকেল কলেজ থাকলেও বর্তমানে শতাধিক মেডিকেল কলেজ গড়ে উঠেছে। স্নাতকোত্তর শিক্ষার পরিধি ও সুযোগের বিকাশ ঘটেছে। সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হয়েছে এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে অত্যাধুনিক বিশেষায়িত রোগ নিরাময়ের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ যথেষ্ট পরিমাণ চিকিৎসক তৈরিতে সক্ষম হয়েছে; যারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। মানসম্মত মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় বিদেশী শিক্ষার্থীরা এদেশে মেডিকেল শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে। রোগ নির্ণয় ও রোগ প্রতিরোধের লক্ষ্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে তাল রেখে অত্যাধুনিক যন্ত্র সামগ্রির সমন্বয় ঘটিয়ে জটিল রোগ চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। হেলথ ইনভিসেস, যথা-এমএমআর, আইএমআর এবং অন্যান্য সূচকে আমাদের দেশের অবস্থান পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ থেকে উন্নত।

দেশে অনেক বিদেশী শিক্ষার্থী আসছেন, চিকিৎসা শিক্ষা নিচ্ছেন। যা অন্য ধারার শিক্ষায় তেমন একটা দেখা যায় না। এর কারণ কী?

সব শিক্ষার মধ্যে চিকিৎসা শিক্ষার জন্যই এদেশে বিদেশীরা আসছে, কারণ এখান থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা তাদের দেশের লাইসেন্স পরীক্ষায় সহজেই পাস করতে পারছে। এক্ষেত্রে বিদেশে লাইসেন্সিং পরীক্ষায় মোট পাসের হার ৪০ শতাংশের নীচে হলেও প্রাইম মেডিকেল কলেজের পাসের হার ৬০-৬৫ শতাংশ। বিশ্বের অনেক দেশে চিকিৎসা শিক্ষায় সরাসরি রুগীর সংস্পর্শে আসার ব্যবস্থা নাই। কিন্তু আমাদের দেশে ছাত্ররা সরাসরি রুগীর সংস্পর্শে এসে পর্যবেক্ষণ ও অনুধাবন করতে পারে। বিদেশের মেডিকেল কারিকুলাম আমাদের মেডিকেল কারিকুলামের বহুলাংশে সমপর্যায়ভূক্ত হওয়ায় বিদেশী শিক্ষার্থীদের মাঝে আগ্রহের সৃষ্টি করছে। তাছাড়া আমাদের দেশে মেডিকেল শিক্ষার ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। ভর্তি প্রক্রিয়া সহজ। বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের থাকা ও খাওয়ার যথেষ্ট সুবিধা রয়েছে।

প্রাইম মেডিকেল কলেজে কোন শিক্ষাবর্ষ থেকে বিদেশী শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পান? বর্তমানে তাদের সংখ্যা কত?

প্রাইম মেডিকেল কলেজে ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। শুরু থেকে অদ্যাবধি ৫২২ জন বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। তার মধ্যে ২২১ শিক্ষার্থী এমবিবিএস পাস করে ডাক্তার হয়েছেন বা ইন্টার্ন প্রশিক্ষণরত। বর্তমানে ৩০১ জন বিদেশী শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। 

সার্কভুক্ত দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসছেন। তাদের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা কি রয়েছে?

বর্তমানে প্রাইম মেডিকেল কলেজে ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থী বেশি ভর্তি হয়েছে। 

ডিগ্রি অর্জন শেষে এখানেই পেশাজীবন শুরুর বিষয়ে তাদের মধ্যে আগ্রহ কেমন? 

বিদ্যমান মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা সার্কভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধাজনক। ওই সব দেশের তুলনায় চিকিৎসা শিক্ষার ব্যয় অনেক কম। এদেশে পড়তে আসা মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ।

দেশী ও বিদেশী শিক্ষার্থীরা একত্রে মিলেমিশে একই ক্লাসে বসে পড়াশোনা করছেন। দেশীয়, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা থাকার পরও তাদের মধ্যে সমন্বয়, সাংস্কৃতিক বিনিময় কেমন?

ওই সব দেশে চিকিৎসক চাহিদা বেশি থাকায় বিদেশী শিক্ষার্থীরা নিজ দেশেই পেশা জীবন শুরু করে এবং অনেকে বিদেশে যেতে আগ্রহী। তাছাড়া বাংলাদেশে এ ব্যাপারে কোনো নীতিমালা এখনো নেই এবং ওই সব দেশের তুলনায় আমাদের দেশে এ পেশায় সুযোগ-সুবিধা অনেক কম।

নেপাল ও ভারতের শিক্ষার্থীরাই এখানে বেশি পড়তে আসছেন। এছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে আরো শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করতে এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার প্রসার ঘটাতে আর কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

আমাদের প্রতিষ্ঠানে দেশী এবং বিদেশী শিক্ষার্থীদের কোয়ালেবরেশন অত্যন্ত চমৎকার। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা মুখ্য। আমরা দেশী-বিদেশী শিক্ষার্থীদের কোয়ালেবরেশন বাড়াতে অনেক বিষয়ে কাজ করছি। যেমন- দেশী-বিদেশী শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে ক্লাসের ব্যাচ নির্ধারণ করা হচ্ছে। ক্লাস প্রতিনিধি নির্বাচন ও শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত সভা হচ্ছে। সবার সমন্বয়ে ডাইনিং কমিটি গঠন করা হয়। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন ও উৎসব পালনেরও সুযোগ দেয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এখানকার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সার্বক্ষণ তাদের বিভিন্ন সহযোগিতায় পাশে থাকছে। 

দেখা যাচ্ছে, নেপাল ও ভারতের শিক্ষার্থীরাই এখানে বেশি পড়তে আসছেন। এছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে আরো শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করতে এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার প্রসার ঘটাতে আর কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

বিদেশী শিক্ষার্থীদের আরো আগ্রহী করে তুলতে এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার প্রসার ঘটাতে সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ আছে। যেমন- বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রচার বৃদ্ধি করা, বিদেশে মেডিকেল শিক্ষা মেলার আয়োজন বা অংশগ্রহণ করা, বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়া ও সময় সহজীকরণ, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, শিক্ষার মান বাড়াতে সব কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। এছাড়া বিদেশী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষক বিনিময়ের ব্যবস্থা করা, তাদের সঙ্গে দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমঝোতা স্মারকও করা যেতে পারে। পাশাপাশি পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে বিদেশের সঙ্গে পরীক্ষক বিনিময়ের ব্যবস্থা করা, বিদেশী শিক্ষার্থীদের সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে আসার জন্য তাদের বাংলা ভাষা চর্চার ব্যবস্থা করা। বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য আরো কার্যকর পদক্ষেপও নেয়া যেতে পারে।