বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর চব্বিশের অভ্যুত্থানকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বৃহৎ অভ্যুত্থান বলা হয়। এ অভ্যুত্থান থেকে বাংলাদেশ কী পেল?

চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে বলে সমগ্র দেশের মানুষ ভেবেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বৈপ্লবিক পরিবর্তনটা আমরা দেখতে পাইনি। এই না দেখতে পারার পেছনে মূল কারণ আমার মনে হয়, যারা এ পরিবর্তনটা আনবেন, তাদের মনমানসিকতার খুব একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়নি। চেতনা সেই একই জায়গায় আছে, শুধু অবস্থানটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো রাষ্ট্রকাঠামোর কিছু বিষয়ে সংস্কারের কাজ হচ্ছে। এ কাজগুলো ভালো।

এর পাশাপাশি অর্থনীতিতে কিছু কাজ হয়েছে। যদিও সেগুলোকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলা যাবে না। এত বড় বিপর্যয়ের পরে অর্থনীতির পুনর্গঠন খুব একটা সহজও না। এছাড়া আমরা মানুষগুলোও বদলাইনি। বিভিন্ন পেশা, শ্রেণী ও রাজনৈতিক দলের লোকেরা যদি নিজেদের পরিবর্তন করতে পারতাম, তাহলে হয়তো পরিবর্তনটা হতে পারত। আবার এখানে আরেকটা বিষয় আছে, যে নতুন প্রজন্ম পরিবর্তনটা আনবে, তারা এখনো বদ্ধপরিকর না। পরিবর্তনটাকে বৈপ্লবিক দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো সংগঠন তাদের নেই। এ জন্যই আমাদের আশাটা পূরণ হয়নি।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমূল কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে আপনি বলছেন। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পরিবর্তনটা কেমন হওয়া উচিত?

অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় পদেক্ষপগুলো আমরা ৩১ দফার মধ্যে উল্লেখ করেছি। বিএনপি এখানে অর্থনৈতিক না, কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার কথা বলেছে। এবারের ৩১ দফায় উল্লিখিত পরিবর্তনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইটি সেক্টর। এ খাতে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেব। একই সঙ্গে চতুর্থ প্রযুক্তি বিপ্লবের সুযোগও আমাদের নিতে হবে। এআইয়ের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে। এগুলো বাস্তবায়নে আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করছি। আমরা শিগগিরই জাতির সামনে অর্থনীতি নিয়ে আমাদের পলিসি তুলে ধরতে পারব।

অতীতেও বিএনপি কিছু বৃহৎ মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। যেমন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ভিএটি (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) চালু করেন, যা ছিল একটা মৌলিক পরিবর্তন। অন্যদিকে উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা আগে শুধু কৃষি বিশেষ করে পাটের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এ খাতে গার্মেন্টসের বিষয়টা নিয়ে আসেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। অর্থনীতিকে সচল করতে তিনিই প্রথমবারের মতো রেমিট্যান্সের জন্য বিদেশে শ্রমিক পাঠানো শুরু করেন।

চাকরিতে কোটার প্রতিবাদ থেকেই শুরু হয় জুলাইয়ের আন্দোলন। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার মতে, এটা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। কারণ একটা রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে পুরো জাতিকে ধ্বংস করা যায়। আজকের শিক্ষার মান এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখান থেকে প্রতিযোগিতা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এখানে আমূল পরিবর্তন দরকার আর এটা সম্ভব কমিশনের মাধ্যমে। আধুনিক বিশ্বে যেভাবে শিক্ষার প্রসার হয়েছে, সেগুলো অনুসরণ করতে হবে।

দুই দফায় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে বলে আপনি মনে করেন কিনা?

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো অনেক পরিবর্তনের সঙ্গে একমত হয়েছে। এখন প্রধান লক্ষ্য এগুলোকে বাস্তবায়ন করা। যেসব সংস্কারে সবাই একমত হয়েছে সেগুলো নিয়ে সবাই আলোচনা করবে। তবে এটা পার্লামেন্টের আগে নাকি পরে করা হবে—এটা আলোচনায় আসবে।

আমি প্রত্যেকটা বিষয়েই আশাবাদী। বিগত ১৫ বছর বিএনপি লড়াই করেছে। আমাদের অসংখ্য মানুষ শহীদ হয়েছে, নিহত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে। আমরা গ্রেফতার হয়েছি, জেলে গেছি, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জেলে গেছেন, তারেক রহমান নির্বাসিত অবস্থায় থেকেছেন।

এই যে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে প্রায় দুই হাজার তরুণ-কিশোর শহীদ হয়েছে, এটার তো একটা মূল্য থাকবেই। আমি মনে করি, এর ফলাফল আমরা পাব। তবে বাংলাদেশের মানুষ অল্পতেই হতাশ হয়ে যায়, আবার সামান্যতেই খুশি হয়ে যায়। এটা একটা সমস্যা বটে। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত যথেষ্ট এগিয়েছি। তাই হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগ চলে যাওয়ার পর দেশে যে কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি, এটাও অনেক বড় অর্জন। আবার হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়াও বন্ধ হয়েছে। এগুলো আমাদের ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে নিতে হবে। আমরা তো অতীতে সবই পেরেছি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রভাষা পেয়েছি, ঊনসত্তরে আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছি, একাত্তরে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি। আবারো নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলন করে স্বৈরাচার হটিয়েছি। আর চব্বিশে এসে আমরা হাসিনার মতো ভয়াবহ ফ্যাসিস্টকে সরিয়েছি। তাই পারব না এটা বলা যাবে না।

সংস্কারগুলো দিনশেষে রাজনৈতিক দলগুলোকেই বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলো বাস্তবায়নে বিএনপি মানুষকে কীভাবে আশ্বস্ত করবে?

বিএনপি এখানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটা নতুন না। আমরা জনগণের সামনে আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। ২০১৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ ও একটা প্রতিশ্রুতি ছিল। বিএনপি অতীতে প্রমাণ দিয়েছে আমরা সংস্কার করি এবং আমরা করেছিও। আমরা রাজনৈতিক সংস্কার করেছি, ওয়ান পার্টি সিস্টেম থেকে মাল্টি পার্টি সিস্টেমে গেছি, আবার অর্থনৈতিক সংস্কারও করেছি। যেমন আমরা ক্লোজড ইকোনমি থেকে ওপেন মার্কেট ইকোনমি করেছি। তাই এ প্রশ্ন ওঠাই উচিত না!