রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় পলিটিক্যাল সেটলমেন্ট বা রাজনৈতিক বন্দোবস্ত শব্দবন্ধটি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে আপনি অগ্রণী। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কোন পথে যাচ্ছে? নয়া বন্দোবস্তের পথে চ্যালেঞ্জগুলো কোথায়?

একটা সমাজের গতি বুঝতে হলে আমাদের অনেকগুলো জিনিস একসঙ্গে বুঝতে হবে। একটা হচ্ছে নিয়মকানুন ও সংবিধান; যেগুলোকে ইংরেজিতে আমরা ইনস্টিটিউশন বলি। একসঙ্গে অনেক ধরনের সংগঠন ও সংস্থা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে এ আইন মেনে চলে বা ভাঙার চেষ্টা করে। অর্থাৎ একটা সমাজের অর্থনীতি ভালোর দিকে যাচ্ছে, নাকি খারাপের দিকে যাচ্ছে, সেটা শুধু সেখানকার আইনকানুন এবং সংবিধান দিয়ে বোঝা যায় না। বুঝতে হবে যে সেখানে কারা ক্ষমতাশীল। তারা কোন আইনগুলো মানে, কোন আইন অমান্য করতে পারে। সমাজের প্রতিটি স্তর আমাদের এভাবে বুঝতে হবে—গ্রামে কারা ক্ষমতাশীল, কারা আইন ভাঙছে, শহরের বস্তি এলাকায় কারা ক্ষমতাশীল, তারা কীভাবে আইন ভাঙছে, কীভাবে দুর্নীতি করছে। অর্থাৎ আইনকানুন আর ক্ষমতার বিন্যাস, দুটোই বুঝতে হবে। এ ক্ষমতা ও আইনের কাঠামো মিলেই হচ্ছে একটা রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। এ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট সরকারের শেষের দিকে ক্ষমতার বিন্যাসটি অতি কেন্দ্রীভূত হয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতাশীলরা মনের আনন্দেই আইন ভাঙছিল। সরকার তার নিজের আইন ভাঙছিল, প্রশাসন তার আইন ভাঙছিল, পুলিশ তার নিজের আইন ভেঙে গুলি করছিল। অর্থাৎ এখানে একটা অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল একটা ছোট গোষ্টীর স্বার্থে। এর প্রতিবাদে আমাদের ছাত্রজনতা অভ্যুত্থান বা বিপ্লব করল, রাস্তায় নেমে এল। তারা চেয়েছিল এ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। আমরাও সেটা চাই। একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অর্থনীতি চুরি হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতে কোনো নিয়ম নেই। এমন অবস্থা আমরা কেউ চাই না। তাই ছাত্ররাই বলল রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পরিবর্তন করা দরকার। এটা অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু শুধু সংবিধান বা আইন পরিবর্তন করে তা করা যাবে না। দেখতে হবে আইনগুলো কারা ভাঙছিল। আইনগুলো ভাঙার ক্ষমতা ছিল কার? তারা কি নতুন আইন মানবে? নাকি তারা ওই নতুন সংবিধান আর নতুন আইনগুলোও ভাঙবে? আমার ধারণা তারা নতুন আইনগুলোও ভাঙবে। তাহলে আমাদের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পরিবর্তন করতে হলে একদিকে যেমন আইনকানুন ও সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে, একই সঙ্গে যারা অতিক্ষমতা কবজা করেছিল তাদের ওই ক্ষমতা কীভাবে ভাঙা হবে সেটাও জানা দরকার। এখানে একেবারেই সাম্যবাদ সম্ভব না আমি তা বলছি না। কিন্তু আমাদের এক শ্রেণীর অলিগার্ক, তাদের বন্ধু আমলা, প্রশাসন, রাজনীতিক—এরা সব ক্ষমতা কবজা করে ফেলেছিল। এখানে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য আমার মনে হয়, বাস্তবসম্মত কর্মসূচি হলো মধ্যম শ্রেণীকে দ্রুত শক্তিশালী করা। যে শ্রেণীর হাতে এসএমই চালিত হয়, এ শ্রেণীকে দ্রুত ক্ষমতাশীল করতে হবে। এটা শুধু আইন পাস করেই বা এসএমইকে ঋণ বিতরণ করেই করা যাবে না। আরো অনেক কিছু করতে হবে। এটাই হচ্ছে আমাদের আশু ভবিষ্যতের কর্মসূচি।

অভ্যুত্থানের কেন্দ্রস্থল ছিল শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষার্থীরা। গত এক বছরে শিক্ষা সংস্কারে কোনো উদ্যোগ দেখলাম না। তরুণ প্রজন্মকে সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষায় কেমন সংস্কার দরকার?

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার হয়নি, কারণ এটার সমস্যা সাংঘাতিক একটা বড় সমস্যা। নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সমস্যা। একটা শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত এবং জাতির মেরুদণ্ড। এটাকে আপাদমস্তক ধ্বংস করা হয়েছে। এটার মেরামত কীভাবে শুরু করা যায় সেটা বুঝতেও সময় লাগবে। সেবা দিচ্ছে কারা? শিক্ষকরা। শিক্ষকের জ্ঞান উৎপাদন করা, গবেষণা করা মুখ্য বিষয় ছিল না। পড়ানোর পারদর্শিতা দেখা হতো না। এটা বাস্তবতা। এখন যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়েছে সেখানে আন্তর্জাতিক মানের কোনো গবেষণা হয় না বললেই চলে। এমন না যে একেবারে কিছুই হয় না। যা হওয়ার তা কিছুই হয় না। সেখান থেকে সরাসরি স্কুল, কলেজ, প্রাইমারিতে গেলে দেখা যাবে আন্তর্জাতিক মান ও গবেষণা অনুযায়ী দেশের প্রাইমারির শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক বিশ্বের তুলনায় চার-পাঁচ বছর পিছিয়ে। তার মানে শিক্ষকের দোষ, শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বা গভর্ন্যান্সের দোষ। আমাদের যুবক-যুবতীদের মেধার অভাব নেই। যে পড়াচ্ছে সে হয়তো নিজেই কম জানে বা পড়াতে জানে না বা সে পড়ানোর রিসোর্স পাচ্ছে না বা কোনো না কোনো জায়গায় সমস্যা। নিচের থেকে ওপর পর্যন্ত সব জায়গায় গণ্ডগোল। এটা একটা আইন পাস করে পরিবর্তন করা যাবে না। এটা নিয়ে আমাদের বিশাল একটা অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এই যে নিচের থেকে ওপরে আমূল সংস্কার প্রয়োজন এটা একটা দশ বছরের পরিকল্পনা। একই সঙ্গে আমাদের দ্রুত কিছু কাজ করতে হবে। যেমন তাৎক্ষণিক আমাদের জায়গায় জায়গায় শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে, যা না করলে আমাদের উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্ভাবনা ব্যাহত হবে। এগুলো করার এখন সম্ভাবনা আছে। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, ম্যাসিভ অনলাইন কোর্স ব্যবহার করে, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে শিক্ষকতা ও গবেষণার স্কিল নিয়ে আসা সম্ভব। আমাদের এখন দ্রুত কিছু লোককে ট্রেনিং দিতে হবে। সবাইকে এখন ট্রেনিং দিতে না পারলেও যেগুলো এখন ক্রিটিক্যাল সেক্টর যেমন আইটি, ইংরেজি, যেসব টেকনোলজি আমাদের মাঝারি শিল্পের জন্য প্রয়োজন সে প্রশিক্ষণগুলো আমাদের দ্রুত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানে করতে হবে, কারণ এটা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার যুগ। তাই আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক দিয়ে করাতে হবে। কিছু টাকা খরচ হলেও। অনলাইনে করান বা তাদের নিয়ে এসে করান। সময় নষ্ট করা যাবে না। আর যারা অদক্ষ, কোনো কাজের না, তাদের চাকরি থেকে বের করা অতিরিক্ত কঠিন। তাদের বাইপাস করে নতুনদের আনতে হবে এবং পুরনোরা অবসর নিয়ে চলে যাবে। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েও আন্তর্জাতিক মানের করাতে পারবেন না। এখন আমাদের যেটা দরকার সেটা হচ্ছে খুব উচ্চমানের জ্ঞান ও প্রযুক্তি তাড়াতাড়ি নিয়ে আসা। উচ্চ জ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া গার্মেন্টসের মতো অদক্ষ শ্রমের শিল্প থেকে বের হতে পারব না। এমনকি পোশাক খাতেও মাঝারি মানের লোককেও আমাদের কিন্তু বাইরের দেশ থেকে আনতে হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে দক্ষ লোক বের হচ্ছে না। এ হচ্ছে আমাদের শিক্ষার অবস্থা। অনেক ছাত্র বলে, আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুই শিখিনি। তবে আমাদের অনেক ভালো শিক্ষক ও গবেষক আছে। কিন্তু মোটা দাগে গল্পটি খুবই খারাপ। আমাদের বসে থাকলে হবে না। নতুন নতুন লোক নিয়ে আসতে হবে। পুরনো লোকগুলো রিটায়ার করে চলে যাক। বিশ্বের যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে ভালো তার সঙ্গে পার্টনারশিপ করতে হবে। আগামী দুই-চার বছরে আন্তর্জাতিক কিছু লোক দরকার ক্রিটিক্যাল সেক্টরে। আগে আমি সম্পূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করব, পরে এটা এটা ঠিক করব—এ সময় নেই। সংস্কারের ধারাবাহিকতা (সিকোয়েন্স) ঠিক করা খুব জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেই কোনটা আগে করব, কোনটা পরে করব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আগে আপনাকে এ অবস্থায়ই কিছু লোক তৈরি করতে হবে, তারপর আপনি ধীরে ধীরে সিস্টেম ঠিক করেন। শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সমস্যা। এটি ঠিক করতে অনেক সময় লাগবে।

দেশে কর্মসংস্থান একটা বড় সমস্যা, বৈদেশিক বিনিয়োগ একটা বড় সমস্যা। আমাদের অনেক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। কীভাবে এ জনসংখ্যাকে যোগ্য দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়? দেশে-বিদেশে কীভাবে এ জনসংখ্যাকে কাজে লাগানো যায়? একই সঙ্গে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?

আবারো আমাদের অগ্রাধিকারগুলো ঠিক করতে হবে। আমার ব্যক্তিগত প্রায়োরিটি হচ্ছে বাংলাদেশী মালিকানায়, বাংলাদেশী যুবকের নেতৃত্বে অন্তত পাঁচ-দশ হাজার নতুন আন্তর্জাতিক মানের অর্থাৎ যারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে এমন কিছু এসএমই তৈরি করা। এগুলো গার্মেন্টসে হবে না। এগুলো আইটিতে হতে পারে, যন্ত্রাংশে হতে পারে, এগুলো কম্পোনেন্ট শিল্পে হতে পারে। ছোট ছোট ফ্যাক্টরিতে এসব যন্ত্রাংশ, কম্পোনেন্ট তৈরি হয়, এগুলো আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে, আন্তর্জাতিক দামের হতে হবে, নয়তো টিকবে না। এর জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে ব্যাপারটি সে রকম না।

বাংলাদেশে খুঁজলে অন্তত ৫০ হাজার বা এক লাখ উদ্যমী তরুণ-তরুণী উদ্যোক্তা পাওয়া যাবে। যাদের যথেষ্ট যোগ্যতা আছে এগুলো করার। কিন্তু তারা সম্ভবত জানে না একটা ফ্যাক্টরি কীভাবে পরিচালনা করতে হয়। এ ফ্যাক্টরি চালানোর শিক্ষাটা কোনো বইপুস্তকে পাওয়া যাবে না। এটা চীন, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ানের মতো দেশে যারা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে বা একই ধরনের জিনিস তৈরি করছে কিন্তু এখন মজুরি হার বেড়ে যাওয়ায় এখন আর এ পণ্য উৎপাদন করতে চায় না বা এ ধরনের কাজে আর আগ্রহী না, তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। আমাদের উদ্যোক্তাদের সেখানে পাঠাতে হবে। তাদের ফ্যাক্টরি চালানো শেখাতে হবে। প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা যখন দেশে এসে ফ্যাক্টরি চালাবে, পণ্য রফতানি করবে, তখন সেই বৈদেশিক উদ্যোক্তা-শিক্ষককে আপনি পুরস্কৃত করবেন, শুধু কাগজের ডিগ্রি দেয়ার জন্য না। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আমাদের ১০-১২টি খাতে করতে হবে। আমরা গড়ে বলছি, শিক্ষার অবস্থা খারাপ। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের দেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষ রয়েছে। এখানে যদি ১ শতাংশ মানুষও উদ্যমী, উদ্যোগী আর শিক্ষিত হয়, সেটির সংখ্যাও অনেক বেশি। শতভাগের দরকার নেই। যারা আছে তাদের দিয়েই এসএমই শুরু করি।

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) অনেক ধরনের হয়। অনেক প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ হয়, যা আমাদের কোনো কাজের না। তারা আসবে, একটা রক্ষিত বাজারে বিক্রি করবে, চলে যাবে। এটাতে বিস্তর প্রভাব পড়ে না। আমাদের খুব বাছাই করে এফডিআই আনতে হবে, যে এফডিআইতে স্প্রেড-ইফেক্ট হয়। এটার ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ আছে, ফরওয়ার্ড লিংকেজ আছে, যার মাধ্যমে আমার দেশে নতুন ব্যবসা আর উদ্যোক্তা জন্মাবে। এটা সব এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে হয় না। এফডিআইয়েরও একটা ক্লিয়ার পলিসি দরকার, নীতিনির্ধারণ দরকার। আমরা চাই এমন প্রযুক্তি যেগুলোয় ব্যাকওয়ার্ড-ফরওয়ার্ড লিংকেজ হয়, মজুরি বাড়ে, দক্ষতা বাড়ে, দেশের উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়ে, সে রকম এফডিআই দরকার। বিএনপির থেকে আমরা খুব ভালো কিছু কথা শুনছি। ডিরেগুলেশন করতে হবে, অনেক নিয়মকানুন আছে যেগুলো ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, সেগুলোকে দূর করতে হবে। আমাদের ব্যবসার পরিবেশকে ভালো করতে হবে। আমরা অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছি, এগুলোকে রিনেগোশিয়েট করে দাম কমাতে হবে। এ দামের বিদ্যুৎ থাকলে আমাদের এখানে শিল্পায়ন হবে না। বিদ্যুতে ভর্তুকি দিয়ে বেশিদিন চলা সম্ভব নয়। আইএমএফও দিতে দেবে না, আমাদেরও পয়সা নেই। অর্থাৎ আমরা যদি বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিবদ্ধ দাম কমাতে না পারি তাহলে আমাদের শিল্পায়নে একটা বড় ধাক্কা আসবে।

ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে না পারলে সুদের হার কমবে না, সুদের হার না কমলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ শিল্পায়নের জন্য অনেকগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু সেখানে কোনটা আগে আর কোনটা পরে সেগুলোর অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।

আমরা দেখছি ঐকমত্য কমিশনে বিভিন্ন বিষয়ে অনেকগুলো দল একমত হয়েছে, কিছু কিছু বিষয়ে একমত হয়নি। যেমন ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়ে একমত হয়েছে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিষয়ে একমত হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই মেয়াদের বিষয়ের মতো জটিল বিষয়ে তারা একমত হয়েছে। কিন্তু আমাদের ইতিহাস অনেক কষ্টের। নব্বই দশকের দিকে আমরা দেখেছি তিনজোটের রূপরেখা ভেস্তে গেল। এটা নিয়ে আমরা কতটা আশাবাদী?

এটা নিয়ে আমি নেতিবাচক কিছু বলতে চাই না। এটা নিয়ে অনেকেই অনেক কসরত করেছেন, অনেক শ্রম দিয়েছেন, এগুলো ভালো, করা উচিত। আমি আগেই রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিশ্লেষণের মূল জায়গায় আসি। আমরা যে আইনই করি না কেন, যে সংবিধানই করি না কেন, যদি ক্ষমতা অল্পসংখ্যক কিছু লোকের হাতে থাকে তাহলে কিছুই কাজ করবে না। ধরুন বিচারপতিদের নিয়োগ দেবে একটা স্বতন্ত্র বডি। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। আপনি সেই বডিটাও তৈরি করলেন। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কাছেই, ওই দলের কাছেই। ফলে বাস্তবে ওই বডির যে চেয়ারম্যান সে ফোন তুলে প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করবেন যে স্যার আমি এখন কী করব? এটাই হবে। আপনি নিয়মটা বানিয়েছেন কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ফোনকল। কাকে কে চাপ দেয়, কাকে কে তদবির করে এটাই যদি থামানো না যায় তাহলে আইনে যাই বলা হোক না কেন, দুই কক্ষ বানানো হোক, তিন কক্ষ বানানো হোক, চার কক্ষ বানানো হোক, সংখ্যানুপাতিক হোক; বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না।

এখন দুই কক্ষেই যদি সাংসদের একটা বড় অংশ অলিগার্কের টাকায় আসে, তাহলে সংখ্যানুপাতিক তো ম্যাটার করে না। যে দলই থাকবে, ক্ষমতাসীন বা বিরোধী, ওই একই অলিগার্কের কথা শুনবে সবাই। তাহলে আপনার দুই দলের কোয়ালিশন বা এক দল, এটা ম্যাটার করে না। আমার কথা হচ্ছে সে কার টাকায় চলছে, কার স্বার্থ দেখছে, সেটা যদি পরিবর্তন না করা হয় তাহলে কি বাস্তব আচরণে কোনো পরিবর্তন হবে? রাজনীতিক আর আমলার আচরণে কোনো নতুনত্ব দেখব? হয়তো না। তাহলে কেন আমার সব পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল এটার পেছনে দিচ্ছি? আগে দেখব কতটা পরিবর্তন করতে পারি ক্ষমতার, ওই নতুন ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে কিছু সাংবিধানিক পরিবর্তন বা নতুন সংবিধান, আইনকানুন করতে হবে। এর ভিত্তিতে এক স্বার্থের ক্ষমতা আরেক স্বার্থ বা গোষ্ঠীর চাপের মাধ্যমে চেকের মধ্যে রাখতে হবে। কিন্তু ক্ষমতার বিন্যাস কতটা পরিবর্তন হবে তা আমরা এখনো জানি না। আমরা সংবিধান আর আইনকানুন নিয়ে এমনভাবে কথা বলছি যেন মনে হচ্ছে আমাদের বাস্তবিক ক্ষমতার বিতরণ একটা আধুনিক উন্নত দেশের মতো। আসলে তো তা না। এখানে ১০-১২ জন অলিগার্ক অনেক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের মধ্যে যান, দেখবেন প্রশাসন কারো কারো কথায় পরিচালিত হচ্ছে। কীভাবে? আইনত একটা অন্তর্বর্তী সরকার আর উপদেষ্টা থাকা সত্ত্বেও যাদের কথা শোনার তাদের কথাই শুনছে। তাই শুধু সংবিধান পরিবর্তন করে বা ঐকমত্যে ঘোষণা দিয়ে বেশি কিছু হবে না। আসল পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হলে ক্ষমতার ধারক চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। আরেকটা ব্যাপার আছে, আমরা অনেক কিছু হুজুগে করে ফেলি। এক কক্ষ কাজ করছে না, দুই কক্ষ নিয়ে আসি। ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট কাজ করছে না, সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা নিয়ে আসি। সংখ্যানুপাতিকের কিন্তু অনেক সমস্যা আছে। সংখ্যানুপাতিক কাজ করে যদি ক্ষমতার বিন্যাস উপযোগী হয়। যেমন নেপালে আংশিক সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা আছে। সেখানে কী হয়? নির্বাচনের মাধ্যমে এতগুলো দল সংসদে আসায় একটি শক্তিশালী সরকার গঠন করতে পারে না। ওই একই সংসদ কিন্তু ছয় মাস পর পর কোয়লিশন হয়ে নতুন নতুন সরকার আসে। এটা কার্যকর না। এখন বাস্তবে কয়টা পার্টি টিকবে বাংলাদেশে, এটা জানতে হবে। বাংলাদেশে বাস্তবে কয়টি পার্টি আছে সেটির ভিত্তিতেই সংখ্যানুপাতিক সিস্টেম করতে হবে। বাংলাদেশে যদি এখন ১০টা পার্টি থাকে তাহলে সংখ্যানুপাতিক কোনোদিনও কাজ করবে না। ১০টি পার্টির সংসদ বসিয়ে একটা জুলুম হবে। কিন্তু যদি তিনটা পার্টি হয় তাহলে সংখ্যানুপাতিক কাজ করতে পারে। অর্থাৎ আমি যখন জানি না শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার বিতরণটা কী হবে, স্বার্থের বিতরণটা কী হবে আমি কোন ফর্মুলায় সংখ্যানুপাতিক করব, আমি জানি না। আমি একটা করে দিলাম, পরে দেখা গেল আমি একটা জায়গায় আটকে গেলাম তখন আবার পরিবর্তন করতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের একটি সময়সীমা ঘোষণা করেছে। ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন নিয়ে আপনি কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন? নির্বাচনের আগে ও পরে আপনি কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?

আগেই বলে রাখছি, আমি এ সরকারের সমর্থক। এ সরকার যদি সত্যিকার অর্থে অলিগার্কদের ক্ষমতাকে ভাঙতে শুরু করত তাহলে মানুষ বলত সরকার আরো ছয় মাস বা এক বছর থাকুক। এটা আমার বিশ্বাস। তারা এক বছর পরে এ জায়গায় একটাও সাফল্য দেখাতে পারেনি। অনেকে জেলে আছে ঠিকই, অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কিন্তু এ মামলা কি টিকবে? শেষ পর্যন্ত কি আমরা এদের অর্থ নিতে পারব? এটা তো নিশ্চিত না। তারা যদি এ জায়গায় সাফল্য দেখাতে পারত তাহলে তাদের মেয়াদ কিন্তু এমনিতেই বেড়ে যেত। তাই কেউ কেউ বলছে আপনারা কিছু করছেন না, তাই নির্বাচন দেন। এ রকম একটা কথা আমরা শুনছি। এটা রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করছে। যেহেতু সরকার কিছু করছে না, তাই মানুষ বলছে নির্বাচন দিতে। এ যুক্তিকে হালকাভাবে উড়িয়ে দিতে পারেন না। এটাই বাস্তবতা। এখন সমস্যা হচ্ছে তারা যা-ই করছে, রাজনৈতিক দল যদি সেটাও না করতে পারে তাহলে কিন্তু বিশাল বিপদ হবে। এখানে যে দুই-তিনটা মামলা হচ্ছে, দুই-তিনটা জায়গায় আমরা টাকাগুলো ফেরত নেয়ার যে পদক্ষেপ নিচ্ছি, নির্বাচিত সরকার আসলে যদি এটাও না হয় তাহলে আমি মনে করি যে বাংলাদেশে আরেকটা অভ্যুত্থান হওয়ার খুব ভালো সম্ভাবনা আছে। কিন্তু যদি নির্বাচিত সরকার মনে করে যে আমরা ক্ষমতায় এলে আমরাও এ কাজটা করব, আর আরো ভালভাবে করব, তাহলে আমিও নির্বাচনের পক্ষে। কারণ ক্ষমতার বিন্যাস পরিবর্তন করতে হলে ক্ষমতা দরকার। ক্ষমতা মানে পুরনো ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে ভাঙার জন্য নতুন ক্ষমতা দরকার। এ ভাঙার ক্ষমতাটা এ সরকারের যথেষ্ট দৃশ্যমান না। যদি নির্বাচিত সরকার সেই প্রতিশ্রুতি দেয় তাহলে আমি তার পক্ষে। সে যদি আরো ঘনিষ্ঠভাবে অলিগার্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তাহলে আমি তার বিপক্ষে। অর্থাৎ নির্বাচন হবে কি হবে না, ভালো কি খারাপ এটা আমার জন্য মুখ্য না। আমার জন্য মুখ্য হচ্ছে আপনি কি এ কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারছেন? যদি বর্তমান সরকার এ কাজের জন্য আমাদের সব থেকে ভালো ব্যবস্থা হয় তাহলে আমি এ সরকারের পক্ষে। যদি অন্য কোনো নির্বাচিত সরকার হয় আমি তার পক্ষে। আমি নির্দিষ্ট কারো সঙ্গেই থাকব এমনটা না। তবে এখনো কিন্তু সময় হয়নি অলিগার্কদের সঙ্গে সমঝোতা করে মিলেমিশে ভাই ভাই রাজনীতি করার। এখন নির্বাচিত হয়ে কেউ যদি আবার সেই ভাই ভাই রাজনীতিতে নেমে যায় তাহলে এটা বাংলাদেশের জন্য সাংঘাতিক সমস্যা সৃষ্টি করবে। রাজনৈতিক সরকার এসএমইর ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে, এফডিআইয়ের ক্ষেত্রে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, কোনো ক্ষেত্রেই সাফল্য দেখাতে পারবে না যদি অলিগার্ক আর তাদের পুষ্ট আমলা আর রাজনীতিকেরা আগের মতো আইন ভাঙতে পারে, বরাদ্দকৃত অর্থ খেয়ে ফেলতে পারে, আর চড়া দামে আমদানি আর ঠিকাদারির লাইসেন্স পেতে থাকে। দুই-চার মাসের মধ্যে ভালো কিছু দিতে না পারলে বাংলাদেশের মানুষ আবার রাস্তায় নামবে। এটা আমাদের জন্য ভালো হবে না। আমার আশা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো এটা বোঝে, তারা এ কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকে, যদি নির্বাচন হয় খুব ভালো কথা। নির্বাচনের পরে কাজটা যদি তারা আরো শক্তিশালীভাবে করতে পারে তাহলে বাংলাদেশ বেঁচে যাবে।