অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অনেকগুলো মৌলিক সংস্কারের দাবি ওঠে। সরকার এজন্য ১১টি কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মৌলিক কোনো সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না কেন?
মৌলিক সংস্কার করতে গেলে সরকারের কিছু ক্ষমতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু সে ধরনের ক্ষমতা এ সরকারের নেই। যেমন সংবিধান সংস্কার একটি অনির্বাচিত সরকার করতে পারে না। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে তা করতে হবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ চাইলে সেটি হবে না, হচ্ছেও না। আর তা নির্বাচন ছাড়া সম্ভব না। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুলিশসহ অনেক সংস্কার আছে—সেগুলোও এ সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। এ সরকারের অন্যতম কাজ হলো নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার করে নির্বাচন দেয়া।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) অন্যান্য সংস্থার প্রেসক্রিপশনে কিছু সংস্কার হলো। এ সংস্কারগুলোকে কীভাবে দেখছেন?
আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার সময় সংস্থাটির পক্ষ থেকে কিছু নির্দেশ দেয়া হয়। সেখানে মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা রকম বিষয় উল্লেখ থাকে। এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে বেশকিছু প্রভাব জনগণের ওপর পড়ে। আমাদের এখানে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ হলো আইএমএফের এসব দেনদরবার।
যার জন্য অতিষ্ঠ হয়ে কয়েকদিন আগে অর্থ উপদেষ্টা বলেছিলেন, আমরা আইএমএফের কথায় আর চলব না। কিন্তু সেটি বললেও যে ঋণ দরকার তা আইএমএফের কাছ থেকে পেতে হবে। শেষ পর্যন্ত সংস্থাটির সঙ্গে বসেই তাদের ফয়সালা করতে হয়েছে। আইএমএফের যে প্রেসক্রিপশন তার শেষ পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক ভূমিকা আছে বলে আমি জানি না।
অভ্যুত্থানের পর পরই জুলাইয়ের স্পিরিটকে ধারণ করে রাষ্ট্র গঠন প্রসঙ্গে নানা পক্ষ কথা বলেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ‘স্টেট বিল্ডিং’ কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ থেকে একটি নিকৃষ্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের উৎখাত হয়েছে। কিন্তু আমি আগেই বলেছি এটি কোনো সামাজিক বিপ্লব নয়—যেখানে একটি শ্রেণীর জায়গায় আরেকটি শ্রেণী ক্ষমতায় আসে। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎপাদন ও মালিকানার সম্পর্কের কিছুই পরিবর্তন হয়নি। এমনকি ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন রয়েছে। এ সরকার যেভাবেই প্রতিষ্ঠিত হোক, তারা শাসক শ্রেণীর বৃত্তের মধ্যে কাজ করছে। ব্যবসায়ী শ্রেণীর স্বার্থে এ সরকারকে এখন অনেক কিছু করতে হচ্ছে। একমাত্র ব্যাংকিং সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যবৃদ্ধি আয়ত্তের মধ্যে রাখা ছাড়া এ সরকারের তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ নেই। কাজেই একটি রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গঠন করার কোনো ভিত্তিও এখানে নেই।
বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা তাতে কোনো নির্বাচিত সরকার এলেও এ শাসক শ্রেণীর বৃত্তের মধ্যে থাকতে হবে। কাজেই একটি নির্বাচিত সরকার এলে তারা যে খুব গণতান্ত্রিক বা বিপ্লবী সরকার হয়ে যাবে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে আওয়ামী লীগ (নিষিদ্ধ ঘোষিত) যেভাবে ফ্যাসিজম করতে পেরেছে তা করতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ইতিবাচক একটি ফল হলো জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। তারা আর নির্যাতন সহ্য করবে না। বিএনপির লোকেরা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝেছে। যার জন্য তারা বারবার বলছে—‘আওয়ামী লীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত) মতো কাজ করলে আমরা উৎখাত হয়ে যাব।’
বায়ান্ন, ঊনসত্তর ও নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের চরিত্রের সঙ্গে চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের কোনো পার্থক্য দেখতে পেয়েছেন?
এ অঞ্চলে অনেক ছাত্ররাজনীতি হয়েছে। এসব আন্দোলনের পর যেসব ছাত্রনেতা বেরিয়ে এসেছে তাদের চরিত্র ছিল বামপন্থী। কখনই দক্ষিণপন্থী ছিল না। এবারই প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে প্রকাণ্ড আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের চরিত্র দক্ষিণপন্থী। এটি খুব বিস্ময়কর হলেও বাস্তব।
এছাড়া ৫ আগস্টের পর যেসব পরিবর্তন হয়েছে, তার মধ্যে বামপন্থী প্রভাব বলতে কিছু নেই। সাধারণভাবে বলা চলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিপুল প্রাধান্য। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ সবগুলোই দক্ষিণপন্থী। বামপন্থী দলগুলোর উপস্থিতি সামান্য। এটিই বর্তমান রাজনীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যে সংকট দেখা দিয়েছে। এটি কেন হলো?
দেশে যে রাজনৈতিক দলগুলো কাজ করে তাদের মধ্যে ঐক্য থাকতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। বিভিন্ন দলের বিভিন্ন মত এবং কার্যকলাপ থাকে। এখনো সে রকমই হচ্ছে। নির্বাচনের সময় জোট হয় সেটি আলাদা বিষয়।
এখানে ঐক্য কেন হতে হবে? বরং এখন দরকার একটি নির্বাচন দিয়ে দেয়া। নিয়ন্ত্রণের অভাবে দেশে অনেক রকম সমস্যা হচ্ছে। এটা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। যত দিন যাচ্ছে ততই শাসন ব্যবস্থার ওপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যাচ্ছে। ফলে দ্রুত নির্বাচন না দিলে সামনের দিনে নৈরাজ্য বেড়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আমরা নিজের ধারণা বর্তমান সংবিধানটি ফেলে দেয়া দরকার। প্রথম কথা হচ্ছে এ সংবিধান তৈরি করেছিল পাকিস্তানের সাধারণ পরিষদ দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের পর দরকার ছিল একটি গণপরিষদ। সংবিধান সভা নির্বাচন করা। তা না করে তিনি পাকিস্তান আমলে ’৭০-এ ইয়াহিয়া যে নির্বাচন দিয়েছিল তাতে কেন্দ্র এবং প্রদেশে যারা নির্বাচিত হয়েছিল তাদের দিয়ে একটি অধ্যাদেশ করে গণপরিষদ করেছিল। একটি অধ্যাদেশ করে তার ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে সংবিধান সভা করেছিল। এটি অনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কাজ। সেই পাকিস্তানি সংবিধানের আওতায় নির্বাচিত পরিষদই এটি করেছে। তবে নতুন সংবিধান মানে এই নয় যে পুরনো সংবিধানের সবকিছু ফেলে দিতে হবে। এ সংবিধানের মধ্যে গণতান্ত্রিক আদেশ-অধ্যাদেশও রয়েছে। সেগুলো অবশ্যই উন্নতি করতে হবে। নতুনভাবে হলে এক বিষয় আর পুরনোকে জোড়াতালি দিয়ে হলে আরেক বিষয়।










