দেশের বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে আপনাদের মূল্যায়ন কী?

দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা ছিল। বিগত সরকারের সময় সব ক্ষেত্রে অনেক ধরনের অব্যবস্থাপনা হয়েছে। নতুন সরকারে যথেষ্ট অভিজ্ঞ লোক দায়িত্বে আসার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রতিপক্ষ তৈরি করে ফেলছে। যারা দেশের অর্থনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং যাদের বিশাল অবদান, তাদের রাতারাতি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে মানুষের কাছে হেয় করা হচ্ছে। তারা যদি অনিয়ম করে থাকে, সেক্ষেত্রে দেশে আইনকানুন আছে। কিন্তু এসব নিয়ে সেমিনারে, বিবৃতি দিয়ে পত্রপত্রিকায় দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে মন্তব্য করে হেয় করা হচ্ছে। সবকিছুতেই—এটা করে ফেলব, ওটা করে ফেলব—এমন মনোভাব দেখা যাচ্ছে। যেমন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ প্রক্রিয়া। এটা নিয়ে বিদেশীরাও বাংলাদেশে এসে প্রশ্ন তুলছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে সংলাপ হতে পারত, কথা হতে পারত, কিন্তু তার আগেই মন্তব্য করা হচ্ছে। এসব নিয়ে রীতিমতো একটি হতাশার জায়গা তৈরি হচ্ছে। সামগ্রিক বিবেচনায় এগুলো কোনো ভালো বার্তা দিচ্ছে না, সাধারণ মানুষের কাছেও না। সমালোচনা অবশ্যই গঠনমূলক হওয়া উচিত এবং কোনো পর্যবেক্ষণ থাকলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা উচিত। কিন্তু এমন দায়িত্বশীল মন্তব্য করে কাউকে ছোট করা ঠিক নয়।

এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বা তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

প্রথমেই একজন বিদেশী বিনিয়োগকারী এসে শুধু সরকারের সঙ্গে কথা বলেন না, তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও কথা বলেন। সুতরাং, ব্যবসায়ীদের আস্থা থাকা জরুরি। বর্তমানে অস্থিরতার কারণে বড় জয়েন্ট ভেঞ্চার আসতে চাইলেও স্বয়ং আমিই এ ঝামেলার মধ্যে যেতে আগ্রহী নই। সবাইকে এক পাল্লায় মাপলে হবে না। অনেক ব্যবসায়ী নিশ্চয়ই আছেন যারা অনিয়ম করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু গড়পড়তা সবাইকে একই রকম মনে করা হচ্ছে। এটি মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। বরং সবগুলো রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে বেশি উদ্বিগ্ন এবং তারা কথা বলতে চাইছে। বিএনপিসহ অন্যান্য দল যেমন জামায়াতও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

আপনার কি মনে হয় একটি নির্বাচন হলে দেশের পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে?

অবশ্যই। তখন একটি সংলাপ হবে, এখন তো কোনো সংলাপই নেই, শুধু মনোলগ চলছে। সেখানেও এমন সব মানুষ এসে বসেছেন যাদের দেশের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়।

স্কয়ার গ্রুপের বর্তমান বিনিয়োগের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলো কী কী এবং কোন কোন খাতে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে?

সব খাত নিয়েই আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ আমরা প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকতে চাই। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও সে সম্ভাবনা আমাদের রয়েছে। অনেক বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা চলছে। দুটি প্রধান খাত—ফার্মায় অনেক বড় ধরনের বিনিয়োগ চলছে, টেক্সটাইলে আমরা প্রবৃদ্ধিতে রয়েছি। এছাড়া ফুড অ্যান্ড বেভারেজ এবং টয়লেট্রিজ খাতেও নতুন নতুন প্রকল্পের কাজ চলছে। আমাদের দায়িত্ব আছে দেশের এতগুলো মানুষের প্রতি, কারণ এ অর্থ আমাদের নয়, এগুলো দেশের মানুষেরই, তারাই আমাদের বড় করেছে। আমরা সে কথা ভুলে যাইনি। একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার দায়িত্ব আমাদের আছে।

বাংলাদেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মাঝে স্কয়ার কীভাবে অগ্রসর হচ্ছে?

পরিস্থিতির উন্নতি হবে এমন আশায় বুক বেঁধে আমরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কিছু ঝুঁকি নিতেই হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যুৎ যতক্ষণ না আসে তখন জেনারেটর ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়। টেক্সটাইল, বিশেষ করে স্পিনিং ও প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিতে বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক বেশি এবং সেখানে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ ছাড়া কাজ করা খুব কঠিন। যখন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়, তারা ভালো স্বপ্ন দেখান, যেমন এফএসআরইউ আসছে, এলএনজি চলে আসছে, পেমেন্ট হচ্ছে। এগুলো ভালো খবর। স্কয়ারের নিজেদের একটি বড় শক্তি হলো আমাদের নিজেদের বিনিয়োগ সক্ষমতা ভালো, তাই ঋণ নেয়ার চাপ কিছু কম।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে, বিশেষ করে তরুণ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার ক্ষেত্রে স্কয়ার ভবিষ্যতে কী ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করেন?

স্কয়ার বিশেষত যোগ্য যুব ও নারী কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করতে চাইছে। আমরা নারী কর্মীদের জন্য একটি শোভন ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে বদ্ধপরিকর, কারণ আমাদের নিজেদের মেয়েরাও এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। যোগ্য নারীরা অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা তাদের অগ্রগতির অন্যতম কারণ। সব মিলিয়ে স্কয়ার হোয়াইট কলার জবেও যোগ্য নারীদের আমরা সুযোগ দিতে চাই।

আমরা মানুষের জন্য কিছু করতে চাই। তাদের জীবনকে স্পর্শ করতে চাই। এ বছরই আমাদের মোবাইল হাসপাতাল চালু হচ্ছে, এর মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে ঘুরে চিকিৎসা ও ছোটখাটো সার্জারি সেবা প্রদান করা হবে। আমাদের প্রয়াত বাবার শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে একটি পারিবারিক ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু করেছি। আরো কিছু কাজ আমরা করছি—শুধু নিজেরা নয়, অন্যদের সঙ্গে যৌথভাবে করছি। এমন একটি উদাহরণ শিক্ষাপ্রদান কর্মসূচি। এটি ব্র্যাকের সঙ্গে যৌথভাবে করা হচ্ছে। অনেক শিশু যারা রেললাইনের পাশে বসে থাকে, এ ধরনের শিশুদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কর্মসূচি নেই। আমরা এ শিশুদের স্কুলে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছি। তাদের স্কুলে যাওয়ার প্রতি আকর্ষণ নেই। আকৃষ্ট করার জন্য তাদের দুপুরের খাবার বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। আশা করছি এর মাধ্যমে শিশুরা লেখাপড়া শিখে দক্ষতা অর্জন করতে পারবে এবং মাদকাসক্তি বা অন্যান্য খারাপ পথে যাওয়া থেকে বাঁচবে।

দিন শেষে আসলে শুধু নিজে ভালো থাকলে হবে না, সমাজের জন্য কিছু অবদান রাখতে হবে। দেশের মানুষের যদি ভালো না হয় তাহলে কেউই ভালো থাকবে না। এটি নিজেদের স্বার্থেই করা হচ্ছে। নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের স্বার্থেই আমাদের এগুলো করতে হবে। পরিচিত অনেককেই এ ধরনের কাজে উৎসাহ দিচ্ছি।

শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এ প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার বিষয়ে স্কয়ারের বর্তমান প্রস্তুতি বা অগ্রগতি কী?

প্রযুক্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চলমান বিষয়। ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে নতুন যত উদ্ভাবন হচ্ছে, নতুন নতুন মলিকিউল আসছে, সেগুলো নিয়ে যখন কোনো প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে, প্রত্যেকটিতে নিয়মিতভাবে আমাদের কর্মীরা অংশ নিচ্ছেন। ওখানে তারা নতুন কী আসছে, কোন ধরনের প্রযুক্তি আসছে, সেগুলো জানতে পারছেন। সেখান থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান অনুযায়ী আমরা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছি। সেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। এ প্রক্রিয়া ফার্মাসিউটিক্যালস ছাড়াও টেক্সটাইল, টয়লেট্রিজ ও ফুড অ্যান্ড বেভারেজ সব খাতেই চলছে।

আমরা বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছি স্বাস্থ্যকর খাবারের বিষয়ে। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়। ওষুধ সরবরাহ ও বিতরণের ক্ষেত্রে দেখা হচ্ছে, এগুলো গ্রামগঞ্জে সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে কিনা। গ্রামগঞ্জে অনেক সময় পাওয়া যায় না, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো হচ্ছে।

অনেক ধরনের পরিবর্তনও আসছে। যেমন এখন পণ্য যেকোনো সময় অনলাইনে অর্ডার করা যায়। এছাড়া আমরা টেলিমেডিসিন নিয়ে কাজ করছি। আমরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মাধ্যমে একটি ভিন্ন ধরনের টেলিমেডিসিন সেবা চালু করার পরিকল্পনা করছি, যেখানে শুধু সাধারণ পরামর্শ নয়, বিশেষজ্ঞের মতামত পাওয়া যাবে। এটি সাধারণ মানুষের জীবনে স্পর্শ করার একটি বড় বিনিয়োগ। আমাদের কার্যক্রমগুলোয় এ ধরনের প্রযুক্তিগত সংগতি আয়ত্তে আনা ছাড়া আমরা এগিয়ে যেতে পারব না।

বাংলাদেশকে একটি টেকসই ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

বেসরকারি খাতের প্রধান ভূমিকা থাকা উচিত। এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে অন্য কিছু নয়, শুধু নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। যারা এসব নীতি নিয়ে কাজ করেন, বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের অন্ততপক্ষে একটি ইতিবাচক মনোভাব থাকা দরকার।

সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো বিশেষ বার্তা আছে কি?

না, তেমন কোনো বিশেষ বার্তা নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ। আমি মনে করি আমাদের ছেলেমেয়েদের যদি একটু উৎসাহ দিতে পারি, সঠিক সুযোগ যদি আমরা দিতে পারি এবং উপযুক্ত উপকরণ যদি তাদের হাতে তুলে দিতে পারি, তাহলে ওরাই জানে যে কীভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এটা এমনভাবে করতে হবে যাতে সবাই উপকার পায়।

যারা সরকারে আছেন, আমাদের তাদের বিশ্বাস করতে হবে। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তারাও দুদিনের মধ্যে পাল্টে গিয়ে সবাইকে চোর বা খারাপ ভাবার যে মনোভাব, তা ঠিক নয়। খারাপ-ভালো সবাইকে নিয়েই একটা দেশ। এটা একটা দেশের ক্ষেত্রে যেমন, আবার একটা পরিবারেও এমনই থাকে। সবাইকে অবিশ্বাস করা ঠিক না। দেশে ও বিদেশেও অনেক ভালো মানুষ আছেন যারা দেশকে ভালোবাসেন। এদের সবাইকে একটি প্লাটফর্মে আনতে হবে।

যারা দেশ চালাবেন, তাদের কাছে অনুরোধ একটি প্লাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে সন্দেহ ও অবিশ্বাস কম থাকবে এবং নিয়মিত মিথস্ক্রিয়া হবে।