আপনি ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেয়ার পর আপনার মূল অগ্রাধিকার কী ছিল?
দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আমার লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম বন্দরকে দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব করা। এজন্য বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম হাতে নিই। এক বছরের মধ্যেই এর সুফল পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর আজ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক বন্দরে পরিণত হয়েছে।
এক বছরে বন্দরের উন্নয়ন সূচকগুলো কতটা বদলেছে?
সব সূচকই ঊর্ধ্বমুখী। কনটেইনার ভেসেলের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম আগস্ট ২০২৪-এ যেখানে ছিল ২ দশমিক ৮১ দিন, আগস্ট ২০২৫-এ নেমে এসেছে ২ দশমিক ৬৬ দিনে। ওয়েটিং টাইম ৪ দশমিক ৯১ দিন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫৬ দিনে। বর্তমানে অনেক ভেসেলের ওয়েটিং টাইম দুইদিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ডুয়াল টাইমও কমে এসেছে। এর ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। একটি জাহাজের অতিরিক্ত অবস্থানে দৈনিক প্রায় ১৫ হাজার ডলার খরচ হয় এখন সেটা কমেছে।
বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে বিনিয়োগ ও পরিচালনার জন্য বিদেশী অপারেটর নিয়োগ নিয়ে দেশে জোর বিতর্ক চলছে। এনসিটিতে বিদেশী অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া সরকার প্রায় এগিয়ে এনেছে। এর বাইরে বন্দরে নতুন আরো তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্যও বিদেশী অপারেটর নিয়োগের কাজ চলছে। এনসিটি নিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী, শ্রমিক সংগঠন, এমনকি রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তাদের যুক্তি হলো, এনসিটিতে জেটি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি বসানোসহ বিভিন্ন কাজে বন্দর এরই মধ্যে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি ব্যয় করেছে।
এখানকার মূল যন্ত্রপাতি (গ্যান্ট্রি ক্রেন) আরো ২০-২২ বছর কার্যকর থাকবে, তাই আগামী দুই দশকে নতুন করে বড় কোনো বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
আমরা যখন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলি, তারা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ট্যারিফ কাঠামো পরিবর্তনের কারণে তারা এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন অর্ডার পাচ্ছেন। এর প্রভাবে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই আমদানিতে চাপ বাড়বে। আবার রফতানির ক্ষেত্রেও এক বছরের মধ্যে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশী অপারেটররা এলে তারা তাদের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে টার্মিনাল পরিচালনা করবে। আমরা যদি স্থানীয়ভাবে সেই মানে পৌঁছতে চাই, তাহলে বছরের পর বছর লেগে যাবে। কিন্তু গ্লোবাল অপারেটররা শুরু থেকেই তাদের বেস্ট প্র্যাকটিস এখানে প্রয়োগ করবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এ আন্তর্জাতিক অপারেটররা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরাসরি কাজ করে। যেমন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি মায়েরস্ক লাইনের সঙ্গে কাজ করছে। ফলে বাংলাদেশে বিদেশী অপারেটররা টার্মিনাল পরিচালনা করলে শুধু বন্দরের দক্ষতা বাড়বে না, বরং বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীও এখানে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে আগ্রহী হবেন।
বাংলাদেশের বন্দরে বেসরকারি খাতে প্রথম বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের (আরএসজিটি) মাধ্যমে। বিদেশী এ অপারেটরের অধীনে চট্টগ্রাম পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে ১৪ মাস আগে। এ সময়ের পারফরম্যান্সকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম টার্মিনাল, যেটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) আওতায় দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনার জন্য দেয়া হয়েছে। এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, আরএসজিটির সঙ্গে গত বছরের ১৬ মে আমরা যে চুক্তি করেছি, তাতে তাদের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড নির্ধারণ করা আছে। তাদের বিদেশ থেকে আনা গ্যান্টিক্রেনগুলো পতেঙ্গা টার্মিনালের জন্য কাস্টমাইজ করে তৈরি করতে হয়, আর এতে স্বাভাবিকভাবেই দুই বছর সময় লাগে। শুধু ইকুইপমেন্টই নয়, বন্ড লাইসেন্স পাওয়া, স্ক্যানার বসানোসহ নানা প্রশাসনিক ও কারিগরি বিষয়ও মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমরা নিজে উদ্যোগ নিয়ে স্ক্যানার স্থাপনের কাজ এগিয়ে দিয়েছি। ফলে এখন জাহাজ থেকে আমদানি কনটেইনার খালাস করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে তারা সাউথ কনটেইনার ইয়ার্ড প্রস্তুত করছে, যেখানকার ইকুইপমেন্টও চলে এসেছে। ইয়ার্ডটি পুরোপুরি প্রস্তুত হলে ডেলিভারি আরো সহজ হবে, আর বিদ্যমান জটিলতাও কেটে যাবে। পাশাপাশি সেখানকার সিএফএস সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। মালবাহী গাড়িগুলো এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যেতে পারবে। এতে টার্মিনালের কার্যক্রম হবে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। আমরা আশা করছি, আগামী মে মাস থেকেই আরএসজিটি পূর্ণ সক্ষমতায় টার্মিনাল পরিচালনা করবে। তারাও আমাদের এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। তবে যদি মে মাসের পরও তারা পূর্ণ সক্ষমতায় না আসে, তখন সমালোচনার যৌক্তিক কারণ তৈরি হবে। আমার মতে, এ মুহূর্তে ধৈর্য ধরা জরুরি। কারণ তারা এখানে বিনিয়োগ করেছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে। তাদের ব্যবসা যত বাড়বে, চট্টগ্রাম বন্দরেরও লাভ তত বাড়বে।
বে টার্মিনাল প্রকল্প ও মাতারবাড়ী প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বলুন?
বে টার্মিনালের কনটেইনার টার্মিনাল–১ ও ২ নির্মাণে পিপিপি অংশীদার হিসেবে কাজ করছে পিএসএ সিঙ্গাপুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ড। প্রকল্পের ডিপিপি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটির প্যাকেজ-১-এর আওতায় দুটি জেটি নির্মাণের জন্য জাপানিজ প্রতিষ্ঠান পেন্টাওশান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ও টোয়া করপোরেশনের সঙ্গে আমাদের এরই মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এটা আমি বলব, দেশের ইতিহাসে সমুদ্রকেন্দ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা যুগান্তকারী ঘটনা। এছাড়া লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পে আইএফসিকে ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পর তারা কারিগরি ও আর্থিক প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এখন প্রতিবেদনের ওপর নেগোসিয়েশন চলছে।
সম্প্রতি করাচি–চট্টগ্রাম সরাসরি রুট চালু হয়েছে। এর গুরুত্ব আসলে কতটা?
এর আগে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য করতে হলে জাহাজকে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো হয়ে আসতে হতো। সরাসরি করাচি রুট চালু হওয়ায় খরচ ও সময় দুটোই কমছে। এরই মধ্যে দুবাই থেকে করাচি হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ এসেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ বাড়ছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক সঞ্চয়ের চিত্র কেমন?
চট্টগ্রাম বন্দরের এখন ৭ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর আকারে জমা আছে। আর্থিক সাশ্রয়ের বেশকিছু দৃষ্টান্ত আছে। যেমন বে-টার্মিনালের জন্য জমি বন্দোবস্তে প্রায় ৪ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণে সুদের হার ৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামাতে সক্ষম হয়েছি। এতে ৬ হাজার ৮১১ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। লালদিয়া প্রকল্পে নেগোসিয়েশনের প্রাথমিক পর্যায়েই ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় নিশ্চিত হয়েছে।
সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর সর্বোচ্চ কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং রেকর্ড গড়েছে। এর পেছনের কী ধরনের কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন?
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি টন, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার টিইইউএস, প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের বেশি এবং এটি গত ৪৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অবকাঠামো উন্নয়ন, অপারেশনাল দক্ষতা এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার ফলেই এ রেকর্ড এসেছে।
নিলামযোগ্য পণ্য বছরের পর বছর পড়ে থাকার অভিযোটিও পুরনো। বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা কনটেইনার ও গাড়ি অপসারণে আপনি কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
এ পর্যন্ত ১২৯ টিইইউএস ধ্বংসযোগ্য পণ্য ধ্বংস করা হয়েছে, ২৪৮ টিইইউএস নিলামে বিক্রি হয়েছে। বন্দরের ইয়ার্ড থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে পড়ে থাকা ৩৯৭টি গাড়ি অপসারণ করেছি। নিলামযোগ্য প্রায় ১০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার অপসারণের কাজ চলছে। এতে ইয়ার্ড স্পেস মুক্ত হয়েছে, কার্যক্রম গতি পেয়েছে।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত করেছেন?
প্রতিটি ক্রয়ে পিপিআর বিধিবিধান কঠোরভাবে প্রতিপালন করেছি। এতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সরকারি অর্থ সাশ্রয় হয়েছে। আগের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছি। এখন চট্টগ্রাম বন্দর একটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। বন্দর নিয়ে যে সাফল্য আমরা এনেছি এক বছরের কম সময়ে এসব অর্জন কিছু স্বার্থান্বেষী মহলকে ঈর্ষান্বিতও করেছে। দেশের অগ্রগতি ঠেকাতে তারা ষড়যন্ত্র করছে। এজন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি কতটা উন্নত হয়েছে?
বিশ্বব্যাংক ও জাইকার সঙ্গে আমাদের চুক্তি ও চলমান প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বন্দরের হ্যান্ডলিং ও রাজস্ব আয়ের প্রশংসা করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে আপনার লক্ষ্য নিয়েও জানতে চাই, আগামীতে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা আরো বাড়ানো, আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে এটিকে গড়ে তোলা এবং বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য।










