বিশ্ব ওআরএস দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ডায়রিয়া প্রতিরোধ ও মৃত্যুহার কমাতে ওরস্যালাইন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে?

আশির দশকে ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতার কারণে শিশুমৃত্যুর হার ছিল সবচেয়ে বেশি। একটি সাধারণ ডায়রিয়া অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠত শুধু শরীরের পানি ও প্রয়োজনীয় লবণের ঘাটতির কারণে। কিন্তু ওরস্যালাইনের সহজলভ্যতা এবং এর সঠিক ব্যবহার সেই বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে। আজ ওরস্যালাইনের সহজপ্রাপ্যতা ও কার্যকর ব্যবহারের ফলে ডায়রিয়াজনিত শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে এসএমসি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ওরস্যালাইন উৎপাদক, যা বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ খাওয়ার স্যালাইনের চাহিদা পূরণ করে।

এক্ষেত্রে এসএমসির অবদানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বাংলাদেশে ওরস্যালাইনকে শুধু একটি স্বাস্থ্যপণ্য হিসেবে নয়; বরং একটি জীবনরক্ষাকারী সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে এসএমসির দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা রয়েছে। আমরা শুরু থেকেই দুটি বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিয়েছি। প্রথমত, মানুষকে সচেতন করা যে ডায়রিয়াকে অবহেলা করা যাবে না এবং দ্রুত ওরস্যালাইন ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ওরস্যালাইনকে এমনভাবে সহজলভ্য করা যাতে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের একজন মানুষও প্রয়োজনের মুহূর্তে সহজেই এটি সংগ্রহ করতে পারেন।

আজ ওরস্যালাইন শুধু ফার্মেসিতে নয়, গ্রামের মুদি দোকান, বাজার কিংবা সাধারণ খুচরা দোকানেও পাওয়া যায়। ফলে মানুষকে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; উপসর্গ দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে ওরস্যালাইন ব্যবহার শুরু করতে পারে।

বর্তমানে ডায়রিয়ার পাশাপাশি শরীরের পানিশূন্যতা বা ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রেও ওরস্যালাইন ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে।

এসএমসি একটি অলাভজনক সামাজিক বিপণন প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান না হয়েও কীভাবে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কাজ করছে? মডেলটির বিশেষত্ব কী?

এসএমসির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের সামাজিক ব্যবসায়িক মডেল। আমরা প্রচলিত অর্থে দাতানির্ভর প্রতিষ্ঠান নই, আবার কেবল মুনাফাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও নই। আমাদের লক্ষ্য হলো ব্যবসার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন সৃষ্টি করা।

যেসব পণ্যে বাণিজ্যিকভাবে উদ্বৃত্ত আয় সম্ভব, সেগুলোর উন্নয়ন, বিপণন ও সম্প্রসারণে আমরা বিনিয়োগ করি। পরবর্তী সময়ে সে আয় আবার জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে পুনর্বিনিয়োগ করা হয়। অর্থাৎ ব্যবসার লাভ সমাজের মানুষের কাছেই ফিরে যায়।

এ দর্শন থেকেই আমরা ২০১৪ সালে এসএমসি এন্টারপ্রাইজ গড়ে তুলি, যাতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরো দক্ষভাবে পরিচালিত হয় এবং সে আয় দিয়ে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম টেকসইভাবে পরিচালনা করা যায়।

সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচি, বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে এসএমসি কী ধরনের সহযোগিতা করছে? সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বকে কীভাবে দেখছেন?

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। সরকারি, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও ও কমিউনিটি—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশে এখনো একজন মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ নিজেকেই বহন করতে হয়। অন্যদিকে সরকারেরও সীমিত সম্পদ রয়েছে। তাই জনস্বাস্থ্যকে আরো শক্তিশালী করতে কার্যকর অংশীদারত্বের বিকল্প নেই।

এসএমসি সরকারের স্বাস্থ্য কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং আমরা বিশ্বাস করি, দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বকে আরো সুসংহত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হবে সহযোগিতাভিত্তিক, আর সেই যাত্রায় এসএমসি একটি দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে কাজ করে যেতে চায়।

ওরস্যালাইনের পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসএমসি বর্তমানে কী কী সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে? পুষ্টি, নিরাপদ মাতৃত্ব ও নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে কোন কর্মসূচিগুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

মা ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়ন এসএমসির অন্যতম অগ্রাধিকার। বর্তমানে দেশের ১৫৩টি উপজেলায় আমাদের কমিউনিটি পর্যায়ের কর্মীরা গর্ভবতী মায়েদের শনাক্ত করে প্রসব-পূর্ব সেবা, ঝুঁকি নিরূপণ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সহায়তা করছেন, যা মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখছে।

পাঁচ বছরের কম শিশুদের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে পাঁচটি ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ মনি বিস্কুট, কিশোর-কিশোরীসহ সবার জন্য মনি বিস্কুট প্লাস, গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাল্টিপল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্টস ‘ফুলকেয়ার’ ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট ‘ফরবোন’, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টিপণ্য নিয়ে আমরা দেশব্যাপী কাজ করছি। পাশাপাশি এসএমসির স্টার নেটওয়ার্কের স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের মাধ্যমে শিশুদের নিয়মিত গ্রোথ মনিটরিং পরিচালনা করা হচ্ছে।

ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনায়ও আমরা শুধু ওরস্যালাইন নয়, ওরস্যালাইনের পাশাপাশি জিংক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ এ সমন্বিত চিকিৎসা শিশুর দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডায়রিয়ার ঝুঁকিও কমাতে সহায়ক। পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসচেতনতায়ও এসএমসি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যপণ্য ও সেবা পৌঁছে দিতে এসএমসি কী ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে? এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

এসএমসির মূল লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপণ্য ও সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। আর এ লক্ষ্যেই এসএমসি দেশের সর্বত্র গড়ে তুলেছে পাঁচটি স্টার নেটওয়ার্ক। আমাদের স্টার নেটওয়ার্ক সেবাদানকারীরা শুধু স্বাস্থ্যপণ্য সরবরাহই করেন না, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কেও সচেতনতা গড়ে তোলেন।

বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নই আমাদের সেবার আওতায় রয়েছে। ওরস্যালাইন, পরিবার পরিকল্পনাসামগ্রী, স্যানিটারি ন্যাপকিন, মনি বিস্কুটসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যপণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই কার্যক্রমের আর্থিক টেকসইতা। জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির বড় অংশই ভর্তুকিনির্ভর, তাই সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত সহযোগিতা নিশ্চিত করাই আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জনস্বাস্থ্যে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এ বাস্তবতায় এসএমসি ভবিষ্যতে কোন খাতে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়?

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। একসময় সংক্রামক রোগ ছিল সবচেয়ে বড় উদ্বেগ; এখন তার পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও জীবনযাপনজনিত নানা রোগ ক্রমেই বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। তাই ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে আরো বিস্তৃতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিও আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এখনো দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোরী অপুষ্টিতে ভোগে এবং অনেকের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয় এবং ২০ বছরের আগেই গর্ভবতী হয়ে যায়। এতে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই শুধু স্বাস্থ্যপণ্য নয়, আচরণগত পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা নিয়েও আমাদের আরো জোরালোভাবে কাজ করতে হবে।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে এসএমসির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা ভোগ করছে। তবে দুই-তিন দশকের মধ্যে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ও ধরনও পরিবর্তিত হবে। শুধু মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নয়, প্রবীণদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা, অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা ও সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এসএমসি সেই বাস্তবতা সামনে রেখে মানুষের জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

আমরা বিশ্বাস করি, জনস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানে দেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। তাই পরিবর্তিত সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন কর্মসূচি গ্রহণ এবং উদ্ভাবনী স্বাস্থ্যসমাধান নিয়ে কাজ করাই হবে এসএমসির আগামী দিনের অগ্রাধিকার।

স্বাস্থ্যসেবাকে আরো শক্তিশালী করতে সরকারি, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন? এ প্রক্রিয়ায় এসএমসি কী ভূমিকা রাখতে চায়?

জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারি, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগই একটি কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

এসএমসি সবসময় এ অংশীদারত্বে বিশ্বাস করে এবং ভবিষ্যতেও সরকারের স্বাস্থ্য উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে চায়। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যপণ্য সহজলভ্য করা ও কমিউনিটি পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমরা আমাদের অবদান আরো শক্তিশালী করতে চাই।

আমরা বিশ্বাস করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাংলাদেশের মানুষের জন্য আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিশ্ব ওআরএস দিবস উপলক্ষে দেশের মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কী?

বিশ্ব ওআরএস দিবস উপলক্ষে দেশের সব মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আমার অনুরোধ থাকবে, প্রতিটি পরিবারে সবসময় ওরস্যালাইন সংরক্ষণ করুন। শিশুর ডায়রিয়া হলে দেরি না করে ওরস্যালাইন খাওয়ানো শুরু করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওরস্যালাইনের পাশাপাশি জিংক নিশ্চিত করুন। শুধু শিশু নয়, কিশোর-কিশোরী, প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রবীণ—যেকোনো বয়সেই পানিশূন্যতা দেখা দিলে নির্দেশনা অনুযায়ী ওরস্যালাইন ব্যবহার করুন। পাশাপাশি নিরাপদ পানি পান, নিয়মিত হাত ধোয়া ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, সচেতনতাই পারে একটি সুস্থ পরিবার ও সুস্থ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: এবিএস ফরহাদ