স্বাধীনতা অর্জনের পর সদ্য জন্মপ্রাপ্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে ছিল নানা রকমের চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল স্বাস্থ্য খাত, বিশেষ করে শিশু স্বাস্থ্য।
আশির দশকের আগে ডায়রিয়া এ অঞ্চলে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তখন বাংলাদেশে মোট শিশুমৃত্যুর ৩০-৪০ শতাংশই ঘটত এই একটি রোগের কারণে। ১৯৮৩ সালে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক যৌথ জরিপ থেকে জানা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সবচেয়ে বড় ঘাতক ছিল ডায়রিয়া। এছাড়া পাঁচ বছরের নিচের প্রতিটি শিশু বছরে গড়ে তিন থেকে আটবার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতো এবং বছরে গড়ে প্রায় ২০ দিন এ রোগে ভুগত। সেই সময় শুধু এই একটি রোগেই বছরে প্রাণ হারাত প্রায় তিন লাখ শিশু।
ডায়রিয়া নানা কারণে হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ভিব্রিও কলেরি নামক জীবাণু সৃষ্ট বিশেষ ধরনের ডায়রিয়া, যা কলেরা নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। কলেরার সূত্রপাত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ অর্থাৎ এ বাংলা অঞ্চল থেকে। এরপর বৈশ্বিক মহামারী রূপে এটি ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে।
ঠিক এ ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ষাটের দশকে ঢাকায় গড়ে ওঠে কলেরা গবেষণার এক আন্তর্জাতিক কেন্দ্র—কলেরা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বর্তমান আইসিডিডিআর,বি)। ১৯৬৭-৬৮ সালে এ গবেষণা কেন্দ্রেই ডা. ডেভিড নালিন আর ডা. রিচার্ড ক্যাশের দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষার পর আবিষ্কার হয় যুগান্তকারী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএস। এ আবিষ্কারের গুরুত্ব এতটাই ছিল যে বিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেট ১৯৭৮ সালে একে অভিহিত করে ‘বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা আবিষ্কার’ হিসেবে। ১৯৮৫ সালে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গুণগত মান ও নিখুঁত পরিমাণ নিশ্চিত করে প্যাকেটজাত ওরস্যালাইন সর্বপ্রথম সমাজের সর্বস্তরে জনসাধারণের কাছে পৌঁছতে বাজারে নিয়ে আসে এসএমসি।
ওরস্যালাইন বিশুদ্ধ খাবার পানি, গ্লুকোজ, সোডিয়াম, পটাশিয়াম আর সাইট্রেটের মিশ্রণে তৈরি এক সাধারণ অথচ কার্যকর পানীয়। এ দ্রবণ অন্ত্রে সোডিয়াম ও পানি শোষণে সহায়তা করে, যার ফলে শরীরে তরল এবং ইলেকট্রোলাইট স্বাভাবিক হয়ে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফও এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে স্বল্প খরচে জীবন বাঁচানোর এক কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে।
১৯৯৮ সালে ডায়রিয়া মোকাবেলায় সরকারের অনুমোদনে ফার্মেসির গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য আউটলেটে ওরস্যালাইন বিক্রি ও গণমাধ্যমে ওরস্যালাইনের বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ হয়। নানাবিধ বিহেভিয়ারাল চেঞ্জিং (আচরণগত পরিবর্তন) কমিউনিকেশন ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে খুব দ্রুতই মানুষ এসএমসি ওরস্যালাইনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় ও এসএমসির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যায় জীবন রক্ষাকারী এ ওরস্যালাইন। ২০০৪ সালে আরো উন্নত ফর্মুলায় ওরস্যালাইন-এন নামে পণ্যটি বাজারে আনে এসএমসি। ময়মনসিংহের ভালুকায় গড়ে তোলা হয় একটি আধুনিক উৎপাদন কারখানা, যেখানে এখন বছরে তৈরি হয় প্রায় ১ বিলিয়নের বেশি স্যাশে। এ বিনিয়োগ আর নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতিও আসে একে একে: ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা সাত বছর ওরাল স্যালাইন ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে প্রিয় ব্র্যান্ডের সম্মাননা পায় এসএমসি ওরস্যালাইন। এমনকি ২০২২ সালে বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে সেরা ব্র্যান্ডের তালিকাতেও চতুর্থ স্থান অর্জন করে।

এ স্বীকৃতিগুলো শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের প্রতীক নয়, বরং প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে এসএমসির এ প্যাকেটজাত সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধানের সঙ্গে। ২০২৫ সালে ‘এসএমসি ওরস্যালাইন’ নামে নতুন প্যাকেজিং নিয়ে যাত্রা শুরু করে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জীবন রক্ষায় অবদান রাখা ব্র্যান্ডটি। বর্তমানে ২ লাখ ২০ হাজার ফার্মেসি ও ৬ লাখ ৩৬ হাজারেরও বেশি নন-ফার্মেসি আউটলেটে এসএমসির ওরস্যালাইন পাওয়া যায়। লুমিনারিজ রিসার্চ লিমিটেডের তথ্যমতে, বাংলাদেশের বাজারে মোট ওরস্যালাইনের ৯৩ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে এসএমসি।
১৯৮৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ৪১ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় এসএমসি সবসময় মানুষের পাশে ছিল। এ সময়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৫৫ বছর থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২.৩ বছরে, শিশু মৃত্যুহার কমেছে ৮৫ শতাংশ। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী ৭৬ শতাংশ শিশুকে ওরস্যালাইন বা ঘরোয়া দ্রবণ দিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। আর ৪৩ শতাংশকে দেয়া হয়েছে ওআরটি (ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি) ও জিংক।
ডায়রিয়া, কলেরা ও পানিস্বল্পতার বিরুদ্ধে এসএমসির এ দীর্ঘ লড়াই শুধু একটি পণ্য তৈরির গল্প নয়, এটি বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার এক নীরব অথচ শক্তিশালী বিপ্লবের গল্প, যা আজও প্রতিদিন কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে টিকে আছে।





