গত ২০০ বছরে বিশ্ব অন্তত সাতটি কলেরা মহামারীর মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমবারের মহামারীর সূত্রপাত হয়েছিল এ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলেই। পরবর্তী সময়ে তা ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে।
বাংলা বদ্বীপে কলেরার প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে গত শতকের ষাটের দশকে ঢাকায় গড়ে ওঠে কলেরা গবেষণার প্রতিষ্ঠান—কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (বর্তমানে আইসিডিডিআর,বি), যা পরে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তারা কলেরা নির্মূলে কাজ করতে শুরু করে। ফলাফল আসে ১৯৬৭-৬৮ সালে। ডা. ডেভিড নালিন ও ডা. রিচার্ড ক্যাশের দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয় যুগান্তকারী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএস। এ উদ্ভাবনের প্রভাব এমনই সুদূরপ্রসারী ছিল যে বিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেট ১৯৭৮ সালে একে ‘বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা আবিষ্কার’ হিসেবে অভিহিত করে। ওআরএস বিশ্বব্যাপী ডায়রিয়া, কলেরা ও পানিস্বল্পতা থেকে ৭ কোটি জীবন রক্ষা করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ উদ্ভাবনকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করার প্রয়াস চালিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে গুণগত মান ও নিখুঁত পরিমাণ নিশ্চিত রেখে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্যাকেটজাত ওরস্যালাইন সর্বপ্রথম সমাজের সর্বস্তরের জনসাধারণের কাছে পৌঁছাতে বাজারে নিয়ে আসে এসএমসি।
কোটি মানুষের জীবন রক্ষাকারী এ প্রতিষেধকের সাফল্য ও বৈশ্বিক স্বীকৃতির উদযাপন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব ওআরএস দিবস বা ওরস্যালাইন দিবস। প্রতি বছরই বিভিন্ন প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে পালিত হয় এ দিবস। এসব প্রতিপাদ্যের লক্ষ্য থাকে ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুহার কমাতে ওআরএসের কার্যকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্ব তুলে ধরা।
আমাদের দেশে একসময় ডায়রিয়া মানেই ছিল আতঙ্ক। কলেরা-ডায়রিয়া মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ত এবং চিকিৎসার অভাবে অনেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। কলেরার প্রকোপে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাওয়া আজ শুধুই গল্পে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৮০-এর দশকের আগে বছরে তিন-চার লাখ শিশু প্রাণ হারাত শুধু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। ১৯৮৩ সালে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক যৌথ জরিপ থেকে জানা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সবচেয়ে বড় ঘাতক রোগ ছিল ডায়রিয়া। পাঁচ বছরের নিচের প্রতিটি শিশু বছরে গড়ে তিন থেকে আটবার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতো এবং শিশুমৃত্যুর ৩০-৪০ শতাংশই ঘটত ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রকোপে। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে নাটকীয়ভাবে। একটি মাত্র প্যাকেটেই গ্লুকোজ, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও সাইট্রেটের সঠিক ও প্রয়োজনীয় অনুপাতে তৈরি হওয়া এক যুগান্তকারী ওষুধ ওআরএস, যা জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে বিপ্লব ঘটিয়েছে।
ওআরএস হলো পরিষ্কার পানি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড, সাইট্রেট ও গ্লুকোজের নির্দিষ্ট অনুপাতে তৈরি হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত একটি দ্রবণ। এর প্রধান কাজ হলো ডায়রিয়া, বমি, অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া পানি ও ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করা। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সুপারিশকৃত লো-অসমোলারিটি ওআরএসের ফর্মুলা হলো ৭৫ মিলিমোল গ্লুকোজ, যা অন্ত্রে সোডিয়াম ও পানি শোষণে সহায়তা করে; ৭৫ মিলিমোল সোডিয়াম, যা শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করে; ২০ মিলিমোল পটাশিয়াম, যা পটাশিয়ামের ঘাটতি পূরণ করে; ৬৫ মিলিমোল ক্লোরাইড, যা শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে ও ১০ মিলিমোল সাইট্রেট, যা মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস কমাতে সাহায্য করে। উল্লিখিত উপাদানসংবলিত এ দ্রবণ বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করলে মানব অন্ত্রের কোষে পরিবহনকারী প্রোটিন সক্রিয় হয়। এছাড়া শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করে, যা অন্য কোনো পানীয় বা ফলের রস থেকে পাওয়া যায় না।
শরীরে পানির ঘাটতি, পানিশূন্যতা যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। তবে বয়স ও পরিস্থিতিভেদে কিছু মানুষ এ ঝুঁকিতে বেশি থাকে। এর মধ্যে অল্পবয়সী শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যেহেতু তাদের শরীরে পানির পরিমাণ কম থাকে, তাই পানির সামান্য তারতম্য ঘটলেই বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের তৃষ্ণানুভবের ক্ষমতা কমে যায় এবং শরীরে পানি ধরে রাখার সক্ষমতাও লোপ পায়। ফলে বয়স্করা অতিরিক্ত গরম বা ডায়রিয়াজনিত কারণে খুব সহজেই ডিহাইড্রেশনে ভোগেন। ওআরএস গ্রহণ করলে তাদের স্বাস্থ্যজনিত ঝুঁকি কমে যায়।
বর্তমান সময়ে তাপপ্রবাহ অতি পরিচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। এ সময়ে অতিরিক্ত গরমে ঘামের সঙ্গে মানুষের শরীর থেকে লবণ ও পানি বেরিয়ে যায়। ফলে শরীর ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ওআরএস শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে।
ডায়রিয়া ও কলেরাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর অন্যতম পথ্য হলো ওরস্যালাইন। কেননা এটি শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া পানির ক্ষতি পুষিয়ে দ্রুত শরীরের ক্লান্তি রোধ করে এবং প্রয়োজনীয় মিনারেলের পুনর্গঠনে সহায়তা করে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত দুই বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ৫০-১০০ মিলিলিটার, ২ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর জন্য প্রতিবার ১০০-২০০ মিলিলিটার এবং ১০ বছরের বেশি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রয়োজন অনুযায়ী বারবার ওআরএস পান করতে পারেন। তবে স্যালাইনের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি সতর্কতা হলো স্যালাইন বানানোর ১২ ঘণ্টা পর আর তা খাওয়ানো যাবে না।
১৯৮৫ সালে এসএমসি বাংলাদেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ওরস্যালাইন বাজারজাত শুরু করে। ১৯৯৮ সালে সরকারি অনুমোদন প্রাপ্তির মাধ্যমে শুধু ফার্মেসিতেই নয়, বিভিন্ন সাধারণ দোকানেও সহজলভ্য হয় এ পণ্য। ২০১৯ সালে ওরাল স্যালাইন ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে প্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এসএমসি এবং ২০২২ সালে বাংলাদেশের সামগ্রিক সেরা ব্র্যান্ড ক্যাটাগরিতে চতুর্থ স্থান অর্জন করে।
ইতিহাসের অনেক বড় বড় আবিষ্কারের গল্প আমরা প্রায়ই শুনি। কোটি মানুষের জীবন বদলে দেয়া এমন এক ইতিহাস রচিত হয়েছে আমাদের সামনেই—ওরস্যালাইন উদ্ভাবন। বিজ্ঞান, গবেষণা ও সামাজিক সচেতনতার এক সম্মিলিত গল্প এ ওরস্যালাইন। যে গল্পে আমরা দেখতে পাই কীভাবে একটি ছোট্ট স্যাশে জনস্বাস্থ্যের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছে।





