মো. আবদুর রাজ্জাক, দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেডিকেল ডিভাইসেস অ্যান্ড সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্সের সাধারণ সম্পাদকও তিনি। জেএমআই গ্রুপের ২৫ বছরের যাত্রায় দেশের স্বাস্থ্য খাতে এসেছে হাজার কোটি টাকার সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ। দেশ-বিদেশে বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে জেএমআই। জেএমআই গ্রুপ প্রতিষ্ঠা, দুই যুগের বেশি সময়ের পথচলা এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের নানা বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন মো. আবদুর রাজ্জাক

স্বাস্থ্য খাতে জেএমআইয়ের পথচলার গল্প জানতে চাই।

আমাদের পথচলার শুরুটা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং, কারণ তখন প্রায় পুরো দেশজুড়েই চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর ছিল। সেই পরিস্থিতিতে, আমি ১৯৯৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে জেএমআই বাংলা কোম্পানি লিমিটেড (বর্তমানে জেএমআই সিরিঞ্জেস অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস লিমিটেড) নামে সিরিঞ্জ উৎপাদন কারখানা প্রতিষ্ঠা করি। তখন আমাদের কর্মী সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ জন। পরবর্তী দুই যুগের পথযাত্রায়, জেএমআই গ্রুপে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ও চীন থেকে। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি আমাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ হয়েছে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি), আবাসনসহ নানা খাতে। বর্তমানে জেএমআই গ্রুপের অধীনে ৪৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে কাজ করছে প্রায় সাড়ে আট হাজার কর্মী। আমাদের বিভিন্ন কারখানায় ৪০০টিরও বেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও স্বাস্থ্যসেবা পণ্য তৈরি করছি, যার মধ্যে অন্তত ৫০টি পণ্য এ দেশে প্রথমবারের মতো প্রস্তুতকৃত।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নে জাপানের নিপ্রো করপোরেশন আপনাদের কীভাবে সহায়তা করছে?

২০১১ সালে, জাপানের নিপ্রো করপোরেশন আমাদের সঙ্গে অংশীদারত্বে আসে, এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে উন্নতির জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করে। নিপ্রোর সঙ্গে এ যাত্রায়, তারা আমাদের বিভিন্ন প্রকল্পে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। শুরুতে শুধু চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির ক্ষেত্রে কাজ শুরু করলেও এখন নিপ্রো আমাদের সঙ্গে ওষুধ উৎপাদন এবং পণ্য বিপণনের দিকেও জোর দিচ্ছে। আমরা গর্বিত যে নিপ্রো-জেএমআই যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কভিড-১৯ প্রতিরোধে আমাদের তৈরি অটোডিজেবল সিরিঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। নিপ্রো-জেএমআই ব্র্যান্ডটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ও সম্মানিত একটি নাম।

জেএমআইয়ের সাফল্যের নেপথ্যে কী?

সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো আমাদের গুণগত মানের প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতি। প্রথম থেকেই আমরা স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের মান নিয়ে আপসহীন থেকেছি। চিকিৎসক ও নার্সদের মতো স্বাস্থ্যসেবার প্রথম সারির কর্মীদের কাছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ করতে আমরা সবসময় সচেষ্ট ছিলাম। আমাদের করপোরেট স্বচ্ছতা ও ব্যবস্থাপনা নীতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে বিদেশী অংশীদাররা আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তারা আমামদের ওপর আস্থা রেখেছেন, যার ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছে জেএমআই।

চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর জন্য আপনার পরামর্শ কী?

জেএমআইয়ের বিভিন্ন কারখানায় ৪০০টিরও বেশি ডিভাইস তৈরি করছি আমরা। এর মধ্যে পাঁচটি ডিভাইস ৪০টি দেশে রফতানি শুরু করেছি। তবে এটা সত্যিই হতাশাজনক যে বাংলাদেশের চিকিৎসা সরঞ্জাম বাজার এখনো আমদানিনির্ভর। দেশের চাহিদার মাত্র ৮ শতাংশ আমরা স্থানীয়ভাবে পূরণ করতে পারছি, বাকি ৯২ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ এ খাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও রফতানির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ২৫ হাজার কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম বাজার রয়েছে, যা প্রতি বছর ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এ অবস্থায় দেশের টাকা দেশে রাখতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগকে চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশে ওষুধ শিল্পের বিকাশে যেমন সরকারি নীতিসহায়তা দেয়া হয়েছে, একইভাবে চিকিৎসা সরঞ্জামকে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির যে নীতিমালা রয়েছে, সেগুলো হালনাগাদ করতে হবে, দক্ষ মানবসম্পদ বাড়াতে হবে এবং অসম বাজার প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। কেননা সরকারের তরফ থেকে চাহিদামতো সমর্থন পেলে দেশের অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এ খাত।