বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ। ১৯৯৯ সালের কথা। সেই সময় মুনাফা বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তাদের বেশি ঝোঁক ছিল পোশাক শিল্পে। অথচ বাংলাদেশের এক জাপান-ফেরত ব্যক্তি বিনিয়োগ করলেন দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আর সুরক্ষায়। চারদিকে আমদানি করা বিদেশী পণ্যের ভিড়ে এ বিনিয়োগ যে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তা খুব সহজেই অনুমেয়। তবুও মাত্র ৫০ জন কর্মী আর তিনটি পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় স্থাপন করেন চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনের কারখানা। এরপর পেরিয়েছে ২৫ বছর। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রবাস-ফেরত উদ্যোক্তা এখন দেশের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন খাতের অন্যতম সফল ব্যক্তি। তার প্রতিষ্ঠানের নাম উজ্জ্বল দেশ-বিদেশে।

প্রতিষ্ঠানটির নাম জেএমআই গ্রুপ। প্রতিষ্ঠাতা মো. আবদুর রাজ্জাক। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে নীরবে বিপ্লব ঘটানো একটি শিল্প গ্রুপ জেএমআই। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সাফল্য, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উচ্চ মানের পণ্য উৎপাদনে নিবেদিত মনোভাব—সবকিছুই জেএমআইকে বাংলাদেশের গর্বিত নামগুলোর তালিকায় স্থান করে দিয়েছে।

স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল জেএমআই সিরিঞ্জেস অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস লিমিটেড দিয়ে, ১৯৯৯ সালে। যুক্তরাজ্যের স্টার সিরিঞ্জের প্রাযুক্তিক সহায়তায় জেএসএমডিএল টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার হওয়া বিশেষায়িত সিরিঞ্জ—অটোডিজেবল (এডি) সিরিঞ্জ—উৎপাদনে সক্ষম একমাত্র প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআর,বি, ইপিআই, ফ্যামিলি প্ল্যানিং ডিরেক্টরেট, বিএসএমএমইউ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এ প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত পণ্য নিয়মিত ব্যবহার করে। পাশাপাশি নিয়মিত রফতানি হয় বিদেশেও।

করোনাকালে একক দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশব্যাপী করোনা প্রতিরোধী টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যবহার হওয়া সিরিঞ্জের বেশির ভাগই সরবরাহ করেছে জেএমআই সিরিঞ্জেস অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস লিমিটেড। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সাল থেকে সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) নিরবচ্ছিন্নভাবে সিরিঞ্জ সরবরাহ করে আসছে। বিগত ১৯ বছর ধরে দেশে একদিন থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের টিকাদানে ব্যবহৃত সব সিরিঞ্জ সরবরাহ করেছে জেএমআই সিরিঞ্জেস অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস লিমিটেড।

২০১১ সালে জাপানের বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নিপ্রো করপোরেশনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ব্যবসা শুরু করে দেশীয় শিল্প গ্রুপ জেএমআই। লক্ষ্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের মানোন্নয়ন। এরপর গত ১৪ বছরে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিদেশী বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপিত হয়েছে নিপ্রো-জেএমআইয়ের যৌথ বিনিয়োগ। এ যৌথ উদ্যোগটি চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে। পরে স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ তৈরি এবং স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট পণ্য বিপণন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে। নিপ্রো-জেএমআইয়ের যৌথ বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোয় উৎপাদিত পণ্য নিয়মিত রফতানি হচ্ছে এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকাসহ বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে।

নিপ্রো-জেএমআই যৌথ বিনিয়োগের আরেক প্রতিষ্ঠান নিপ্রো জেএমআই কোম্পানি লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে। শতভাগ রফতানিমুখী চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী এ প্রতিষ্ঠানে ব্লাড টিউবিং সেট এবং কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহার হওয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উৎপাদন হয়।

জেএমআই গ্রুপের সঙ্গে জাপানের নিপ্রো করপোরেশনের যৌথ বিনিয়োগে স্থাপিত আরেক প্রতিষ্ঠান নিপ্রো জেএমআই ফার্মা লিমিটেড। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প খাতে প্রথম জাপানি বিনিয়োগে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান এটি। নিপ্রো জেএমআই ফার্মা ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রে সবসময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসের (সিজিএমপি) নির্দেশনা মেনে চলে। বাংলাদেশের কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান সরাসরি তদারক ও নজরদারি করে জাপানের নিপ্রো করপোরেশন।

দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় জাপানের নিপ্রো করপোরেশনের সঙ্গে জেএমআইয়ের যৌথ বিনিয়োগের আরেক প্রতিষ্ঠান নিপ্রো জেএমআই ডায়ালাইসিস সেন্টার। বিশ্বমানের অত্যাধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির সেবা দিতে রাজধানীর পান্থপথে স্থাপিত হয়েছে এ কিডনি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রটি। প্রশিক্ষিত নার্স এবং দেশের সেরা কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞরা জাপানের উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিডনি রোগীদের জন্য নিবিড় সেবা নিশ্চিত করেন এই কেন্দ্রে। সরকারের অভীষ্ট—একজন কিডনি রোগীও বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন না—অর্জনে গর্বিত অংশীদার হতে কাজ করে যাচ্ছে নিপ্রো জেএমআই ডায়ালাইসিস সেন্টার।

দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড। ২০০৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা করে। শুরু থেকেই এটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবার জন্য অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি তৈরিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। জেএমএইচআরএমএলের মূল লক্ষ্য বিশ্বমানের হাসপাতালে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ তৈরি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে খাপ খায়। জেএমআইয়ের প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে দেশে ৪০০টিরও বেশি মেডিকেল ডিভাইস তৈরি করেছে এবং এর মধ্যে ৫০টিরও বেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে উৎপাদিত।

এসব পণ্যের তালিকায় রয়েছে আইভি ক্যানুলা, বাল্ক নিডল, ব্লিস্টার ফিল্ম, ইনফিউশন সেট কম্পোনেন্টস, ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেট, ইউরিন ড্রেনেজ ব্যাগ, কেএন৯৫ মাস্ক, অটোক্লেভ ও স্কাল্প ভেইন সেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জাম। এ ধরনের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও রফতানি করা হয়। এছাড়া ক্যানুলা, অ্যালকোহল প্রেপ প্যাড, জীবাণুমুক্ত অপারেশন গ্লাভস, ফার্স্টএইড বক্স এবং আরো অনেক প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা সামগ্রী তৈরি হয় এ প্রতিষ্ঠানে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত মাস্ক, গ্লভসসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড। এরই মধ্যে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শরীফ আব্দুল হাকিম ও নড়াইল এক্সপ্রেস হাসপাতাল এবং নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত হয়েছে বিশ্বমানের কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার।

জেএমআইয়ের দীর্ঘ পথচলা ও সাফল্যের যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্প গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘বাংলাদেশে অর্থনীতি বড় হচ্ছে। সেই সঙ্গে জনসংখ্যাও বাড়ছে। এখানে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অনেক। আমাদের দায়িত্ব ও স্বপ্নই হলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন করা এবং একই সঙ্গে এ খাতের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত ডাক্তার ও নার্সসহ সব ধরনের মানুষকে সহযোগিতা করা। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে টেকসই ও বিশ্বসেরা করতে প্রচেষ্টার শতভাগ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমরা।’

তিনি আরো বলেন, ‘যখন আমরা এ ব্যবসা শুরু করি, তখন নানা বাধা মোকাবেলা করতে হয়েছে। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল, মান নিশ্চিতের ব্যাপারে আপসহীন থাকা। আমাদের এ লক্ষ্যই আমাদের সহযোগিতা করেছে একের পর এক বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে, আর জেএমআই গ্রুপ পরিচিতি পেয়েছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে। তাছাড়া জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনার মানেও সন্তুষ্ট আমাদের বিদেশী অংশীদাররা। আমরা দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবহার করে উচ্চ মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করে থাকি। আর এ কারণেই ২৫ বছর ধরে কেবল ব্যবসা পরিচালনাই করিনি, একের পর এক সম্প্রসারণ করতে পেরেছি। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষায় আমাদের এ যাত্রা সামনেও অব্যাহত থাকবে ইনশা আল্লাহ।’