কোনো ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করার আগে জানতে হয় পৃথিবীব্যাপী এ খাতে কী হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এবং আমাদের দেশে এর অবস্থা কেমন। এসব বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেশের যেসব ইন্ডাস্ট্রির আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা করার সুযোগ আছে তার মধ্যে ফার্মাসিউটিক্যাল অন্যতম। আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে দক্ষ জনবলও আছে। সরকারি ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছরই অনেক ফার্মাসিস্ট, রসায়নবিদ ও ইঞ্জিনিয়ার বের হচ্ছেন।

একটি ইন্ডাস্ট্রি মানে মেশিন ও কাঁচামাল ব্যবস্থাপনা, সেখানে কারিগরি জ্ঞানসমৃদ্ধ ভালো প্রকৌশলী, রসায়নবিদ ও ফার্মাসিস্ট লাগবে যাদের উৎপাদন কৌশল সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা আছে। আমাদের ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার গ্রুপের কৃষি রসায়ন শিল্পে দুই যুগের অধিককালের অভিজ্ঞতা আছে, সফলতার

ইতিহাস আছে। এসব দিক বিবেচনা করে আমরা ২০১৫ সালে ফার্মা ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করি। প্রায় একই জাতীয় শিল্পের সঙ্গে আমি যেহেতু সম্পৃক্ত ছিলাম ও আছি, তাই আমার মনে হয়েছে আমাদের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হলে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির মতো বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ করা দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধের চাহিদা ও সরবরাহের মাঝে গ্যাপ আছে। আমাদের দেশে উৎপাদিত ওষুধের গুণগত মান ভালো, তাই আমরা ফার্মা ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করেছি। আমার বিশ্বাস আগামীতে বাংলাদেশের পরিচয় হবে ওষুধ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে।

কারখানা মানেই হলো কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকের প্রয়োজন। আমি নিজে প্রকৌশলী বা ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারও না, তবে আমি একজন কৃষিবিজ্ঞানী এবং অর্থনীতির প্রাথমিক জ্ঞানের স্তরে আছি। ওষুধ উৎপাদনের কারিগরি জ্ঞান থেকে অনেক দূরে অবস্থান করলেও ব্যবসায় প্রশাসনে আমার পড়াশোনা করার সুযোগ হয়েছিল। সে কারণে আমাকে অনেকটাই নির্ভর করতে হয়েছে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকের ওপর। ব্যবসায় ‘ইন্ডাস্ট্রি অ্যাট্রাকটিভনেস’ বলে একটি শব্দ রয়েছে। আবার ‘লার্নিং কস্ট’ বলে আরেকটি শব্দ রয়েছে। ‘লার্নিং কস্ট’ অলয়েজ হাই। আপনি যখন নতুন কোনো কাজে হাত দেবেন সেখানে প্রাথমিক খরচ বেশি হবে। ফলে আমার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো বেশি ছিল। জনবলের কারণে সৃষ্ট যে ঝুঁকি তার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। এছাড়া ফ্যাক্টরি নির্মাণে নানা রকম কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে গিয়ে সময় বেশি লেগেছে। ইউটিলিটি সংযোগ পেতেও বেগ পেতে হয়েছে। তবে চেষ্টা ও সদিচ্ছা থাকলে কোনো কাজ অসম্পূর্ণ থাকে না, আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

ওয়ান ফার্মা আমরা যখন শুরু করেছি, ২০১৫ সালে, তখন চিন্তা করেছি আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রডাক্ট যাবে এবং দেশীয় বাজারে উচ্চ গুণগত মানের সাশ্রয়ী প্রডাক্ট দিয়ে আমরা এটাকে একদিন নেতৃত্ব দেব। বিনিয়োগকৃত অর্থ আপনার কতদিনে ফেরত আসবে, একটা ইন্ডাস্ট্রির শুরুতেই কিন্তু এর হিসাবটা করতে হয়। এটা যেহেতু একটি ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি, এখানে শুরুতেই অনেক বিনিয়োগ করলে আমাদের ব্রেক ইভেন (আয়-ব্যয় সমান) হতে সময় লাগত। আমরা বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং অংকটা খুব নিবিড়ভাবে করেছিলাম।

দেশের অনেক বড় বড় গ্রুপের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি আছে। আমাদের আগে বা পরে শুরু হয়েছে এমন অনেক ইন্ডাস্ট্রি নানা ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। সে জন্য আমরা শুরু থেকেই একটা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছি। বিনিয়োগের পরিমাণটা কী হবে, ফ্যাক্টরি সাইজটা আনুমানিক কী হবে এবং কোন সময় কোন জায়গায় যেতে হবে আগেই একটা রোডম্যাপ ঠিক করা হয়েছিল। আমরা সে বিবেচনায় শুরুতে অনেক বড় আকারে করিনি। আবার ফার্মাসিউটিক্যাল কিন্তু আপনি খুব ছোট করেও শুরু করতে পারবেন না। তাহলে কম্পিটিটরের অনেক পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন না। তাই আমরা এ ব্যবসা প্রয়োজনীয়তা বুঝে সে আকারেই শুরু করেছিলাম। বর্তমানে আমরা অ্যান্টিক্যান্সারের ড্রাগ উৎপাদনের দিকে যাচ্ছি। ফার্মাসিউটিক্যালের ভবিষ্যৎ বায়োলজিক্যাল প্রডাক্ট। বর্তমানে ক্যান্সারের যে চিকিৎসাটা হচ্ছে আগামীতে কিন্তু এর পরিবর্তন হবে।

ফার্মা ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগে অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি কিনতে অনেক টাকা লাগে। আমরা ব্যাংকের সহযোগিতা নিয়ে করেছি। দেশের খ্যাতনামা কয়েকটি ব্যাংক আমাদের গ্রুপের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আছে। আর যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত সাপ্লায়ারের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে। জিএমপি সার্টিফায়েড যন্ত্রপাতি আমদানি করে আনা হয়েছে।

ওয়ান ফার্মা একটি অত্যাধুনিক ও উন্নতমানের সমন্বিত ওষুধ উৎপাদন কারখানা। এ ফ্যাসিলিটি থেকে সলিড, লিকুইড, স্টেরাইল ও বায়োলজিক্যাল (অনকোলজিসহ) ওষুধ প্রস্তুতে এবং তার মান নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার হয় অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের ফ্লুইড বেড ড্রায়ার ৩০০এল; চীনের অটোমেটিক ক্যাপসুল ফিলিং মেশিন; কোরিয়ার ট্যাবলেট কোটিং মেশিন ১২০লি.; ভারতের ট্যাবলেট কম্প্রেশন মেশিন; কোরিয়ার ব্লিস্টার মেশিন; চীনের অটোমেটিক লিকুইড ফিলিং মেশিন; স্টিম জ্যাকেটেড ভেসেল; পাউডার ফিলিং মেশিন; মালয়েশিয়া, চীন ও ভারতের এইচভিএসি সিস্টেম ও ইনজেকশনে ব্যবহৃত ওয়াটার সিস্টেম; ভারতের ভায়াল ফিলিং, সিলিং, ক্যাপিং, লেবেলিং মেশিন; অ্যাম্পুল ফিলিং, সিলিং, লেবেলিং মেশিন; চীনের প্রিফিল্ড সিরিঞ্জ মেশিন; অটোক্ল্যাভ ৮০০লি. ও ৬০০লি; কম্বো ব্লিস্টার মেশিন; এয়ার কম্প্রেসার; বয়লার এক টন; মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব ফ্যাসিলিটি ইত্যাদি। এছাড়া ওষুধের যথাযথ মান ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয় জাপানের সব আধুনিক যন্ত্রপাতি। যেমন এইচপিএলসি, এফটিআইআর, কার্ল ফিশার, ইউভি স্পেক্ট্রোফটোমিটার, অ্যাটমিক অ্যাবজরপ্‌শন স্পেক্ট্রোফটোমিটার। নিকট ভবিষ্যতে আরো অত্যাধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল যন্ত্রপাতি আমদানির প্রক্রিয়ায় আছে, যা ওয়ান ফার্মাকে উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণে আরো উন্নত ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সাহায্য করবে।

ওয়ান ফার্মা লিমিটেডের কারখানা বগুড়া বিসিক শিল্প এলাকায় অবস্থিত। আমাদের চারটা ফ্লোর আছে, একেকটা প্রায় ১৭ হাজার বর্গফুট করে। দ্বিতীয় ফ্যাক্টরি যেটা আমরা করতে যাচ্ছি বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির পাশে। এটা পুরনো ফ্যাক্টরির চেয়ে কয়েক গুণ বড় জায়গা নিয়ে করা হচ্ছে, যা আমাদের দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনার ফসল। বর্তমানে ওয়ান ফার্মায় প্রায় দুই হাজারের মতো লোক কাজ করে।

সূচনালগ্ন থেকেই ওয়ান ফার্মা দেশের জনগণের জন্য বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদন করে আসছে। বর্তমানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে উৎপাদনে এসেছে নতুন মাত্রা। ফলে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও আমাদের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়মিত রফতানি হচ্ছে। আমাদের অ্যান্টিক্যান্সার প্লান্ট শিগগিরই চালু হবে। যদি সবকিছু ঠিক থাকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই ওয়ান ফার্মা দেশের অন্যতম প্রধান ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে।