বর্তমান বাজারে রেফ্রিজারেটরের চাহিদার ট্রেন্ড কেমন? গত বছরের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার কেমন দেখছেন?
বাংলাদেশের হোম অ্যাপ্লায়েন্স বাজারে বর্তমানে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ও প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে রেফ্রিজারেটর ও এসির ক্ষেত্রে চাহিদা এখন অনেক ভালো। বিশ্ববাজারে এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ৬-৭ শতাংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারে নানাবিধ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও খাতটিতে বার্ষিক ১০-১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে।
বর্তমান যুগের ক্রেতারা ফ্রিজ কেনার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন? (যেমন: বিদ্যুৎ সাশ্রয়, ডিজাইন, নাকি দীর্ঘস্থায়ী ওয়ারেন্টি)
বর্তমানে রেফ্রিজারেটরের বাজারে প্রধান ট্রেন্ড হলো পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ইনভার্টার প্রযুক্তির স্মার্ট ফ্রিজের দিকে গ্রাহকের প্রবল আগ্রহ। বিদ্যুতের উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতারা এখন ইনভার্টার প্রযুক্তির ফ্রিজ বেশি খুঁজছেন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম্প্রেসারের গতি নিয়ন্ত্রণ করে বিদ্যুৎ খরচ অনেক কমিয়ে দেয়। এনার্জি স্টার রেটিং দেখে ক্রেতারা এখন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী মডেলগুলো যাচাই করে নিচ্ছেন। ফ্রিজ একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হওয়ায় ক্রেতারা ব্র্যান্ডের আফটার সেলস সার্ভিস ও ওয়ারেন্টি পলিসিকে গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে কম্প্রেসারের ওপর ১০-১২ বছরের ওয়ারেন্টি ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণের বিষয়। স্মার্ট ফিচার ও আধুনিক ডিজাইন রান্নাঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে ফ্ল্যাট ডোর, গ্লাস ফিনিশ ও কিচেন স্পেসের সঙ্গে মানানসই ডিজাইনের ফ্রিজগুলো বেশ জনপ্রিয়। ফলে বর্তমানে ক্রেতারা এমন একটি ফ্রিজ খুঁজছেন যা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে, দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেবে এবং দৈনন্দিন জীবনকে আরো সহজ করবে। বর্তমান রেফ্রিজারেটর বাজারে গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় চাহিদা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও স্মার্ট ইনভার্টার রেফ্রিজারেটর। সেই চাহিদার কথা বিবেচনা করে কনকা ও হাইকো আধুনিক প্রযুক্তি ও স্মার্ট ফিচারসমৃদ্ধ বিভিন্ন মডেলের রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার বাজারে নিয়ে এসেছে। উন্নত ইনভার্টার টেকনোলজি কম্প্রেসারের গতি নিয়ন্ত্রণ করে কম বিদ্যুতে কার্যকর কুলিং নিশ্চিত করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খরচ অনেক কমে যায়। বর্তমান প্রজন্ম এখন শুধু কুলিং নয়, স্মার্ট ফিচার ও ডিজাইনকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। কনকা ও হাইকোর স্মার্ট ডিজিটাল ডিসপ্লে মডেলগুলোতে বাইরে থেকেই টেম্পারেচার কন্ট্রোল, সুপার ফ্রিজিং মোড, ভ্যাকেশন মোড, ডোর অ্যালার্ম সিস্টেম ও স্মার্ট এরর ডিটেকশনের মতো আধুনিক সুবিধা পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রিমিয়াম গ্লাস ডোর ডিজাইন, উন্নত ফিনিশিং ও স্টাইলিশ কিচেন ম্যাচিং লুক আধুনিক কিচেনের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তোলে। আধুনিক প্রযুক্তি, স্মার্ট ফিচার, আকর্ষণীয় ডিজাইন ও নির্ভরযোগ্য সেবার সমন্বয়ে কনকা ও হাইকো বর্তমানে স্মার্ট গ্রাহকদের অন্যতম পছন্দের ব্র্যান্ড হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
‘স্মার্ট হোম’ ধারণার সঙ্গে আধুনিক রেফ্রিজারেটরে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা ইনভার্টার প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আধুনিক ‘স্মার্ট হোম’ ধারণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেফ্রিজারেটরে ইনভার্টার প্রযুক্তির সংযোজন খাবার সংরক্ষণকে যেমন নিরাপদ ও সহজ করেছে, তেমনি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এমনকি কনকা ফ্রিজের দরজা খোলা থাকলে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা চলে আসে। ফলে এটি দৈনন্দিন জীবনকে অনেক ঝামেলামুক্ত করে। সাধারণ ফ্রিজের কম্প্রেসারগুলো একটি নির্দিষ্ট গতিতে চালু ও বন্ধ হয়, যা প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে। অন্যদিকে কনকা ও হাইকো ফ্রিজের ইনভার্টার প্রযুক্তির কম্প্রেসার প্রয়োজন অনুযায়ী এর গতি কম বা বেশি করতে পারে। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। স্মার্ট রেফ্রিজারেটর কেবল খাবার ঠাণ্ডা রাখার যন্ত্র নয়, বরং এটি একটি ‘স্বয়ংক্রিয় খাদ্যরক্ষ’ এবং ব্যক্তিগত সহকারী। যদিও এ প্রযুক্তিগুলোর কারণে আধুনিক ফ্রিজের দাম কিছুটা বেশি। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় এবং খাদ্যের অপচয় রোধের দিক থেকে এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কার্যকর একটি বিনিয়োগ।

ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী
বাংলাদেশে শতভাগ গ্রিন বা পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেটর উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো কতটুকু এগিয়েছে?
বাংলাদেশে শতভাগ পরিবেশবান্ধব (গ্রিন) রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে দেশীয় কোম্পানিগুলো অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশীয় কোম্পানিগুলো বাজারের ৯০ শতাংশেরও বেশি চাহিদাই পূরণ করছে এবং উৎপাদিত ফ্রিজগুলো সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। ওজোন স্তরের সুরক্ষায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব আর৬০০এ (আইসোবিউটেন) রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস এবং ফোম ব্লোয়িং এজেন্ট হিসেবে সাইক্লোপেন্টেন ব্যবহার করছে। দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর প্রায় প্রতিটি মডেলের ফ্রিজে ইন্টেলিজেন্ট ইনভার্টার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বিদ্যুতের ব্যবহার ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমায় এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। সামগ্রিকভাবে উৎপাদনে ক্ষতিকর গ্যাসের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করায় দেশে উৎপাদিত ফ্রিজগুলো পুরোপুরি সক্ষম হয়েছে।
তীব্র গরম এবং সাময়িক লোডশেডিংয়ে খাবারের গুণগত মান ঠিক রাখতে ফ্রিজগুলোতে কী ধরনের বিশেষ ব্যাকআপ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে?
তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের সময় খাবারের গুণগত মান ঠিক রাখতে কনকা ও হাইকো ফ্রিজগুলোতে বিশেষ কুলিং রিটেনশন ও ইনভার্টার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ না থাকলেও দীর্ঘক্ষণ ভেতরের ঠাণ্ডা ধরে রেখে খাবার ভালো রাখতে এ প্রযুক্তিগুলো কাজ করে। কনকা ও হাইকো ফ্রিজে তাপমাত্রা অনুযায়ী কম্প্রেসারের গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে বা সচল হলে এটি খুব কম শক্তি ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখে। কনকা ও হাইকো ফ্রিজের ভেতরে ও ফ্রিজারে থার্মাল প্যাড বা কুল প্যাক থাকে। লোডশেডিংয়ের সময় এ প্যাকগুলো বরফের মতো কাজ করে এবং টানা ১০-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ভেতরের তাপমাত্রা ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে। কনকা ও হাইকো ফ্রিজের হাই-ডেনসিটি ইনসুলেশন ফ্রিজের বডির পুরু ইনসুলেশন বাইরের গরম বাতাসকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়।
সামনেই ঈদুল আজহা। এ সময়ে ফ্রিজ ও ডিপ-ফ্রিজের বাজারকে ধরতে আপনাদের ব্র্যান্ডের বিশেষ প্রস্তুতি, নতুন মডেল এবং অফারগুলো কী কী?
আসন্ন ঈদ উপলক্ষে গ্রাহকদের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা বেশকিছু নতুন ডিজাইন ও মডেলের ফ্রিজ এ সময়ে বাজারে সরবরাহ করছি। ঈদ সামনে রেখে ১৫০ থেকে ৭৫০ লিটার পর্যন্ত বিভিন্ন সাইজের ডিজিটাল কন্ট্রোল চেস্ট ফ্রিজ আমাদের শোরুমে রয়েছে। আমাদের চেস্ট ফ্রিজে রয়েছে সুপার কুলিং মোড, যা খুব কম সময়ে দ্রুত অধিক ঠাণ্ডা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ -৩৩° সেলসিয়াস পর্যন্ত আলট্রা কুলিং সুবিধা খাবারের নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে। গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন পণ্য পাওয়ার জন্য দেশব্যাপী আমাদের সব নিজস্ব শোরুম এবং দুই হাজারের অধিক পার্টনার ও ডিলার শোরুমে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করছি। এছাড়া গ্রাহকরা আমাদের ওয়েব পেজের মাধ্যমে ফ্রিজ পছন্দ করে অর্ডার করতে পারেন। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমরা একটি অফার চালু করেছি, যার নাম ঘষা দিলেই গোল্ড অফার। এ অফারে একজন কাস্টমার কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের ফ্রিজ কিনলেই একটি স্ক্র্যাচ কার্ড পাবেন, যা ঘষে পেতে পারেন বিভিন্ন গোল্ডের জুয়েলারিসহ কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের নিশ্চিত উপহারসামগ্রী। এছাড়া পণ্য কেনার ক্ষেত্রে প্রায় সবক’টি সিডিউল ব্যাংকের কার্ডের মাধ্যমে এবং মাসিক তিন থেকে ১৮ মাসের কিস্তিতে আমাদের বিভিন্ন শোরুম, ডিসপ্লে সেন্টার ও ডিলারের মাধ্যমে কেনা যায়। আমাদের কাছ থেকে নিলে ১২ মাস পর্যন্ত কিস্তি সুবিধা দেয়া হয়। আমরা আশা করছি, গত বছরের তুলনায় এ ঈদে ১২-১৫ শতাংশ বিক্রয় প্রবৃদ্ধি হবে।
ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রয়োত্তর সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশব্যাপী গ্রাহকদের দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পৌঁছাতে আপনাদের নেটওয়ার্ক কতটা প্রস্তুত?
আমাদের ব্যবসার প্রথম এবং একমাত্র মূলমন্ত্র হচ্ছে গ্রাহকদের সর্বোত্তম বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করা। এজন্য বাংলাদেশে আমাদের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ দক্ষ টেকনিশিয়ান কাজ করছেন। এছাড়া আমাদের প্রতিনিয়ত ভাবনা থাকে কীভাবে সর্বনিম্ন ব্যয়ের মাধ্যমে সর্বোত্তম বিক্রয়-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা যায়। ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে কনকা, হাইকো ও গ্রী ব্র্যান্ডের ফ্রিজে দেয়া হচ্ছে বিশেষ বিক্রয়োত্তর সুবিধা, যাতে প্রতিটি ফ্রিজ স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করা যায়। কনকা, হাইকো ও গ্রী ব্র্যান্ড ফ্রিজের কম্প্রেসারের ১০ বছরের রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি রয়েছে, অন্যান্য যন্ত্রাংশের রয়েছে দুই বছরের ওয়ারেন্টি। তাছাড়া পাঁচ বছরের ফ্রি বিক্রয়োত্তর সেবাও দেয়া হচ্ছে। ফলে নিয়মিত সার্ভিসিং অনেক সহজ হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে আমাদের রয়েছে হান্টিং নাম্বার ১৬৬৪৯ কল সেন্টার সেবা। যেকোনো সেবার জন্য গ্রাহক ওই নম্বরে কল করলে আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিই।
রেফ্রিজারেটর দীর্ঘদিন ভালো রাখতে গ্রাহকদের প্রতি আপনার বা আপনার ব্র্যান্ডের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো রক্ষণাবেক্ষণ টিপস আছে?
রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজারকে দীর্ঘদিন নতুনের মতো ভালো রাখতে ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে কিছু সহজ রক্ষণাবেক্ষণ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। কখনোই গরম বা সদ্য রান্না করা খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখবেন না। খাবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসার পর ফ্রিজে সংরক্ষণ করুন। ফ্রিজের পেছনের বা নিচের কন্ডেন্সার কয়েলে ধুলাবালি জমলে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যায়। বছরে অন্তত দুবার কয়েলগুলো শুকনো কাপড় বা ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করুন। একটি নিদিষ্ট সময় পরপর দরজার গ্যাসকেট ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা পরীক্ষা করুন। রাবার ক্ষয় হয়ে গেলে ঠাণ্ডা বাতাস বাইরে বেরিয়ে যায়, যা কম্প্রেসারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বাতাস চলাচলের জন্য ফ্রিজের ভেতরে খাবার গাদাগাদি করে না রেখে কিছুটা ফাঁকা জায়গা রাখুন।










