দেশের ব্যাংকগুলো সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলায় কতটা নিরাপদ?
সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলায় দেশের সব ব্যাংক একই পর্যায়ে নেই। কিছু ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে, কিন্তু অনেক ব্যাংক এখনো পিছিয়ে আছে। এ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার মধ্যেও সে দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। সমস্যা হলো এখানে বিনিয়োগ করলে সঙ্গে সঙ্গে ফল পাওয়া যায় না। বরং যখন কোনো জালিয়াতি প্রতিরোধ করা যায়, তখনই বোঝা যায় বিনিয়োগের সুফল। বড় ব্যাংকে যারা সাইবার হামলা করে, ছোট ব্যাংকেও তারাই করে। পৃথিবীর বড় বড় ব্যাংক প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার খরচ করে শুধু সাইবার হামলা প্রতিরোধে। সে তুলনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ খুব সীমিত, কারণ আমাদের সে সক্ষমতাও কম। তবে এটাও সত্য যে, জালিয়াতি পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না, কিন্তু ক্ষতি কমানো সম্ভব। সম্প্রতি বিদেশী ব্যাংক এমনকি গুগলের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও হ্যাকিং ও ডাটা চুরির শিকার হয়েছে। কারণ হ্যাকাররা এক ধরনের ‘সারভাইভাল ইকোনমিতে’ থাকে। তারা নিয়মিতই প্রতারণার জন্য নতুন সুযোগ খোঁজে। তাই আমাদের প্রতিরোধও হতে হবে নিয়মিত ও সময়োপযোগী।
শুধু ফায়ারওয়াল দিয়েই সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। কোনো কর্মীর ই-মেইলে ম্যালওয়্যার এলে পুরো সিস্টেম ঝুঁকিতে পড়ে। তাই যারা ব্যাংক খাতে কাজ করছি, আমাদের সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। এটা এখন এক ধরনের যৌথ সমস্যা, যেখানে সব অংশীজনেরই দায়িত্ব আছে। আগামীর সময়টা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া এবং রোবোটিক প্রসেস অটোমেশন (আরপিএ) নির্ভর হয়ে যাবে। তখন গ্রাহক রাত ১২টাতেও লেনদেন করবেন, যে সময়ে কোনো কর্মী থাকবে না, সবকিছুই হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এমন পরিবেশে ব্যাংকের প্রথম দায়িত্ব হলো লেনদেনে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা।
এ বিষয়ে গ্রাহকদেরও তো সচেতন থাকা দরকার।
অবশ্যই। ওটিপি কারো সঙ্গে শেয়ার না করতে এবং অপরিচিত ই-মেইলের অ্যাটাচমেন্ট না খুলতে আমরা নিয়মিত গ্রাহকদের সতর্ক করি। কিন্তু অনেক গ্রাহক এসব বার্তা পড়েন না বা গুরুত্ব দেন না। পরে যখন ক্ষতির মুখে পড়েন, তখন বুঝতে পারেন। তারা আবার নিজেদের ক্ষতি সম্পর্কে ব্যাংকে যখন জানান, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। ব্যাংকেরও দায়িত্ব হলো ওটিপি ও দ্বিস্তর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা প্রত্যেকে নিজে নিজের কাজটা করলে যেকোনো ক্ষতি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
আপনি ব্যাংকের আইটি খাতে বিনিয়োগের কথা বলছিলেন। এ খাতে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের অবস্থান কেমন?
আমরা ডাটা সেন্টার, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যথেষ্ট বিনিয়োগ করেছি। আমাদের ল্যাপটপগুলো এমনভাবে কনফিগার করা যে, কেউ ইচ্ছা করলেই পেনড্রাইভ ঢুকিয়ে ডাটা নিতে পারবে না। প্রতিটি অ্যাকসেস লক করা থাকে। দায়িত্ব অনুযায়ী যার যতটুকু কাজের প্রয়োজন, কেবল সেই সীমার মধ্যেই প্রবেশাধিকার পায়। মানুষ হিসেবে কর্মীরা ভুল করতেই পারে, সেটা ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত। তাই আমরা দায়িত্ব ও প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যাকসেস সীমিত রাখি। পাশাপাশি এসএমএস ও অ্যাপ মেসেজের মাধ্যমে গ্রাহকদের নিয়মিত তথ্য জানাই। প্রয়োজনে বোর্ড অনুমোদন নিয়ে আইটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও হালনাগাদ করি। আইটিতে আমাদের পারফরম্যান্স নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও সন্তোষজনক রেটিং পেয়েছি। গত কয়েক বছরে আইটি সিকিউরিটি ও সাইবার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতে অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এমটিবি।
অনেকদিন ধরেই ক্যাশলেস সোসাইটি তৈরির আলোচনা চলছে। ব্যাংকগুলো এখন সবাই অ্যাপ চালু করছে, ইন্টারনেট ব্যাংকিং জনপ্রিয় হচ্ছে, এমএফএস বাড়ছে। কিন্তু এসব মনিটর করার মতো সক্ষমতা কি বাংলাদেশ ব্যাংকের আছে?
এটি চলমান প্রক্রিয়া। সবকিছু এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে, দুদিন নজর না রাখলেই পিছিয়ে পড়া সম্ভব। তবে একা নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সবকিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। অনেক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানতে চায় আমরা কী করছি, আবার আমরা ব্যাখ্যা দিই তারা কী চাচ্ছে। এ পারস্পরিক যোগাযোগই পুরো সিস্টেমকে এগিয়ে নিচ্ছে। তবে এখানেও কিছু প্রতিবন্ধকতা থেকে গেছে। এখনো সব ডিজিটাল প্রডাক্টের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যদি কোনো ডিজিটাল প্রক্রিয়া প্রচলিত ঋণের মতো একই নিয়ম অনুসরণ করে, তাহলে নতুন অনুমোদনের দরকার নেই। আবার ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) যদি অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেসের (এপিআই) সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া যাবে, ঋণ প্রক্রিয়া আরো দ্রুত সম্পন্ন হবে।
ব্যাংক খাতে আগামী দিনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে কী দেখছেন?
সবচেয়ে বড় হুমকি হলো সাইবার নিরাপত্তা। হ্যাকিং এখন বিশ্বব্যাপী মাথাব্যথা। এটাকে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে সবসময় হালনাগাদ থাকতে হবে। অনেকে মনে করেন, ডিজিটালাইজেশনের কারণে চাকরির সুযোগ কমে যাবে। সেটা পুরোপুরি সত্য নয়। কিছু ক্ষেত্রে কাজের ধরন বদলাবে, কিন্তু দক্ষতা বাড়বে, মুনাফা ও ব্যবসার সুযোগও বাড়বে। আমার কাজ হচ্ছে যেখানে সময় বেশি লাগে, সেখানে প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া। আর গুরুত্বপূর্ণ হলো জনবল পুনর্বিন্যাস করা। যেখানে মানুষের চিন্তা দরকার, সেখানে মানুষ থাকবে; বাকিটা প্রযুক্তি সামলাবে।
আপনি গ্রাহকদের সচেতনতার কথা বলছিলেন, সেটা প্রয়োজনও। কিন্তু ব্যাংকের দুর্বলতার কারণে কোনো ক্ষতি হলে তখন কী করার আছে?
গ্রাহককে সতর্ক থাকতে হবে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাংকের সিস্টেম দুর্বল হলে তার দায় গ্রাহকের নয়। সমস্যা হলো, কোনো কারণে দুর্ঘটনা ঘটে গেলে প্রমাণ করা কঠিন যে, এটা কি ব্যাংকের ত্রুটির কারণে হয়েছে, নাকি গ্রাহকের ভুলে। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, এখন এটিএমে সিসি ক্যামেরা থাকে। কিন্তু অনেক সময় পরিবারের কেউ কার্ড ও পিন ব্যবহার করে টাকা তুলে নেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহক নিজেই ওটিপি শেয়ার করে টাকা হারান। তখন দায় নির্ধারণ জটিল হয়। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় বিদেশী ব্যাংক বা এমএফএস প্লাটফর্মে অ্যাকাউন্ট যুক্ত করার সময় প্রতারণা হয়েছে। এখানেই প্রাতিষ্ঠানিক দায় আসে। তারা চাইলে আরো কিছু নিরাপত্তা ধাপ যোগ করতে পারত। তাই দায়িত্বটা যৌথভাবে গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠান—উভয়ের। এর পরও শেষ পর্যন্ত এসব ক্ষেত্রে সাধারণত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) বা বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব।
সচেতনতা বাড়াতে গ্রাহকদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কি?
গ্রাহকদের একটি বার্তাই দিতে চাই, আপনারা নিজের কোনো তথ্য কাউকে জানাবেন না। আপনার বন্ধু-বান্ধব, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, যেই হোক না কেন। কেউ ওটিপি, কার্ড কিংবা অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য জানতে চাইলে দেবেন না। ব্যাংকের পক্ষ থেকে কেউ ফোনে আপনার কাছে এসব তথ্য জানতে চাইবে না। কেবল নিজে যখন কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে কোনো তথ্য জানতে চান, তখনই ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছু তথ্য জানতে চাওয়া হয়।










