সাইবার হামলার ধরন ও ঝুঁকি দিনদিন জটিল হচ্ছে। শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের আচরণও হামলাকারীদের লক্ষ্যবস্তু। এ মুহূর্তে দেশের ব্যাংক খাতে সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?

ডিজিটাল ব্যাংকিং যত এগোচ্ছে, সাইবার ঝুঁকিও তত জটিল হচ্ছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান জটিল ও উন্নত ধরনের আক্রমণ। বিশেষ করে ফিশিং, রÅvনসমওয়্যার ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এসব আক্রমণ শুধু প্রযুক্তিগত নয়, মানুষের অসচেতনতাকেও কাজে লাগায়। এছাড়া গ্রাহক সচেতনতার ঘাটতি, দক্ষ জনবলের স্বল্পতা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল হুমকির ধরনও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষায় সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এর বাইরে ডিজিটালাইজেশনের কারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়ায় সাইবার হামলার ঝুঁকিও নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাই প্রযুক্তি, সচেতনতা আর দক্ষ জনবল—তিন দিকের সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে জরুরি।

প্রযুক্তি যতই বিস্তার ঘটাক, মানবিক দুর্বলতা সবসময় থাকবেই। এ দুর্বলতাকে লক্ষ্যবস্তু করেই ফিশিং, র‌্যানসমওয়্যার ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো আক্রমণ সবচেয়ে বেশি করা হচ্ছে। এ ধরনের হামলা মোকাবেলায় ব্যাংকগুলো কী ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে? প্রযুক্তিগত টুলস ছাড়াও কর্মীদের আচরণগত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে কি?

আমরা ই-মেইল ও ওয়েব ফিল্টারিং, ইডিআর (প্রান্তীয় শনাক্তকরণ ও পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যবস্থা) সিস্টেম ব্যবহার করে টার্গেটেড ডিভাইসের ফাইল প্রক্রিয়াকরণ, নেটওয়ার্ক যোগাযোগ ও রেজিস্ট্রির মতো সমস্ত কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করি। সাইবার আক্রমণ ঘটার কারণ ও পদ্ধতি বোঝার চেষ্টা করি। এর ফলে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা বোঝার চেষ্টা করি আমরা। আক্রমণকারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, সেটাও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি। এর বাইরে নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ ও ব্যাকআপ নিশ্চিত করি। পাশাপাশি ফিশিং ড্রিল ও সাইবার প্রশিক্ষণ চালু আছে, যাতে কর্মীরা প্রতারণাগুলো চিনতে ও বুঝতে পারেন। গ্রাহকদের কাছেও নিয়মিত ডিজিটাল নিরাপত্তা বার্তা পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে প্রযুক্তি আর সচেতনতার সমন্বয়ই এখন সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা কৌশল। এটাই আমাদের মূল গুরুত্বের জায়গা।

ডিজিটাল ব্যাংকিং বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেনদেনের নিরাপত্তা ও গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিটি ব্যাংক কীভাবে এ দিকগুলো সামলাচ্ছে? বিশেষ করে অনলাইন ও অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রযুক্তি, নীতি বা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ব্যবহার করছে ব্যাংকটি?

সিটি ব্যাংক গ্রাহকের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আমরা অ্যাপ্লিকেশন-কেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তথ্য প্রেরণ ও গ্রহণের প্রতিটি ধাপে এনক্রিপশন পদ্ধতির প্রয়োগ, বহুস্তরীয় যাচাইকরণ ব্যবস্থা, তাৎক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থা ব্যবহার করি। আমাদের নিরাপত্তা কার্যক্রম কেন্দ্র (এসওসি) সার্বক্ষণিক নজর রাখে, যাতে যেকোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ দ্রুত শনাক্ত করা যায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের তথ্য বা ব্র্যান্ডের নাম ডার্ক ওয়েবে কেউ কাজে লাগাচ্ছে কিনা তা শনাক্ত ও প্রতিরোধ ব্যবস্থাও বাস্তবায়ন করেছি আমরা; যাতে আগেভাগেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো যায়।

দেশের ব্যাংক খাত দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড সেবা, অনলাইন লেনদেন—সবই বাড়ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও বিনিয়োগ দরকার? শুধুই প্রযুক্তি কেনা, নাকি দক্ষ জনবল, প্রশিক্ষণ, ও সচেতনতা—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য আনাই মূল চাবিকাঠি?

সাইবার নিরাপত্তা এখন শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নয়, এটা ব্যবসারই অংশ। ব্যাংকগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল আর নীতি ও সুশাসনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সিটি ব্যাংক এরই মধ্যে এআই-চালিত নজরদারির মাধ্যমে হুমকি চিহ্নিত করা, ‘কাউকে আগেভাগে বিশ্বাস না করা’ নীতিভিত্তিক নিরাপত্তা নকশা ও ক্লাউড প্লাটফর্মের জন্য নিবিড় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। আমরা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে প্রযুক্তি, মানুষ ও নীতিতে সমন্বিত বিনিয়োগ করছি। যাতে দেশের ব্যাংকিং সাইবার নিরাপত্তায় নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারি।

সাইবার হামলার সময় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সিআইআরটি টিম থাকা জরুরি। দেশে এখন প্রায় সব ব্যাংকেরই নিজস্ব সিআইআরটি টিম আছে বলে জানা যায়। কিন্তু তাদের দক্ষতা, সরঞ্জাম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটা কার্যকর? তারা কি আন্তর্জাতিক মানে প্রশিক্ষিত, নাকি শুধু আনুষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে কাজ করছে?

হ্যাঁ, এখন প্রায় সব ব্যাংকের নিজস্ব সিআইআরটি (সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম) আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় নিয়মিত সম্ভাব্য হামলার পরিস্থিতি অনুকরণ করে প্রতিরক্ষা পরীক্ষা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হুমকিসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করছে। সিটি ব্যাংকের সিআইআরটি জাতীয় পর্যায়ে বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ও সমন্বয় সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভালো দক্ষতা অর্জন করেছে। আমরা টিমের দক্ষতা বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চর্চা অনুসরণ করছি।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলো সাধারণত নিয়মিত অনুপ্রবেশ পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সে মানদণ্ডে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে বলে আপনি মনে করেন? পার্থক্যটা কি প্রযুক্তিগত দিক থেকে, নাকি নীতিগত এবং জনবল ব্যবস্থাপনায়?

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো দ্রুত এগোচ্ছে। বাজেট ও জনবল কিছুটা সীমিত হলেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। সিটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানের এসওসি ও এসওএআর সিস্টেম গড়ে তুলেছে। এছাড়া লুকিয়ে থাকা সাইবার ঝুঁকি খুঁজে বের করা, বাহ্যিক সেবা প্রদানকারীর নিরাপত্তা যাচাই ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য সুরক্ষার নীতি কাঠামো বাস্তবায়ন করেছি আমরা। এ ব্যবস্থাগুলো অনেক আন্তর্জাতিক ব্যাংকের মানদণ্ডের কাছাকাছি। সব মিলিয়ে আমরা এখন বৈশ্বিক মানের প্রতিযোগিতায় ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা তৈরি করছি।

ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা কতটা কার্যকর? তারা কি নিয়মিত নিরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও পর্যবেক্ষণ করে? তদারকির ফলাফল কি প্রকাশিত হয়, নাকি এটি কেবল অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে?

এখন তদারকি অনেক বেশি কাঠামোবদ্ধ ও ফলপ্রসূ। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিরাপত্তা মানদণ্ড, ক্লাউড ব্যবহারে অনুসরণযোগ্য নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পরিপক্বতা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যাচাই করে। সিটি ব্যাংক এসব মূল্যায়নে নিয়মিত অংশ নেয় এবং সেখান থেকে পাওয়া সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করে। আমরা চাই আমাদের সাইবার প্রতিরক্ষা যেন আরো শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত কয়েক বছরে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে একাধিক নীতি, নির্দেশনা ও গাইডলাইন জারি করেছে। আপনার অভিজ্ঞতায়, এসব নীতিতে কী ধরনের বাস্তব পরিবর্তন এসেছে? এগুলো কি আগের তুলনায় ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে, নাকি বাস্তবায়নে এখনো ফাঁক রয়ে গেছে?

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেশকিছু সময়োপযোগী নীতিমালা দিয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো অনেক উন্নত হয়েছে। এখন ব্যাংকগুলো অ্যাপ্লিকেশনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সাইবার দুর্ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার মতো সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ করছে। সিটি ব্যাংকও গ্রাহকের তথ্য ও লেনদেনকে নিরাপদ রাখতে তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড আইএসও২৭০০১ ও পিসিআই ডিএসএস অনুসরণ করে নিরাপত্তা কাঠামো আরো শক্তশালী করেছে।

গ্রাহকের অসচেতনতার কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। গ্রাহক পর্যায়ে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়?

সাইবার সচেতনতা বাড়ানো আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আমরা এসএমএস, ইমেইল ও সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের নিয়মিত সতর্কতা বার্তা পাঠাই। এছাড়া ডিজিটাল সেফটি ক্যাম্পেইন চালাই, যেখানে অনলাইন লেনদেন কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, তা সহজভাবে জানানো হয়। ভবিষ্যতে গ্রাহক সম্পৃক্ততার প্রতিটি ধাপে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শভিত্তিক প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা আছে।

দেশে দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা পেশাজীবীর অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। এটার প্রভাব নিশ্চয়ই ব্যাংক খাতেও পড়ছে। এ ঘাটতির মূল কারণ কী? সংকট মোকাবেলায় ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কীভাবে উদ্যোগ নিতে পারে বলে মনে করেন?

দক্ষ সাইবার পেশাজীবীর ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে দ্রুত, কিন্তু প্রশিক্ষণ সে হারে বাড়েনি। সিটি ব্যাংক এই দিকটায় জোর দিচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রচেষ্টায় কর্মীদের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করছি আমরা। আমার মনে হয়, ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একসাথে কাজ করলে জাতীয়ভাবে শক্তিশালী সাইবার ‘‌ট্যালেন্ট পুল’ তৈরি করা সম্ভব।