দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে ইউজিসি বর্তমানে কোন কোন কাঠামোগত সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে?
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) আমরা কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক সংস্থা হিসেবে দেখতে চাই না। আমাদের মূল দর্শন সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে একটি টিম হিসেবে কাজ করাই আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে চাই, সেগুলো অবকাঠামোগত হোক, একাডেমিক কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতাসংক্রান্ত হোক—এ সমস্যাগুলো সমাধানে সহযোগিতা করতে চাই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও আমাদের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে। তাদেরও আমাদের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করতে হবে। কাঠামোগত দিক থেকে বর্তমানে আমরা তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্বিতীয়ত, একাডেমিক মান নিশ্চিত করা এবং তৃতীয়ত, নীতিমালা ও আইন মেনে চলার সংস্কৃতি জোরদার করা। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে আমরা নিয়মকানুন ও শর্তাবলি যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর জোর দিচ্ছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন কখনই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হয়ে না ওঠে। এগুলো হবে একাডেমিক প্রতিষ্ঠান, যাদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। যারা প্রকৃত অর্থে শিক্ষাকে সেবা হিসেবে বিবেচনা করে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে। এক্ষত্রে ইউজিসি তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট ও গবেষণা বরাদ্দ বাস্তব অর্থনৈতিক চাহিদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এখানে ইউজিসির ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেট আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অত্যন্ত কম। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বরাদ্দ এতটাই সীমিত যে তা দিয়ে টেকসই ও মানসম্পন্ন গবেষণা পরিচালনা করা কঠিন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌক্তিক চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় আর্থিক সংকটের কারণে সরকার সব চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ইউজিসি এখানে এক ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। সরকার যে সীমিত অর্থ আমাদের মাধ্যমে দেয়, তা কীভাবে ন্যায্যভাবে বণ্টন করা যায়—সেটিই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদাই যৌক্তিক, কিন্তু কার কতটুকু দেয়া সম্ভব—সে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। তবে আশার জায়গা বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে গবেষণা খাতে কিছুটা হলেও গতি এসেছে। অনেক ভালো বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। আমরা চাই এসব অর্থ যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে ব্যবহার হয় এবং সত্যিকার অর্থে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ইউজিসির বিদ্যমান তদারকি কাঠামো কতটা কার্যকর?
আমাদের তদারকি কাঠামোকে আমরা কখনই একতরফা নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখি না। বরং এটিকে সহযোগিতার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় ট্রাস্টি বোর্ড, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী আমরা এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তবে সেগুলো ধীরে ধীরে সমাধানের পথে। ইউজিসি নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে কঠোর, তবে অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। আমাদের লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন নিয়ম মানে, একই সঙ্গে যেন তারা এগিয়ে যেতে পারে। এ ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ নয়, কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি যুক্তিসংগত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তদারকি করতে।
শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিতে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে ইউজিসির পরিকল্পনা কী?
বর্তমান বিশ্বে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব নয়। অনেক দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে কখনো ক্যাম্পাসে গবেষণা সেন্টার স্থাপন করে, কখনো শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দেয়। বাংলাদেশেও আমরা এ ধারার দিকে যেতে চাইছি। বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় যে দুটি প্রকল্প চলমান আছে। ওই দুটি প্রকল্পে শিল্প–একাডেমিয়া সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজেদেরও আরো বেশি উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরও চেষ্টা করতে হবে ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সঙ্গে আরো জোরদার সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতেকলমে শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করা। এছাড়া ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের গবেষণা খাতকেও আরো শক্তিশালী করতে পারে। যেমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনে অর্থ ব্যয় করে। তারা যাতে তাদের এ খাতের অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণার জন্য ব্যবহার করে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। এ ধরনের যৌথ গবেষণায় একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে লাভবান হবে।
উচ্চশিক্ষায় ডিজিটালাইজেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তারে ইউজিসির সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো কী এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব আপনি কীভাবে দেখছেন?
করোনাকাল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ডিজিটালাইজেশন ছাড়া বিকল্প নেই। এ খাতে ইউজিসির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক (BdREN)। প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস, গবেষণা ডাটা শেয়ারিং ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সহজ হয়েছে। ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা বিস্তৃত হলে একদিকে যেমন শিক্ষার মান বাড়বে, অন্যদিকে ব্যয়ও কমবে। তবে শিক্ষক সংকট, বিশেষ করে অভিজ্ঞ অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে অনলাইন মাধ্যমে দেশীয় অভিজ্ঞ শিক্ষক বা আন্তর্জাতিক শিক্ষকদের যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হলে এ সংকট অনেকটাই কাটবে।
উচ্চশিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে ইউজিসি কী ধরনের নীতিগত প্রস্তাব দিচ্ছে?
বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল সরকারের অর্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। সেখানে অ্যালামনাই, করপোরেট সেক্টর ও দাতাদের বড় ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশেও এ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা যেহেতু অত্যন্ত কম খরচে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তাদের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান রাখা উচিত। ইউজিসি এ লিংকেজ তৈরিতে উৎসাহ দিচ্ছে, তবে মূল উদ্যোগটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই নিতে হবে।
উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠিত হলে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠিত হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত ও কার্যকর হবে। বর্তমানে ইউজিসিকে বহু বিষয়ে শিক্ষা ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা ব্যুরোক্রেটিক জটিলতার কারণে সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। উচ্চশিক্ষা কমিশন হলে তাৎক্ষণিক সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে। আমরা চাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হোক। এজন্য বর্তমান সরকারের সময়েই উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে সেটি দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য বড় অর্জন হবে।










