দেশে বর্তমানে কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার কথা ধরলে বাংলাদেশে চার লাখ মসজিদ এবং লক্ষাধিক মক্তব রয়েছে, যার প্রায় প্রতিটিতেই সকালবেলা মাদ্রাসা শিক্ষা চালু থাকে। আর যদি প্রাতিষ্ঠানিক কওমি মাদ্রাসার কথা বলেন, তবে সারা দেশে এর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বড় বোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া’র (বেফাক) অধীনেই রয়েছে প্রায় ৩২ হাজার মাদ্রাসা এবং বাকি পাঁচটি আঞ্চলিক বোর্ডের অধীনে আছে আরো প্রায় আট হাজার মাদ্রাসা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঠিক সংখ্যাটি দাপ্তরিক নথির ওপর নির্ভরশীল হলেও একটি গড় হিসাব করা যায়। প্রতিটি মাদ্রাসায় গড়ে ২০ জন হিসেবে আট লাখ শিক্ষক এবং গড় হিসেবে ৮০ লাখ শিক্ষার্থী হয়। অনানুষ্ঠানিক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী গণনা করলে সংখ্যাটি দুই কোটির ওপরে গিয়ে দাঁড়াবে। সব মিলিয়ে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী এ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

ঐতিহাসিকভাবে আপনারা ‘‌দরসে নিজামি’ অনুসরণ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইংরেজি ভাষার প্রসারের সঙ্গে তাল মেলাতে আপনাদের সিলেবাসে কোনো পরিবর্তনের পরিকল্পনা আছে কি?

‘‌দরসে নিজামি’ হলো আমাদের শিক্ষার ভিত্তি, যা আওরঙ্গজেবের সময়ের শিক্ষানীতি। ব্রিটিশ বা আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে আমরা এর মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন মেনে নিইনি। তবে আধুনিক যুগের প্রয়োজনে আমরা মৌলিক বিষয় ঠিক রেখে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞান শিক্ষা দিচ্ছি। আমাদের ছাত্রদের বাংলা ও ইংরেজি ভাষার চর্চা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় ভালো। হাতের লেখা, ভাষাজ্ঞান, বানান, ব্যাকরণ ইত্যাদিতে মাদ্রাসার ছাত্ররা অনেক অগ্রসর। আমরা ধীরে ধীরে আইটি বা প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করছি। তবে আমাদের লক্ষ্য ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানো নয়, যার জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে, বরং একজন দক্ষ আলেম তৈরি করাই মাদ্রাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য। যিনি আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্বীনের খেদমত ও প্রচার করতে পারবেন।

কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে থাকার মূল কারণ কী? এতে আপনারা কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন কি?

রাষ্ট্রীয় বা সরকারি আর্থিক সহায়তা না নেয়া আমাদের একটি মৌলিক নীতি। এর প্রধান কারণ চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং ধর্মীয় স্বকীয়তা রক্ষা করা। সরকারি অনুদান নিলে সেখানে নিয়ন্ত্রণ বা শর্তের বিষয় চলে আসে, যা অনেক সময় ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এটি একটি সাধনার জগৎ। এখানকার শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা জাগতিক বিত্তবৈভবের চেয়ে ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে কাজ করেন। জনগণ ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত দানেই এ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানত চলে। অনেক বিত্তবান শিক্ষার্থীও মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভ করে। যেহেতু অর্থ-সম্পদ উপার্জন তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য নয়। নির্ধারিত রিজিকের ওপর তারা সন্তুষ্ট এবং জনগণের সেবা তাদের জীবনের ব্রত। তাই বড় কোনো অর্থনৈতিক সংকট বা সমস্যা তাদের কাবু করতে পারে না। মানসিক অভাববোধ তাদের কখনো হয় না। ধনদৌলত থাক বা না থাক, মনের ঐশ্বর্যে তারা সবচেয়ে বিত্তশালী। শিক্ষক, ছাত্র ও অভিভাবকরা এ অবস্থার ওপর সন্তুষ্ট। যারা অন্য কিছু চায়, তারা এ শিক্ষার পাশাপাশি ভিন্ন শিক্ষাও চালিয়ে যেতে পারে এবং এর যথেষ্ট নজিরও রয়েছে। স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা শেষ করার পাশাপাশি অসংখ্য কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আধুনিক শিক্ষায়ও সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করে থাকে। তবে এটিকে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বানিয়ে গোটা মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষায় পরিণত করতে তারা রাজি নয়। মাদ্রাসা শিক্ষা আধুনিক শিক্ষার সিঁড়িতে পরিণত হোক এটাও কওমি শিক্ষার্থীরা পছন্দ করে না। তবে আধুনিক সময়ের যোগ্য আলেম এবং প্রতিষ্ঠিত সুনাগরিক হওয়ার পরিমাণ সংস্কার ও পরিমার্জন তারা চায়, যা প্রতিনিয়ত হচ্ছে।

দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেয়ার পর শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের পরিধি কতটা বিস্তৃত হয়েছে? বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে কওমি গ্র্যাজুয়েটদের অংশগ্রহণের বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?

দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতির মূল উদ্দেশ্য ছিল এ শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি আইনি কাঠামো দেয়া এবং রাষ্ট্র ও সমাজে এর অবস্থান পরিষ্কার করা। বেসরকারি সেক্টরে যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, এনজিও বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমাদের ছাত্রদের কর্মসংস্থান নিয়ে সমস্যা নেই। তারা দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। তবে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিসিএস বা অন্যান্য জায়গায় এখনো আমাদের সুযোগ অবারিত নয়। সরকার যদি আমাদের মূলনীতি বা কাঠামোয় হস্তক্ষেপ না করে কেবল দক্ষতার ভিত্তিতে সুযোগ দেয়, তবে আমাদের ছাত্ররা ভালো করবে। কারণ তারা কঠোর পরিশ্রমী এবং বহুভাষী (আরবি, উর্দু, ফার্সি, ইংরেজি)। আমরা সরকারি চাকরির জন্য আমাদের মূলনীতি বা ঐতিহ্য বিসর্জন দেব না, তবে সরকার আন্তরিক হলে আমরা সঠিক উপায় বের করার জন্য আলোচনায় রাজি আছি।

কওমি শিক্ষার্থীদের মূলধারার আর্থসামাজিক কার্যক্রমে আরো সম্পৃক্ত করতে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

দেখুন, আমরা সামাজিকভাবে মোটেও বিচ্ছিন্ন নই। একজন আলেম জনগণের সুখ-দুঃখের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন। বরং সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা অনেক বেশি, যা আমাদের মধ্যে নেই। ‘‌মূলধারা’য় সম্পৃক্ত হওয়ার অর্থ যদি হয় সেকুলার হয়ে যাওয়া, তবে তা আমরা হতে চাই না। বরং আমরা চাই পারস্পরিক আদান-প্রদান। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের কাছ থেকে নৈতিকতা, দেশপ্রেম, দুর্নীতিমুক্ত জীবন এবং সময়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া শিখতে পারে। উন্নত বিশ্বের স্কিলগুলোর পাশাপাশি তাদের যে মোরালিটি, তা আমাদের শিক্ষার মূলে রয়েছে। সরকার চাইলে প্রতিটি সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মসজিদে ইমাম, বিভিন্ন বাহিনীতে ধর্মীয় প্রশিক্ষক বা আপাতত ৭০ হাজার প্রাইমারি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে আমাদের বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারে। আমাদের সনদ কার্যকর করে তাদের বেসরকারি সেক্টরে কিংবা স্কিল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে দেশে বিদেশে কাজের সুযোগ করে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসে দেশবাসীর উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

আমার বার্তা হলো কওমি মাদ্রাসাকে খাটো করে না দেখে এর অবদানকে খোলা চোখে দেখুন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা যে নৈতিক ও চরিত্রবান নাগরিক তৈরি করছি, তা সমাজের জন্য বড় সম্পদ। গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে সেভাবে স্থান না পেলেও বিশ্বের সেরা হাফেজ ও ক্বারিদের মধ্যে বাংলাদেশী কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা প্রথম স্থান, সনদ, অর্থ পুরস্কার, স্বর্ণপদক পেয়ে আসছে। অন্য কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে তেমন কিছুই পায় না। সেরা মাদ্রাসাগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অনেক মাদ্রাসা শীর্ষস্থানে রয়েছে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক অপূর্ণতা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা পূরণ করতে পারে। মাদ্রাসার ঐতিহ্য, চেতনা, শিক্ষা, বহু ভাষাজ্ঞান, সাধনা, ঈমানদারি, নৈতিকতা ও নির্লোভ, শান্তিপ্রিয়তা থেকে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আলো নিতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যমে তৈরি জনশক্তি থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের অনেক কিছু নেয়ার আছে। তাই আসুন একে অন্য থেকে উদাস না থেকে পারস্পরিক আদান-প্রদান ও সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি।