গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা খাতে কতটা পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন?

সরকারিভাবে নানা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে সংস্কার প্রক্রিয়ায় শিক্ষা খুব বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। ১১টি সংস্কার কমিশন হলেও শিক্ষার জন্য কোনো কমিশন হয়নি। কমিশন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়তো হতো না। এ ধরনের সুপারিশ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নিয়েও সংশয় আছে। তবে কমিশন হলে অন্তত সমস্যাগুলো শনাক্ত হতো এবং এগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য কিছু সুপারিশও আসত, যা পরবর্তী সময়ে এ খাতের উন্নয়নে গাইডলাইন হিসেবে বিবেচিত হতো।

দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দুই দশকে দ্বিগুণ হলেও শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ আছে এবং উচ্চশিক্ষিত বেকার বাড়ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে করণীয় কী?

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা উচিত। যেমন বর্তমানে শ্রমবাজারের চিত্র কেমন, সেখানে কোন বিষয়ে কত সংখ্যক গ্র্যাজুয়েটের চাহিদা আছে, গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন এবং নতুন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আছে কিনা। গত দুই দশকে এসব বিবেচনা না করেই একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগসহ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। এসব কারণে গ্র্যাজুয়েটদের একটি অংশ যথাযথ দক্ষতাসম্পন্ন হচ্ছে না এবং বেকারত্ব বাড়ছে। তবে বিপরীত চিত্রও আছে। কিছু প্রতিষ্ঠান খুবই ভালো মানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারছে। সামগ্রিকভাবে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়ন।

যেমন বুয়েট এরই মধ্যে ওবিই (আউটকাম বেইজড এডুকেশন) কারিকুলাম চালু করেছে। এ ছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়গুলোর জন্য আমরা বিএইটিইর (BAETE) অ্যাক্রেডিটেশন নিয়ে থাকি। এ অ্যাক্রেডিটেশন কয়েক বছর পরপর নবায়ন করতে হয় এবং এর জন্য শর্ত হিসেবে শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সম্পর্ক, গবেষণার সুযোগসহ অনেকগুলো শর্ত পূরণ করতে হয়; যা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করে। দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে আমি মনে করি, প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারবে।

দেশের প্রথম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ৬৩ বছর পার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বুয়েট কি রাষ্ট্রের প্রত্যাশা যথাযথভাবে পূরণ করতে পারছে বলে মনে করেন?

রাষ্ট্রের প্রত্যাশা শতভাগ পূরণ করতে পারছে এটি বলব না, তবে অনেকাংশ ক্ষেত্রেই পারছে। বুয়েট দেশের প্রকৌশল শিক্ষায় অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। প্রকৌশল শাখাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আমাদের শিক্ষার্থীরা দক্ষতার সঙ্গে সেবা দিচ্ছে। তবে সুযোগ-সুবিধা, অর্থায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো আমাদের নানা ধরনের সংকট রয়েছে। এ সংকটগুলো না থাকলে বুয়েটের পক্ষে আরো ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হতো।

যেমন প্রকৌশল শাখায় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা-গবেষণায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের উন্নত যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ গবেষণাগারসহ উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু বুয়েট অন্যতম সেরা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও গত দুই দশকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার জন্য, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের জন্য কোনো বড় ধরনের প্রকল্প নেয়া হয়নি। ফলে আমাদের গবেষণাগারগুলোয় এখনো প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা যায়নি, শিক্ষার্থীরা চরম আবাসন সংকটে ভুগছে।

প্রকৌশলসহ বিশেষায়িত বিষয়ের শিক্ষার্থীরাও বিসিএস প্রশাসন-পুলিশ ক্যাডারের মতো পেশায় মনোযোগী হয়ে উঠছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

বিশেষায়িত বিষয়ে স্নাতক সম্পন্নকারীরা সংশ্লিষ্ট খাতেই তাদের মেধা ও দক্ষতার প্রয়োগ করবেন, এটিই কাম্য। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সুযোগ-সুবিধা ও সম্মানের ভারসাম্যহীনতার কারণেই অনেকে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি একই গ্রেডে সমমর্যাদাসম্পন্ন পদে চাকরি করলেও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক সম্মানের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য থাকে। একজনের হয়তো বছরের পর বছর পদোন্নতি হয় না, আবার আরেকজনের ক্ষেত্রে এ ধরনের জটিলতা নেই। একজন হয়তো যেকোনো খাতেই সর্বোচ্চ পদে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, কিন্তু আরেকজন পারছেন না। এসব কারণেই দেখা যায়, স্বাস্থ্য ও প্রকৌশলের মতো বিশেষায়িত বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটরা সংশ্লিষ্ট পেশায় না গিয়ে পুলিশ প্রশাসন ক্যাডারের দিকে ঝুঁকছেন। সেখানে তারা খারাপ করছেন এমন নয়, বরং খুব ভালো করছেন। তবে নিজ শাখায় থাকলে তাদের দ্বারা রাষ্ট্র হয়তো আরো সমৃদ্ধ হতো।

যেমন শিক্ষা, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যের মতো বিশেষায়িত যে প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর নেতৃত্বস্থানীয় অনেক পদই প্রশাসন ক্যাডার-কেন্দ্রিক। কিন্তু বছরের পর বছর এসব খাতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ পদে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা খাতের এখনো আশানুরূপ সম্প্রসারণ হয়নি। এর কারণ কী বলে মনে করেন। গবেষণা খাতের উন্নয়নে আপনার পরামর্শ কী?

গবেষণা খাতের সম্প্রসারণের জন্য এখনো আমাদের দেশে উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। বিনিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি আছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বিনিয়োগ করে, কিন্তু আমাদের দেশে এখনো এ ধরনের বিনিয়োগ খুব কম। এছাড়া গবেষণালব্ধ ফলাফলকে সংশ্লিষ্ট খাতের উন্নয়নে প্রয়োগ করা এবং বাজারজাত করার যথেষ্ট সুব্যবস্থা নেই। আবার ভালো গবেষকদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা বা তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধাও নেই বললেই চলে।

এমনকি এ ধরনের কোনো পলিসিও নেই, যা শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করে তুলবে। বিশ্বজুড়েই গবেষণা সবচেয়ে বেশি হয় পিএইচডি পর্যায়ে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও কিছু রিসার্চ সেন্টার ব্যতীত আমাদের দেশে কোথাও পিএইচডি ডিগ্রিকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। আবার ভালো গবেষকদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারণা বা তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধাও নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, গবেষণালব্ধ ফলাফলকে রাষ্ট্র গুরুত্ব দিচ্ছে না।

এসব কারণে আমাদের দেশে গবেষণায় আগ্রহ কম। রাষ্ট্র যদি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় গবেষণার সুযোগ বাড়ায়, গবেষণাকে উৎসাহিত করে, ভালো গবেষকদের বিশেষভাবে সম্মানিত করে, তাহলে গবেষণায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি হবে।

এছাড়া বিনিয়োগ ঘাটতির ক্ষেত্রে একটি সমাধান হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বৃদ্ধি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবন ও গবেষণায় যে বরাদ্দ থাকে, তার একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বিনিয়োগ করা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যাতে এ বিনিয়োগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্য ফলপ্রসূ হয়।

আপনার মতে দেশের শিক্ষা খাতের আগামীর মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী এবং এ চ্যালেঞ্জ উত্তরণে আপনার পরামর্শ কী?

শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো জনশক্তি পরিকল্পনা তৈরি করতে পারিনি। এটি অবিলম্বে করা প্রয়োজন। এছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য যেসব অনুষঙ্গ প্রয়োজন, যেমন উপযুক্ত কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, এর প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংকট আছে। শিশুদের মূল ভিত্তিটা তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরে। কিন্তু এসব সংকটের জন্য প্রাথমিক স্তর থেকেই আমাদের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং তারা যত ওপরের শ্রেণীতে উঠছে ঘাটতি ক্রমে বাড়ছে। আমাদের কোনো কারিকুলামই যথাযথ গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়নি। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারিকুলামও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। অথচ কারিকুলাম হওয়া উচিত গবেষণানির্ভর। রাষ্ট্র তার আগামী প্রজন্মকে কীভাবে গড়ে তুলতে চায়, নৈতিক গুণাবলি, সাংস্কৃতিক বিকাশসহ তাদের মধ্যে কোন কোন মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করতে চায়, সেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও যথেষ্ট সময় নিয়ে কারিকুলাম তৈরি করতে হবে। কারিকুলাম বাস্তবায়নের আগে এটি কতটা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে যথাযথভাবে বাস্তবসম্মত গবেষণা করতে হবে। যদি গবেষণার ফলাফল ইতিবাচক হয়, তবেই সে পদ্ধতিতে চূড়ান্তভাবে পাঠদান শুরু করতে হবে। গবেষণায় যদি প্রস্তাবিত কারিকুলামের কোনো ত্রুটি উঠে আসে, সেটি দূর করতে হবে এবং এরপর কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া প্রাথমিক থেকে শুরু করে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে দক্ষ মেধাবী শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে শিক্ষকরা সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদায় অনেক পিছিয়ে আছেন। এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। মেধাবীরা যাতে এ পেশায় আসে তার জন্য শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ সামজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে শিক্ষায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশের তালিকায় আছি। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যে পরিমাণ বিনিয়োগ শিক্ষায় করা উচিত, সেটি অনুসরণের চেষ্টা করতে হবে। হয়তো রাতারাতি এটি করা সম্ভব হবে না। তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাতে করতে পারি, সে প্রচেষ্টা থাকতে হবে।