গত দুই দশকে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৫৩টি পাবলিক ও ১১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৫২ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। তাদের মধ্যে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের অধিভুক্ত ২ হাজার ৭৮৮টি কলেজ ও ১ হাজার ৬৭৪টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী আছে ৪৮ লাখ ২১ হাজার ১৬৫ জন। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৪ জন।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৮ লাখ ৪৯ হাজার ৮৬৫। একই বছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন ৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৩০ জন। এ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটলেও গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্তত ১৩০টি ভুগছে শিক্ষক সংকট, গবেষণাগারের অপ্রতুলতাসহ বিভিন্ন সমস্যায়। এসব সংকটের প্রভাব ফুটে উঠেছে গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতায়।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে টাইমস হায়ার এডুকেশন ২০২৬ ও কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৬-এ সেরা ৫০০-এর তালিকায়ও দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি।
শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ঘাটতির প্রতিফলন দেখা গেছে দেশের শ্রমবাজারেও। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজার। এর আগে শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৯৯ হাজার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উচ্চশিক্ষিত বেকার বেড়েছে এক লাখের বেশি। আর বিগত ১০ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ সময়ে উচ্চশিক্ষিত বেকার বেড়েছে আট গুণ।
বৈষম্যহীন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন ও পুনর্নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণবিষয়ক টাস্কফোর্সের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি ১০০ জন বেকারের মধ্যে ২৮ জনই উচ্চশিক্ষিত। ২০১০-২২ সময়ে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়েছে। ২০১০ সালে টারশিয়ারি পর্যায়ে বেকারত্ব ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১২ শতাংশে।
গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতার ঘাটতি উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও। কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স ২০২৫-এ উঠে এসেছে বিশ্বজুড়ে চাকরিদাতারা কর্মী নিয়োগে গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে যে ধরনের দক্ষতা প্রত্যাশা করেন সে রকম মানবসম্পদ তৈরিতে বেশ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ইনডেক্সটি তৈরিতে প্রায় ৫০ লাখ চাকরিদাতার মতামত, বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং, গবেষণা পরিস্থিতিসহ আরো কিছু বিষয়কে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এ ইনডেক্সে ১০০ স্কোর মানের বিপরীতে চাকরিদাতাদের চাহিদানুযায়ী গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা, একাডেমিক প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক রূপান্তর, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান—চার সূচকে স্কোর প্রদান করা হয়েছে। যেসব দেশের স্কোর ১০০-এর কাছাকাছি তাদের গ্র্যাজুয়েটরা বৈশ্বিক চাকরিবাজারে জায়গা করে নিতে প্রস্তুত। তাদের দক্ষতা নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ। আর স্কোর যত কম সে দেশের গ্র্যাজুয়েটরা বাজারের চাহিদার তুলনায় অনেক কম দক্ষ এবং তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকিও বেশি।
ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, চাকরিদাতাদের চাহিদানুযায়ী দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে বাংলাদেশের স্কোর ৩৯ দশমিক ১। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ইনডেক্সের ৮১টি দেশের মধ্যে ৬৭তম। এছাড়া ভবিষ্যৎ উপযোগী একাডেমিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ৬৫ দশমিক ৭ এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে স্কোর ৪২ দশমিক ৬। এ ইনডেক্সে অর্থনৈতিক রূপান্তরে বাংলাদেশকে কোনো স্কোর দেয়া হয়নি (এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে)। ইনডেক্সে বাংলাদেশের চূড়ান্ত স্কোর ৪৯ দশমিক ১।
একই চিত্র উঠে এসেছে আরো কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানসম্মততা নিয়ে প্রতি বছর ‘কান্ট্রিজ উইথ বেস্ট পারফর্মিং এডুকেশন সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষামানের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে ভবিষ্যতের প্রভাবশালী শীর্ষ নির্বাহী ও কোম্পানি লিডারদের জন্য উৎস দেশগুলোর সম্ভাবনাকে তালিকাভুক্ত করা। ১৬টি ডাটা পয়েন্টে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩০০ ব্যক্তির ওপর পরিচালিত এক জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে র্যাংকিংটি প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ), ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ওইসিডি, মার্কিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, ইউনেস্কো, টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং, কিউএস র্যাংকিং, সাংহাই র্যাংকিং কনসালট্যান্সি, বিশ্বব্যাংকসহ বৈশ্বিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয় করা হয়। এর ভিত্তিতে এ প্রতিবেদনের ২০২৪ সংস্করণে শিক্ষামানের ভিত্তিতে ৯৩টি দেশের র্যাংকিং করা হয়েছে। এ তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই।
এসব প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা গুরুত্ব দিচ্ছেন জনশক্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর প্রতি। ইউজিসি বলছে, দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির উদ্দেশ্যে এরই মধ্যে তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আউটকাম বেজড কারিকুলাম চালু, গবেষণায় গুরুত্বারোপ, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজসহ বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে সক্ষম হবে এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার পার্থক্য অনেকাংশেই কমে আসবে।










