আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের মূল তাৎপর্য কী এবং এবারের থিম আমাদের শিক্ষার জন্য কী বার্তা নিয়ে আসছে?
এবারের আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে ‘শিক্ষা সহ-সৃষ্টিতে যুবশক্তির ভূমিকা’ এবং সবচেয়ে বড় বার্তা হলো শিক্ষার মাধ্যমে মানবিক গুণাবলি গড়ে তোলা। আমরা বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছি, তার লক্ষ্য শুধু পুঁথিগত বিদ্যা বা সার্টিফিকেটের জন্য নয়। প্রকৃত শিক্ষা হবে এমন, যা একজন শিক্ষার্থীকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ করবে। সে শুধু নিজের স্বার্থ বা অস্তিত্বের কথা ভাববে না, বরং সমাজকে এগিয়ে নেয়ার চিন্তা করবে। আজকে যুব সমাজ এটাই দেখতে চায় যে শিক্ষা যেন একজন ব্যক্তির সামাজিক নিরাপত্তা ও নিশ্চিত স্থান তৈরি করে দেয়।
বর্তমান সময়ে সায়েন্স ও টেকনোলজির দ্রুত পরিবর্তন কি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ?
অবশ্যই। প্রযুক্তির পরিবর্তন আগে ছিল গাণিতিক হারে কিন্তু এখন তা হচ্ছে জ্যামিতিক হারে। এই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা উচ্চশিক্ষাকে রূপান্তর করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন প্রজেক্টে যুক্ত হয়েছি, যেমন—‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট), যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সাহায্য করবে।
দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধান চ্যালেঞ্জ কোনটি—মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন নাকি কর্মসংস্থান?
আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি। আমাদের দেশে এখন ভালো শিক্ষক তৈরির জন্য পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচির প্রয়োজন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে শিক্ষার্থীদের পাচ্ছি, তারা আমাদের প্রধান উপাদান। কিন্তু এ উপাদানের গুণগত মান নিশ্চিত হয়ে আসতে হবে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায় থেকে। দুর্ভাগ্যবশত, নিচের স্তরগুলোতে শিক্ষার মান ও শিক্ষকের গুণগত মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই বললেই চলে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া; শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো হলে চলবে না, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরকেও মানসম্মত হতে হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআইয়ের ব্যবহারকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন আমরা এআইকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করব, এআই আমাদের নিয়ন্ত্রক হবে না। উন্নত বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন এআই ব্যবহার করে তাদের পাঠ্যক্রম তৈরি করছে। অনেকে মনে করেন এআই ব্যবহারে সৃজনশীলতা কমে যাবে, কিন্তু নৈতিক সততা রেখে এটি ব্যবহার করলে আমি মনে করি এআই হবে আমাদের সেরা সহযোগী। তবে এআই ব্যবহারের জন্য সঠিক প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। আমাদের লং-টার্ম স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপে আমরা এআইয়ের সহযোগিতায় বিশ্বমানের কারিকুলাম তৈরির পরিকল্পনা রাখছি।
বাংলাদেশে অনেক সময় নতুন সাবজেক্ট চালু করতে দেরি হয়। বর্তমানে কোন ধরনের শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত?
আমাদের এখন ‘নিড-বেজড অ্যানালাইসিস’ (প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ) করে এগোতে হবে। ন্যানো টেকনোলজি বা এআইয়ের মতো বিষয়গুলোয় গভীর নজর দিতে হবে। তবে পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে এখন মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালস খুব জনপ্রিয় হচ্ছে। এটি হলো নির্দিষ্ট দক্ষতা বা সক্ষমতার জন্য স্বল্পমেয়াদি, লক্ষ্যভিত্তিক সার্টিফিকেশন, যা তাৎক্ষণিক চাকরির বাজারের চাহিদা পূরণে দ্রুত এবং সাশ্রয়ী শেখার সুযোগ দেয়। আমাদের মূল পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অবসরে এ ধরনের স্কিল-বেজড সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা সবসময় নিজেদেরকে উপযোগী করে তুলতে পারে।
উচ্চশিক্ষার মানদণ্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
র্যাংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চমার্ক, তবে এটিই একমাত্র মানদণ্ড নয়। র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে একাডেমিক রেপুটেশন, গবেষণার মান এবং গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান দেখা হয়। অনেক পুরনো এবং ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ও অনেক সময় তথ্যের অভাবে র্যাংকিংয়ে থাকে না। আমরা ইউএপিতে এখন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যোগাযোগ এবং তথ্যের সঠিক সরবরাহের ওপর জোর দিচ্ছি। র্যাংকিং আমাদের নিজেদের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে, তবে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো।
শিক্ষা দিবস উপলক্ষে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?
আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নামের গাছটাকে দিন দিন শীর্ণ হয়ে যেতে দেখছি, এর গোড়ায় শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের নামে সার-পানি ঢালা বিশেষ প্রয়োজন, সেদিকে আমরা নজর দিচ্ছি না। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়া থেকেই শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রম হতে হবে স্টুডেন্ট ওরিয়েন্টেড। শিক্ষার্থীদের কথা বলতে দিতে হবে, তাকে প্রশ্ন করতে দিতে হবে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। সেই সঙ্গে শিক্ষকদের মননে পরিবর্তন আনাটা বেশ জরুরি। একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষকই পারবেন ক্লাসরুমের কেমিস্ট্রি বদলে দিতে।










