একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার মূল ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরে। এ কারণে বিশ্বের সব দেশেই প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদাণ করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর থেকেই প্রাথমিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে প্রায় ৫৫ বছর পার হলেও এখনো সবার জন্য একই পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১১ ধরনের। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা। সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কারিকুলাম চালু আছে অন্তত পাঁচ রকমের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। দেশে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, এবতেদায়ি মাদ্রাসা, উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদ্রাসা, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্র, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট স্কুল, কওমি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় পুরোপুরি সরকারি কারিকুলামকেই অনুসরণ করা হয়। এ কারিকুলাম সাধারণ শিক্ষা কারিকুলাম নামেও পরিচিত। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোয় সাধারণ শিক্ষা কারিকুলামে নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বেশকিছু অতিরিক্ত বিষয়ও পড়ানো হয়। এবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদ্রাসায় অনুসরণ করা হয় সরকার নির্ধারিত পৃথক কারিকুলাম। এ কারিকুলাম সাধারণ মাদ্রাসা কারিকুলাম নামে পরিচিত, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। আর কওমি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোয় সম্পূর্ণ নিজস্ব কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। এ দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন পদ্ধতিও পুরোপুরি আলাদা। কওমি মাদ্রাসায় কোরআন ও হাদিস শিক্ষায় জোর দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অনুসরণ করা হয় বিদেশী কারিকুলাম। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পার্থক্যের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যায় শেষে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার স্তরে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। এছাড়া সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলককরণ) আইন, ১৯৯০-এর মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা হলেও প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পড়েন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানভেদে এসব বিদ্যালয়ে সরকারি বিদ্যালয়ের তুলনায় ন্যূনতম দ্বিগুণ থেকে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। শিক্ষায় বিনিয়োগেও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশের তালিকায় রয়েছে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের কথা থাকলেও ধারাবাহিকভাবে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের আশপাশে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের এ ঘাটতির প্রভাব পড়ছে প্রাথমিকসহ শিক্ষার সব স্তরেই। দক্ষ প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধার সংকটে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনিক অনেক ক্ষেত্রে মানের অবনমন ঘটছে। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশই শ্রেণী অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। আর প্রাথমিক স্তর থেকে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তাদের এ ঘাটতি ওপরের শ্রেণীগুলোয় গিয়ে আরো বৃদ্ধি পায়। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জনও রয়েছে। বিগত কয়েক দশকে সাক্ষরতার হার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব খাতে সরকারের পাশাপাশি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বেসরকারি সংস্থাগুলো। প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে বেসরকারি সংস্থাগুলো বিদ্যালয় ও লার্নিং সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগকে সম্প্রসারিত করেছে। প্রায় দুই দশক আগে শুধু ব্র্যাকই প্রায় ৪০ হাজার প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছে। বিদেশী সহযোগিতা হ্রাস, সরকারি উদ্যোগ সম্প্রসারণ, পরিস্থিতির উন্নয়নের সঙ্গে প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। তবে বেসরকারি এ সংস্থাটি ৩ হাজার ৯০৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। এছাড়া ই-লার্নিং, ব্র্যাক একাডেমিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখনো প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা এসডিজি হিসেবে যে ১৭টি লক্ষ্য স্থির করেছে, তার মধ্যে চতুর্থটি হলো সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি। বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র সর্বসম্মতভাবে ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা এসডিজি গ্রহণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশকে শিক্ষা খাতে বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সুযোগ-সুবিধা আরো সম্প্রসারণ করতে হবে এবং বিদ্যমান সংকটগুলো দূর করতে হবে।
একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার মূল ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরে। এ কারণে বিশ্বের সব দেশেই প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদাণ করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর থেকেই প্রাথমিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।










