বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সংকটের জায়গাটি কোথায়?
শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটকে কোনো একটি নির্দিষ্ট উপাদানের ওপর চাপানো যাবে না। এটি একটি সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের ব্যর্থতা। আমরা শিক্ষার গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যার দিকে বেশি নজর দিয়েছি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন মূলত সার্টিফিকেট ও ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থীরা বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় স্বাধীনতা, নমনীয়তা ও ফোকাসের অভাব রয়েছে। এ সমস্যার শুরুটা হয় একদম প্রাথমিক পর্যায়ে। আমরা শিশুদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ বা খেলাধুলার মাধ্যমে শেখার সুযোগ না দিয়ে মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর দিচ্ছি। ফলে জ্ঞানচর্চার জায়গাটিতে আমরা একটি ভুল ধারণার ওপর বসে আছি এবং মানহীন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সব পর্যায়ে উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন কি?
প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরেই যোগ্য ও উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। অযোগ্য শিক্ষক জাতির জন্য বোঝা বা ‘বারডেন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় সমস্যা আমাদের শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি। আমাদের দেশে একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই তাকে ভবিষ্যতের শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে শিক্ষক হিসেবে ভাবা হচ্ছে তার একাডেমিক ফলাফল বা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং তার অন্য অ্যালাইনমেন্টের ওপর ভিত্তি করে। ফলে শিক্ষকদের যোগ্যতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
তবে এখন দেখেছি, বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন স্ট্যানফোর্ড) থেকে পিএইচডি করা বা বিদেশে ২০ বছর শিক্ষকতা করা বাংলাদেশীরা এখন দেশে ফিরে আমাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন। তারা উন্নত জীবনের মোহ ত্যাগ করে দেশের জন্য কাজ করতে আসছেন। আমাদের তরুণদের মধ্যেও অপার সম্ভাবনা আছে। শুধু দরকার তাদের হাত-পা বেঁধে না রাখা। তরুণদের নিয়ে আমি আশাবাদী।
শিক্ষার্থীদের বাজার উপযোগী করে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?
আমাদের বাজেটের মূল ফোকাস অবকাঠামো উন্নয়ন। আমরা দালানকোঠা বানাচ্ছি, নতুন নতুন প্রযুক্তি কিনছি এবং এগুলো দেখিয়েই বলছি যে শিক্ষার পেছনে খরচ করছি। কিন্তু এ অবকাঠামো বা প্রযুক্তি যারা ব্যবহার করবেন, সেই ‘হিউম্যান রিসোর্স’ বা মানবসম্পদের উন্নয়নে আমরা কার্যকর কিছুই করতে পারিনি। সার্বিকভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বাজার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ কী?
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি একটি অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমরা সবসময় উদ্ভাবন, সৃজনশীলতাকে উৎসাহ দিই। উপাচার্য হিসেবে আমার চেষ্টা আরো বেশি আন্তর্জাতিকীকরণ। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিকে আরো বৈশ্বিক জায়গায় নিয়ে যাওয়া। নর্থ সাউথ এখন কেবল পাঠদান নয়, বরং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ১০ বছরে আমরা গবেষণায় যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তা সত্যিই গর্ব করার মতো।
ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে শিক্ষায় কী ধরনের পরিবর্তন আসছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আমাদের দুভাবে ভাবতে হবে। এক. এআই প্রযুক্তি হিসেবে শেখা (কোডিং, প্রোগ্রামিং)। দুই. এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ (স্বাস্থ্য, ব্যবসা বা সমাজের সমস্যা সমাধানে)। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আমাদের ‘ইন্টেলিজেন্স মেশিন ল্যাব’ আছে, যেখানে আমাদের ফ্যাকাল্টি ও ছাত্ররা বিশ্বমানের গবেষণা করছে। এছাড়া আমরা গুগলের সহযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম ‘সাইবার সিকিউরিটি ক্লিনিক’ এবং একটি অত্যাধুনিক ‘ফ্যাব ল্যাব’ ও ‘ইনোভেশন হাব’ তৈরি করছি। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পেপার পাবলিশ না করে কমিউনিটির সমস্যা সমাধানে সরাসরি ভূমিকা রাখুক।
আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
এটি একটি ৩২ বছরের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়, যা একের পর এক মাইলফলক স্পর্শ করে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আত্মতুষ্টির কোনো জায়গা এখানে নেই। বরং আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনে কাজ করছি। র্যাংকিংয়ে এগোনোসহ আমরা কিছু সাফল্যের গল্প হয়তো বলি, কিন্তু কখনই দাবি করি না যে আমরা সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে গেছি। কারণ সেটি বলার অর্থই হলো অগ্রগতির চাকা থেমে যাওয়া।
আমি বিশ্বাস করি, উন্নতি একটি চলমান যাত্রা। এটি একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া। আপনি যেখানেই পৌঁছান না কেন, সবসময় দেখবেন উন্নতির আরো অবকাশ বা সুযোগ রয়ে গেছে। তাই থেমে যাওয়ার বা তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।










